ভালোবাসার অপরাধে শরীয়তপুরের জাজিরায় প্রকাশ্যে কিশোর-কিশোরীকে নির্যাতনের ভিডিও নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে। মঙ্গলবার নির্যাতিত কিশোরের বাবা জাজিরা থানায় মামলা করেছেন।এরপর পলিশ ঘটনার সঙ্গে জড়িত দুজনকে গ্রেফতার করে।
জানা যায়, ৭ ফেব্রুয়ারি ঘটনা ঘটলেও ২০ ফেব্রুয়ারি নির্যাতনের ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ইউটিউব ও ফেসবুকে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। ৬ মিনিট ৪২ সেকেন্ডের ভিডিও ক্লিপটিতে দেখা যায়, দুই কিশোর-কিশোরীকে দড়ি দিয়ে বেঁধে গলায় জুতার মালা পড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। পরে দীর্ঘ সময় ধরে দুইজনকে জুতাপেটা করা হয়। ভিডিওটি ধারণ করা হয়েছে শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার কুন্ডেরচর ইউনিয়নের ছিডারচর এলাকার আব্দুল মান্নান মল্লিকের কান্দি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠ থেকে। এখানেই ওই কিশোর-কিশোরীকে নির্যাতন করা হয়।
এই ঘটনায় অবশেষে মামলা নিয়েছে পুলিশ। মঙ্গলবার নির্যাতিত কিশোরের বাবা আসমত আলী খান বাদী হয়ে জাজিরা থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে ৭ জনকে অভিযুক্ত করে মামলাটি দায়ের করেন। অভিযুক্তরা হচ্ছে, কুন্ডেরচর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান লিয়াকত আলী মল্লিক,৩ নং ওয়ার্ডের মেম্বার কামাল মল্লিক,কুন্ডেরচর আব্দুল মান্নান মল্লিকের কান্দি উচ্চ বিদ্যালয়ের দপ্তরি বাদল ভূঁইয়া,স্থানীয় বাসিন্দা সুলতান মল্লিক,আমির মল্লিক,মনির মল্লিক ও ইকবাল মল্লিক।
জাজিরা থানা পুলিশ কুন্ডেরচর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান লিয়াকত আলী মল্লিক ও কুন্ডেরচর আব্দুল মান্নান মল্লিকের কান্দি উচ্চ বিদ্যালয়ের দপ্তরি বাদল ভূঁইয়াকে গ্রেফতার করে আদালতে পাঠিয়েছে।
সরজমিনে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কুন্ডেরচর আব্দুল মান্নান মল্লিকের কান্দি উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির ছাত্রীর সঙ্গে প্রতিবেশী এক কিশোরের প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। গত ৬ ফেব্রুয়ারি তারা দুজন বাড়ি থেকে পালিয়ে যায়। পালিয়ে যাওয়ার সময় গ্রামের শেষ প্রান্তে হাসাইল নদীর ঘাট থেকে স্থানীয় ইউপি মেম্বার কামাল মল্লিকের নেতৃত্বে কয়েকজন যুবক তাদের আটক করে কুন্ডেরচর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান লিয়াকত মল্লিকের বাড়িতে নিয়ে আসে।
লিয়াকত মল্লিকের নির্দেশে বাড়ির উঠানে তাদের শিকল দিয়ে বেঁধে রেখে রাতভর নির্যাতন চালানো হয়। পরেরদিন তাদের নেওয়া হয় কুন্ডেরচর আব্দুল মান্নান মল্লিকের কান্দি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে। সেখানে তাদের দড়ি দিয়ে বেঁধে গলায় জুতার মালা পড়িয়ে দেওয়া হয়। এরপর কুন্ডেরচর ইউপির তিন নম্বর ওয়ার্ড সদস্য কামাল মল্লিক, স্থানীয় আমীর হোসেন মল্লিক ও সুজন মল্লিক কিশোর-কিশোরীকে জুতা দিয়ে এলোপাতাড়ি পেটাতে থাকে। একপর্যায়ে তারা জ্ঞান হারিয়ে ফেললে গ্রাম্য মাতব্বররা তাদের ফেলে রেখে চলে যায়। পরে পরিবারের সদস্যরা তাদের উদ্ধার করে বাড়িতে নিয়ে আসেন।
