জুলাইযোদ্ধাদের দাবির মুখে প্রেসক্লাব বন্ধ রাখার পরামর্শ দিলেন ইউএনও

রাজশাহী প্রতিনিধি
২৮ মার্চ ২০২৬, ১৯:৩৩ আপডেট : ২৮ মার্চ ২০২৬, ১৯:৩৩

জুলাইযোদ্ধাদের দাবির মুখে রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলা প্রেসক্লাব বন্ধ রাখার পরামর্শ দিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাজমুস সাদাত রত্ন। শনিবার (২৮ মার্চ) সকালে প্রেসক্লাবের সভাপতি ও দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার উপজেলা প্রতিনিধি সাইফুল ইসলামকে ডেকে তিনি এ পরামর্শ দেন।

সাংবাদিকরা বলছেন, প্রেসক্লাব চলে সাংবাদিকদের নিজস্ব নিয়মে। এখানে সরকারি কিংবা যেকোনও হস্তক্ষেপ স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য হুমকি। সাংবাদিকরা ইউএনওর এমন পরামর্শের নিন্দা জানাচ্ছেন এবং তাকে এই অবস্থান থেকে সরে আসার আহ্বান জানিয়েছেন।

গোদাগাড়ীর স্থানীয় সাংবাদিকরা জানান, ২০০৪ সালে এই প্রেসক্লাব প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০০৯ সালে উপজেলা সদর ডাইংপাড়া মোড়ের একটি জায়গায় এককক্ষের প্রেসক্লাব ভবন নির্মাণ করা হয়। দীর্ঘদিন এই প্রেসক্লাবের সভাপতি ছিলেন আলমগীর কবির তোতা। জুলাইযোদ্ধাদের অভিযোগ, তিনি আওয়ামী লীগের দোসর। এটি সামনে এনে প্রেসক্লাবটি দখলের চেষ্টা চলছিল। সম্প্রতি প্রেসক্লাবের নতুন কমিটি করা হলেও সেই চেষ্টা থামেনি।

গোদাগাড়ীতে সম্প্রতি ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন জুলাইযোদ্ধা’ নামে সংগঠন প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এই সংগঠন চব্বিশের ৫ আগস্টের পর থেকে প্রেসক্লাব ভবন দখল করে নিজেদের কার্যালয় খোলার চেষ্টা করছে। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মো. মুরশালিন ২৪ মার্চ ইউএনওর কাছে একটি লিখিত অভিযোগ দেন। এতে তিনি দাবি করেন, প্রেসক্লাবে আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসন করা হচ্ছে। এরপর সেদিনই তার নেতৃত্বে প্রেসক্লাবে তালা দেওয়া হয়। পরে সাংবাদিকরা তালা ভেঙে ভেতরে ঢোকেন। কিন্তু তারা প্রেসক্লাবে বসতে পারছেন না। এ ঘটনায় সাংবাদিকরা থানায় অভিযোগ দিলেও পুলিশ কোনও পদক্ষেপ নেয়নি।

প্রেসক্লাবের সভাপতি সাইফুল ইসলাম জানান, ২৬ মার্চ সন্ধ্যায় তারা প্রেসক্লাবে বসেছিলেন। সে সময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের জেলা কমিটির সাবেক সদস্যসচিব মো. রহমতুল্লাহসহ কয়েকজন সেখানে যান। তারা তাকে জানান, প্রেসক্লাবের ব্যাপারে ইউএনওর কাছে অভিযোগ করা হয়েছে। সেই অভিযোগের নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তারা যেন প্রেসক্লাব না খোলেন। সেই থেকে নিরাপত্তার সংকটে সাংবাদিকরা প্রেসক্লাবে বসতে পারেননি।

‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন জুলাইযোদ্ধা’র সভাপতি সাবিয়ার রহমান মিল্টন জানিয়েছেন, আন্দোলনের পর থেকেই জুলাই আন্দোলনের আহতরা প্রেসক্লাবে নিজেদের অফিস করতে চাচ্ছিলেন। তিনি ইতোমধ্যে কয়েকদফা সেই উদ্যোগ ঠেকিয়েছিলেন।

প্রেসক্লাবের সভাপতি সাইফুল ইসলাম জানান, প্রেসক্লাব দখলের চেষ্টার বিষয়ে সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হয়েছে। এতে আরও চটেছেন ইউএনও এবং জুলাইযোদ্ধারা। এখন জুলাইযোদ্ধারা নিজেদের অফিস করার দাবি থেকে সরে এসে প্রেসক্লাব গুঁড়িয়ে দিয়ে সেখানে পাবলিক টয়লেট কিংবা যাত্রী ছাউনি করবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন।

তিনি জানান, শনিবার সকালে ইউএনও নাজমুস সাদাত রত্ন তাকে ডেকে পাঠান। এরপর তিনি উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কিছুদিন প্রেস ক্লাব বন্ধ রাখার পরামর্শ দেন। আর এ বিষয়ে সংবাদ প্রকাশ করা ‘ঠিক হয়নি’ বলেও তাকে জানান ইউএনও। তিনি বলেছেন, জুলাইযোদ্ধাদের সরকারও ভয় পায়। সেখানে তাদের সঙ্গে মীমাংসা করে নেওয়াই ভালো হবে।

