চট্টগ্রামের রাউজান ও রাঙ্গুনিয়া উপজেলায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বসতঘরে অগ্নিসংযোগের ঘটনাগুলো ছিল পূর্বপরিকল্পিত। এর সঙ্গে জড়িত একটি সংঘবদ্ধ চক্রের সাত জন সদস্যকে গ্রেফতারের পর রহস্য উদ্ঘাটন করেছে জেলা পুলিশ। গ্রেফতারকৃতদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে আগুন দেওয়ার বেশ কিছু আলামত।
মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) দুপুরে চট্টগ্রাম পুলিশ সুপার (এসপি) কার্যালয়ে এ সংক্রান্ত আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে বিষয়টি জানান চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি মো. আহসান হাবীব পলাশ। এ সময় চট্টগ্রাম পুলিশ সুপার মোহাম্মাদ নাজির আহমেদ খাঁন উপস্থিত ছিলেন।
অগ্নিসংযোগের ঘটনায় গ্রেফতার সাত জন হলেন– মনির হোসেন, মোহাম্মদ ওমর ফারুক, মোহাম্মদ কবির হোসেন, কার্তিক দে, বিপ্লব বড়ুয়া, মোহাম্মদ লোকমান ও মো. পারভেজ।
প্রেস ব্রিফিংয়ে পুলিশ জানায়, গত বছরের ডিসেম্বরে রাউজান ও রাঙ্গুনিয়া থানা এলাকায় গভীর রাতে বেশ কয়েকটি বসতঘরে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এতে কিছু ঘর আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং কয়েকটি বসতঘর সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হয়ে যায়। ঘটনাস্থল থেকে প্লাস্টিকের বস্তা দিয়ে তৈরি উসকানিমূলক ব্যানার উদ্ধার করা হয়। ব্যানারগুলোতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টে উসকানিমূলক বক্তব্য, কয়েকজন রাজনৈতিক নেতার নাম এবং অর্ধশতাধিক মোবাইল ফোন নম্বর লেখা ছিল।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে জানা যায়, রাতের অন্ধকারে পরিকল্পিতভাবে ব্যানার টাঙিয়ে বসতঘরে অগ্নিসংযোগের ঘটনাগুলো ছিল উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও ষড়যন্ত্রমূলক। এসব ঘটনার মাধ্যমে একদিকে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি এবং অপরদিকে দেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের অপপ্রচার চালিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে সরকারকে বেকায়দায় ফেলার চেষ্টা করা হয়।
প্রেস ব্রিফিংয়ে চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি বলেন, ‘ঘটনার তদন্তে তথ্য-উপাত্ত, প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ ও সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে গত ২ জানুয়ারি দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলার কলেজ গেট এলাকা থেকে একজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। গ্রেফতারের পর তার বসতঘর তল্লাশি করে ৩টি খালি প্লাস্টিকের বস্তা উদ্ধার করা হয়, যার সঙ্গে ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা ব্যানারের হুবহু মিল রয়েছে।
‘জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতার ব্যক্তি জানান, রাঙ্গামাটির লোকমান, রাঙ্গামাটি পৌরসভার সাবেক এক কমিশনার এবং রাউজানের একজন ব্যক্তির পরিকল্পনায় ১৫-১৬ জনের একটি সংঘবদ্ধ চক্র দেশের বিভিন্ন স্থানে হিন্দু ও বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের বসতঘরে অগ্নিসংযোগ করে। একই সঙ্গে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর বসতঘরে অগ্নিসংযোগের পরিকল্পনাও করা হয়। জনমনে ভীতি ও বিভ্রান্তি সৃষ্টির লক্ষ্যে এসব ঘটনায় ষড়যন্ত্রমূলক ব্যানার ব্যবহার করা হয়।’
পুলিশ আরও জানায়, গ্রেফতার আসামি মনিরের পারিবারিক বিরোধ ও প্রতিশোধমূলক মনোভাব থেকে ব্যানারে কিছু ব্যক্তির নাম ও মোবাইল নম্বর সংযুক্ত করা হয়েছিল। আসামি মনির হোসেনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অন্য আসামিদের গ্রেফতার করা হয়।
গ্রেফতারকৃতদের হেফাজত থেকে উদ্ধার করা হয় উসকানিমূলক ব্যানার ৪টি, কেরোসিন তেলের কন্টেইনার ২টি, কেরোসিন তেলের বোতল একটি, তেলমাখা একটি লুঙ্গি ও একটি পুরাতন কালো শার্ট, খালি প্লাস্টিকের বস্তা ৩টি, ব্যানারে উল্লিখিত নম্বর সংরক্ষিত একটি মোবাইল ফোন, একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও একটি মোটরসাইকেল। এসব যানবাহন পাঁচটি ঘটনাস্থলে যাতায়াতে ব্যবহৃত হয়েছিল বলে জানায় পুলিশ।
প্রাথমিক তদন্তে আরও জানা যায়, ঘটনায় মূল পরিকল্পনাকারী স্থানীয় একজন নার্সারি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তিনি হিন্দু, বৌদ্ধ ও পাহাড়ি সম্প্রদায়ের বসতঘরে অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে সামাজিক অস্থিরতা তৈরিতে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সমন্বয়কারী হিসেবে রাঙামাটিতে বসবাসকারী একজনের নাম পাওয়া গেছে। এ ছাড়া নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন সমর্থিত এক সাবেক কমিশনার আর্থিক সহযোগিতা দিয়েছেন বলেও তথ্য পাওয়া গেছে।
পুলিশ জানায়, গ্রেফতার আসামি মনির হোসেন ইতোমধ্যে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। আটককৃতদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তাদের অন্য পলাতক সহযোগীদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।