ঘটনাটি কাউকে না জানাতে তাদের পরিবারকে হুমকি দেয় কামাল মল্লিক। এমনকি তাদের চিকিৎসার জন্য গ্রামের বাইরে না নেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়।
কিশোরীর মা বলেন, আমার মেয়ে ছোট মানুষ। ভালোমন্দ বোঝার মত ওর এখনও বয়স হয়নি। সে কোনও অন্যায় কাজ করলে সেব্যাপারে মাতব্বররা আমাদের জানাতে পারতেন। স্কুলের ছেলে-মেয়েদের সামনে প্রকাশ্যে ওকে জুতাপেটা করা হয়েছে। আমার মেয়ে এখন ঘর থেকে বের হয় না। সে পাগলের মতো আচরণ করছে।
কিশোরীর বাবা বলেন, আমাদের না জানিয়ে লিয়াকত মল্লিক ও কামাল মল্লিক নেতৃত্ব দিয়ে প্রকাশ্যে ওদের নির্যাতন করেছেন। এমনকি দুজন অসুস্থ হয়ে পড়লে তাদের চিকিৎসার জন্য গ্রামের বাইরে নিতে দেয়া হয়নি। এখনও ঘটনাটি জানাজানি হওয়ায় লিয়াকত মল্লিক আমাদের গ্রাম ছেড়ে চলে যেতে বলেছে।
এদিকে কিশোরের বাবা বলেন, আমরা গরিব মানুষ। ছেলে কৃষি শ্রমিকের কাজ করে। সে অন্যায় করলে আমরা রয়েছি, দেশে আইন আছে। কামাল মল্লিকের সঙ্গে আমাদের এলাকার বিরোধ রয়েছে। এ কারণে সে এভাবে আমার ছেলেকে নির্যাতন করেছেন।
তিনি অভিযোগ করেন, আমি ঘটনাটি জাজিরা থানায় জানিয়েছিলাম। পুলিশ বলেছে ঘটনা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু পুলিশ আর আসেনি। তাদের নির্যাতনের ঘটনার ভিডিও প্রচার হওয়ার পর পুলিশ এসেছে।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে নির্যাতনের শিকার ওই কিশোরী বলেন, আমাকে বেদম নির্যাতন করা হয়েছে। বিদ্যালয়ের মাঠে মারধর করার সময় আমি চিৎকার করে সাহায্য চেয়েছি। কিন্তু আমাকে বাঁচাতে কেউ এগিয়ে আসেনি। সবাই দাঁড়িয়ে মজা দেখেছে। আমিতো কোনও অন্যায় করিনি। একটি ছেলেকে ভালবেসেছি। তাকে নিয়ে সাংসার করতে চেয়েছিলাম। এখন আমার মরে যেতে ইচ্ছে করে।
নির্যাতনের শিকার কিশোর বলেন, আমাদের ছেড়ে দেওয়ার জন্য তাদের পায়ে ধরেছি, মাফ চেয়েছি। কিন্তু তাতেও তারা আমাদের নির্যাতন করা বন্ধ করেনি। স্কুলের ছোট ছোট বাচ্চাদের সামনে দড়ি দিয়ে বেঁধে জুতার মালা পড়িয়ে জুতাপেটা করেছে।
এদিকে,পুলিশ ও গণ-মাধ্যমকর্মীদের উপস্থিতি টের পেয়ে কামাল মল্লিক, আমীর হোসেন মল্লিক ও সুজন মল্লিক গ্রাম থেকে পালিয়ে গেছে। তাদের পরিবারের সদস্যরা এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।
কুন্ডেরচর ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান লিয়াকত মল্লিক বলেন, দুর্গম এ চরে প্রশাসনের লোক আসে না। আমাকেই সামাজিক বিভিন্ন অন্যায়ের বিচার করতে হয়। ওই ছেলে মেয়ের বিরুদ্ধে অসামাজিক কাজ করার অভিযোগ ছিল। এ ঘটনাটির বিচারও আমি করেছি। ছেলে মেয়ের অভিভাবককে খবর দেওয়া হয়েছিল। তারা উপস্থিত না হওয়াতে তাদের ছাড়াই বিচার করা হয়েছে। স্কুল মাঠে কারা তাদের জুতাপেটা করেছে তা আমার জানা নেই।
জাজিরা থানার উপপরিদর্শক (এসআই) সঞ্জয় কুমার সাহা বলেন, কিশোর-কিশোরীকে নির্যাতনের ভিডিওটি থানায় আসার পরে সোমবার পুলিশ ওই চরে গিয়েছিল। ঘটনার সত্যতা পাওয়া গেছে। ক্ষতিগ্রস্তরা মামলা করলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
/বিটি/এফএস/এপিএইচ/







