মানিকগঞ্জের সিংগাইরে ভাষা আন্দোলনের প্রথম শহীদ রফিক উদ্দিন আহমেদের বাড়ির সামনের রাস্তাজুড়ে গুচ্ছগ্রাম তৈরির প্রতিবাদে মানববন্ধন হয়েছে। শুক্রবার (১৩ নভেম্বর) দুপুরে সিংগাইর উপজেলার উত্তর পারিল গ্রামে নির্মাণাধীন গুচ্ছগ্রাম এলাকায় এই মানববন্ধন করেন শহীদ রফিকের পরিবারের সদস্যরা ও এলাকাবাসী। তারা অভিযোগ করেন, এতে শহীদ রফিকের বাড়িটি আড়াল হয়ে যাবে এবং একুশে ফেব্রুয়ারিতে সেখানে যাওয়া হাজার হাজার দর্শনার্থী গাড়ি পার্কিংসহ নানা অসুবিধায় পড়বেন। তারা এটিকে ভাষা শহীদ রফিকের প্রতি অমর্যাদাকর উল্লেখ করে সেখানে তার স্মরণে সেখানে অন্য স্থাপনা করার দাবি করেন।
ঘণ্টাব্যাপী এই মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন– শহীদ রফিকের ছোট ভাই বীর মুক্তিযোদ্ধা খোরশেদ আলম, মেজো ভাই আব্দুর রশিদের ছেলে আব্দুর রউফ, স্থানীয় বলধরা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি তোফাজ্জল হোসেন অন্যরা।
এ সময় শহীদ রফিকের ছোট ভাই খোরশেদ আলম বলেন, ‘আমার বড় ভাই ভাষা আন্দোলনের প্রথম শহীদ। আমি, আমাদের ভাইসহ পরিবারের আট জন সদস্য মুক্তিযোদ্ধা। অথচ, আমাদের পরিবার সব সময় নানা ধরনের বৈষম্যের স্বীকার হচ্ছি। বাড়ির সামনে শহীদ রফিকের নিজবাড়িতে শহীদ মিনার হওয়ার সময় বাধা দেওয়া হয়েছিল। নানা প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে সেখানে শহীদ মিনারটি নির্মিত হয়। এখন শহীদ রফিকের বাড়িতে কিংবা সেই শহীদ মিনারে প্রবেশের পথে বাড়ির সামনে তৈরি হতে চলেছে গুচ্ছগ্রাম। এই গুচ্ছগ্রামটি তৈরি হলে শহীদ রফিকের বাড়িটি ঢাকা পড়ে যাবে। আমি মনে করি, এতে শহীদ রফিকের প্রতি অমর্যাদা করা হচ্ছে। এ বিষয়ে আমি ইতোমধ্যে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং জেলা প্রশাসক বরাবর চিঠি দিয়েছি। কিন্তু গুচ্ছগ্রাম নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে। এ ব্যাপারে আমি প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি, যাতে সেখানে গুচ্ছগ্রামের পরিবর্তে শহীদ রফিকের ভাস্কর্য কিংবা একটি শিশুপার্ক করা হয়।’
শহীদ রফিকের মেজো ভাই আব্দুর রশিদের ছেলে আব্দুর রউফ বলেন, ‘আমরা শহীদ রফিকের পরিবারের সদস্য। আমরা অর্থনৈতিকভাবে খুবই দুর্বল। তবে, অত্যন্ত সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে জীবন যাপন করছি। আমাদের বাড়ির মোট জমি ৩৮ শতাংশ। এর মধ্য থেকে তিন শতাংশ জমি শহীদ মিনার নির্মাণের জন্য দেওয়া হয়েছে। অবশিষ্ট জমির ওপর শহীদ রফিকের নামে একটি ফাউন্ডেশন করার কাজ চলছে। বর্তমানে ওই বাড়িতে আমার এক চাচি আর তার সন্তানরা থাকেন। অন্যরা বিভিন্ন এলাকায় বসবাস করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। আমার বাড়ির সামনে বাড়িতে প্রবেশের রাস্তাজুড়ে ৫৯ শতাংশ সরকারি খাস জায়গার ওপর একটি গুচ্ছগ্রাম করা হচ্ছে। একুশে ফেব্রুয়ারির অনুষ্ঠানে হাজার হাজার নারী-পুরুষ শত শত গাড়িতে এখানে আসেন। খাস জায়গায় তাদের গাড়িগুলো রাখা হয়। ওই স্থানে গুচ্ছগ্রাম করা হলে একুশে ফেব্রুয়ারির অনুষ্ঠানে আগত মানুষরা খুবই সমস্যায় পড়বেন।’
এ বিষয়ে বলধরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সিংগাইর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুর মাজেদ খান বলেন, ‘আমি এই প্রকল্প সম্পর্কে আগে কিছুই জানতাম না। প্রকল্প পাস হওয়ার পর জানলাম, সেখানে একটি সরকারি আবাসন প্রকল্প হবে। আমাকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ডেকে নিয়ে কাজটি বাস্তবায়নে একটি কমিটির করার নির্দেশনা দেন। সেই অনুযায়ী সংরক্ষিত মহিলা ইউপি সদস্যকে সভাপতি করে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি করা হয়। নির্মাণকাজটি চলমান রয়েছে। মোট ৫৯ শতাংশ জমির মাঝখানে ১৬ ফুট দীর্ঘ সড়ক করার জন্য ১০ শতাংশ জমি বাদে বাকি ৪৯ শতাংশ জমির ওপর ১৫টি ঘর নির্মাণ করা হবে। এই ইউনিয়নের বিভিন্ন ওয়ার্ড থেকে দুস্থ, অসহায় ও ভূমিহীন ১৫টি পরিবার বাছাই করা হয়েছে। নির্মাণ শেষে তাদের মাঝে ঘরগুলো হস্তান্তর করা হবে। ইতোমধ্যে জমির ওপর মাটি ভরাট কাজ চলছে। অল্প সময়ের মধ্যেই ঘরগুলো নির্মাণ সম্পন্ন হবে।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রুনা লায়লা বলে, ‘আবাসন প্রকল্পটি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মাধ্যমে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা বাস্তবায়ন করছেন। আমি এই উপজেলায় যোগদানের আগেই মাটি ভরাটের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এখন ঘর নির্মাণের জন্য অর্থ বরাদ্দ পাওয়া গেছে। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের কাছ থেকে জানতে পেরেছি, আবাসন প্রকল্প এলাকার বাইরে ইটের প্রাচীর নির্মাণ করা হবে যাতে শহীদ রফিকের বাড়ির মর্যাদা ক্ষুণ্ন না হয়। এটা চলমান কাজ। এই স্থানে এটার পরিবর্তন করে অন্য কিছু করা সুযোগ আছে কিনা তা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে যোগাযোগ করে জানতে হবে।’







