টানা বর্ষণ ও ফারাক্কার খুলে দেওয়া বাঁধের ওপার থেকে আসা পানির প্রভাবে চাঁপাইনবাবগঞ্জের নিমাঞ্চল প্লাবিত হতে শুরু করেছে। এরইমধ্যে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে কয়েক হাজার পরিবার। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নদী তীরবর্তী এলাকা ও চরাঞ্চলের প্রায় সাড়ে আট হাজার হেক্টর জমির ফসল।
পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, সোমবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে মঙ্গলবার (১অক্টোবর) ভোর ৬টা পর্যন্ত চাঁপাইনবাবগঞ্জে পদ্মা নদীতে পানি বেড়েছে ৩ সেন্টিমিটার। বর্তমানে চাঁপাইনবাবগঞ্জের পাঙ্খা পয়েন্টে পানি বিপদসীমার ০.৪১ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা জানান, ফারাক্কার সব লক গেট খুলে দেওয়ার পর গতকাল সোমবার (৩০ সেপ্টেম্বর) বিকালে পদ্মায় পানি বৃদ্ধির হার অধিক থাকলেও গত ১২ ঘণ্টায় সেই হার কমেছে।
এদিকে পদ্মায় পানি বৃদ্ধির কারণে সদর উপজেলার আলাতুলি, নারায়ণপুর, চর অনুপনগর, শাহজাহানপুর ও চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চলে পানি প্রবেশ করতে শুরু করেছে। পাঁচটি ইউনিয়নের প্রায় তিন হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।
চরবাগডাঙ্গা ইউপি’র ৯ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য কামরুজ্জামান টুটুল জানান, গোঠাপাড়া, বাগানপাড়া, চাকপাড়া, গিধনিপাড়া, মালবাগডাঙ্গা গ্রামের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে প্রায় ৫০০ পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। চরবাগডাঙ্গা বিওপি এলাকার গিধনিপাড়ায় নদীভাঙন দেখা দিয়েছে।
শাহজাহানপুর ইউপি চেয়ারম্যান আবদুস সালাম জানান, হাকিমপুর, সেকালিপুর রাবনপাড়া, দুর্লভপুর ও নরেন্দ্রপুরের কিছু অংশ প্লাবিত হয়েছে। এতে এসব এলাকার কয়েকশ’ পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি বৃষ্টির কারণে দুর্ভোগের মাত্রাও বাড়তে শুরু করেছে।
চর অনুপনগর ইউপি চেয়ারম্যান সাদেকুল ইসলাম জানান, নতুনপাড়া, বিশ্বাসপাড়া, লম্বাপাড়া, মোন্নাপাড়া, চর অনুপনগর বাগানপাড়া, কলাবাগান ও চরকাশেমপুর ক্যানেল পাড়ার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে প্রায় ৪০০ পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মৌদুদ আলম জানান, ‘আকস্মিক বন্যার পানি ও গত কয়েক দিনের ভারী বর্ষণে এখন পর্যন্ত সদর উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নের প্রায় তিন হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।’’
চাঁপাইনবাবগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মঞ্জুরুল হুদা বলেন, ‘গত ২৪ ঘণ্টায় ৮৬ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে। টানা বৃষ্টি ও ফারাক্কার গেট খুলে দেওয়ায় জেলার পদ্মা ও মহানন্দা নদীর অববাহিকায় থাকা নিম্নাঞ্চলগুলো প্লাবিত হতে শুরু করেছে। এতে জেলার প্রায় ৭ হাজার ৮’শ হেক্টর জমির মাসকলাই তলিয়ে গেছে। এছাড়া ৬০০ হেক্টর জমির শাকসবজি ও ৯৫ হেক্টর জমির হলুদ নষ্ট হয়ে গেছে।’
অপরদিকে, চাঁপাইনবাবগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) সৈয়দ সাহিদুল আলম জানান, ‘আগামী ৪/ ৫ অক্টোবর পর্যন্ত পানি বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে বর্তমানে পানি বাড়ার যে হার তাতে আমরা আশা করছি হয়তো বিপদসীমা অতিক্রম নাও করতে পারে। তবে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। নদীভাঙন ও বাঁধের কোনও জায়গায় সমস্যা হলে পূর্বপ্রস্তুতি রাখা হয়েছে। বড় ধরনের বন্যা পরিস্থিতির উদ্ভব হলে, তা মোকাবিলায় সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে। জেলা, উপজেলার সব পর্যায়ে স্থানীয় প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ সবাইকে সর্বোচ্চ সতর্ক রাখা হয়েছে। এই মুহূর্তে নদীভাঙন তেমন একটা নেই। তবে সামনে পানি কমতে শুরু করলে ভাঙনের আশঙ্কা রয়েছে।’
এদিকে শিবগঞ্জ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা প্রকৌশলী আরিফুল ইসলাম জানান, ‘গত কয়েকদিনের ভারী বর্ষণ ও ভারত থেকে আসা পানির প্রভাবে উপজেলার পাঁকা, দুর্লভপুর, মনাকষা, উজিরপুর, ধাইনগর ও ছত্রাজিতপুর ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় এখন পর্যন্ত এসব এলাকার প্রায় ছয় হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।’
শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার চৌধুরী রওশন ইসলাম জানান, ‘আকস্মিক বন্যাকবলিত এলাকাগুলোতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরিদর্শন এবং ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত ৪০০ পরিবারের মাঝে চাল, চিড়া, গুড়, শুকনো খাবার প্রাথমিকভাবে বিতরণ করা হয়েছে।’
অন্যদিকে, সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার আলমগীর হোসেন জানান, এখন পর্যন্ত প্লাবিত এলাকার মানুষজন নিরাপদেই রয়েছেন। কোনও হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক একেএম তাজকির-উজ-জামান জানান, ‘চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর ও শিবগঞ্জ উপজেলার পানিবন্দি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের জন্য ত্রাণ ও দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ে আরও ত্রাণসামগ্রী ও শুকনো খাবারের জন্য চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে। দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রস্তুত রয়েছে স্থানীয় প্রশাসন।’