ইউএনওর এমন পরামর্শের নিন্দা জানিয়ে রাজশাহী এডিটরস ফোরামের সাধারণ সম্পাদক আহসান হাবীব অপু বলেন, ‘প্রেসক্লাব সাংবাদিকদের নিজস্ব নিয়মে চলে। এখানে যেকোনও ধরনের হস্তক্ষেপই স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারে। ইউএনও সরকারি কর্মকর্তা। তাই তার এমন পরামর্শ সরকারকে নিয়ে ভুল বার্তাও ছড়াতে পারে।’

জানতে চাইলে ইউএনও নাজমুস সাদাত রত্ন বলেন, ‘প্রেসক্লাবের সভাপতির সঙ্গে আমার এ বিষয়ে কথা হয়েছে। কিন্তু প্রেসক্লাব বন্ধ রাখার পরামর্শ ওইভাবে পরামর্শ দেওয়া হয়নি।’ কী পরামর্শ দেওয়া হয়েছে জানতে চাইলে ইউএনও বলেন, ‘অফিসে আসেন। সামনাসামনি বলবো।’

এ বিষয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের জেলা কমিটির সাবেক সদস্যসচিব মো. রহমতুল্লাহ বলেন, ‘প্রেসক্লাব আছে সরকারি জায়গায়। সাংবাদিরা কেন সরকারি জায়গায় বসবে? অন্য কোনও জায়গায় প্রেস ক্লাব করলে প্রয়োজনে আমি ভাড়া দেবো। কিন্তু এই প্রেসক্লাব রাখবো না।’

তিনি অভিযোগ করেন, ‘এই প্রেসক্লাব থেকে স্বৈরাচারের আমলে অনেক খারাপ কাজ হয়েছে। জঙ্গি নাটক সাজানো হয়েছে। এই প্রেসক্লাবের ওপর সাধারণ মানুষের অভিশাপ আছে।’

এর আগে ২০১০ সালে একটি সংবাদ নিয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আতাউর রহমান খানের নির্দেশে তার দলীয় কর্মীরা প্রেসক্লাবে তালা মেরে বন্ধ রেখেছিলেন। পরে প্রেসক্লাবটি আবার চালু হয়।

২০১৩ সালে বিএনপির প্রয়াত ভাইস চেয়ারম্যান ও মন্ত্রী মরহুম ব্যারিস্টার আমিনুল হক প্রেসক্লাবে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। এই ক্ষোভে এলাকার তৎকালীন আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য ওমর ফারুক চৌধুরীর নির্দেশে বুলডোজার দিয়ে প্রেসক্লাবটি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। পরের বছর সংস্কার করে পুনরায় প্রেসক্লাবটি চালু করা হয় ।

এরপর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আগুন দিয়ে প্রেসক্লাবটি জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। দীর্ঘ ১৯ মাস বন্ধ থাকার পরে সংস্কার করে চলতি মাসে প্রেসক্লাবটি চালু করা হয়।

/এমএএ/
সম্পর্কিত
সাংবাদিক কামরুজ্জামানের বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহারের দাবি, ১০ দিনের আল্টিমেটাম  
সাংবাদিক মোজাম্মেল বাবুর চিকিৎসার সর্বশেষ প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ
বিচারাঙ্গনে অনিয়ম দেখলে চুপ না থাকার আহ্বান অ্যাটর্নি জেনারেলের
সর্বশেষ খবর
বিডিনিউজ সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদী মারা গেছেন
বিডিনিউজ সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদী মারা গেছেন
বিলাসবহুল তেজস রাজধানী এক্সপ্রেসে নাশতা থেকে রাতের খাবার, কী থাকে মেনুতে?
বিলাসবহুল তেজস রাজধানী এক্সপ্রেসে নাশতা থেকে রাতের খাবার, কী থাকে মেনুতে?
দুর্নীতি মামলায় গ্রেফতার অভিনেতা দিনো মোরিয়া
দুর্নীতি মামলায় গ্রেফতার অভিনেতা দিনো মোরিয়া
নাইকি কেন জৌলুস হারাচ্ছে
নাইকি কেন জৌলুস হারাচ্ছে
সর্বাধিক পঠিত
নির্বাচনের আগেরদিন গ্রেফতার, তবুও বিপুল ভোটে জিতলেন আ.লীগ নেতা
নির্বাচনের আগেরদিন গ্রেফতার, তবুও বিপুল ভোটে জিতলেন আ.লীগ নেতা
ফেসবুকে শেখ হাসিনার জন্মদিনের পোস্ট, স্কুলছাত্র কারাগারে
ফেসবুকে শেখ হাসিনার জন্মদিনের পোস্ট, স্কুলছাত্র কারাগারে
দুই মন্দিরে চুরির ঘটনায় চার জন গ্রেফতার 
দুই মন্দিরে চুরির ঘটনায় চার জন গ্রেফতার 
পাঁচ বছরে ৩২ দফায় বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে এলপিজির দাম
পাঁচ বছরে ৩২ দফায় বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে এলপিজির দাম
ফের বাড়লো তেলের দাম
ফের বাড়লো তেলের দাম