ইলিশের মৌসুম শুরু হলেও ‘ইলিশের বাড়ি’ খ্যাত চাঁদপুরের বাজারে কমছে না ইলিশের দাম। ব্যবসায়ীদের দাবি, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম এবং ইলিশ আহরণের সার্বিক খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় বেড়েছে দাম। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত কয়েক বছর জাটকা সংরক্ষণ, মা ইলিশ রক্ষা কার্যক্রমসহ ইলিশসম্পদ উন্নয়নে গৃহীত কার্যক্রমগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়ন না হওয়া, নদীদূষণ, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবসহ বিভিন্ন কারণে ইলিশের প্রাপ্যতা ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। জেলেরা কাঙ্ক্ষিত ইলিশ না পাওয়ায় প্রভাব পড়েছে গড় খরচে। ফলে বাড়ছে ইলিশের দাম।
চাঁদপুর সদরের পুরান বাজারে এলাকার জেলে আরিফ বলেন, ‘নদীতে মাছ নেই বললেই চলে। গত এক সপ্তাহ আগে নদীতে গিয়েছিলাম কোনোরকম খরচের টাকাটা উঠেছে। মাছ না পাওয়ায় অনেক জেলেই এখন নদীতে যাচ্ছেন না।’
হাইমচরের জেলে সালাউদ্দিন বলেন, ‘একটা ছোট নৌকায় পাঁচ থেকে ছয় জন জেলে থাকে। নদীতে জাল ফেলতে গেলে জ্বালানি তেল, খাওয়া খরচসহ ৩-৪ হাজার টাকা খরচ হয়। কিন্তু সারারাত নদীতে থেকে মাছ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র আড়াই থেকে তিন হাজার টাকার। কারও কারও হয়তো কোনোরকম খরচের টাকাটা ওঠে। এসব কারণে এখন অনেকে নদীতে যেতে চায় না। মাসখানেক পর হয়তো নদীতে কিছু মাছ ধরা পড়তে পারে।’
জেলে জসিম বলেন, ‘জাটকা রক্ষার সময় প্রচুর মাছ ধরা হয়েছে। তা ছাড়া এখনও নদীতে পানি কম। আর আমি কিছুদিন পর হয়তো আমাদের জালে মাছ ধরা পড়বে।’
এদিকে, সোমবার চাঁদপুর বড়স্টেশন মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র ঘুরে দেখা গেছে, বাজারে ইলিশের আমদানি খুবই কম। প্রতিদিন এ বাজারে ১০ থেকে ১৫ মণ ইলিশের সরবরাহ হচ্ছে। এক কেজি ওজনের ইলিশ ২ হাজার ৭০০ থেকে ৩ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ৭০০ থেকে ৮০০ গ্রাম ওজনের ইলিশের দাম ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৩০০ টাকা এবং ৫০০ থেকে ৬০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকায়।
ঢাকা থেকে আসা ক্রেতা জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘ভেবেছিলাম চাঁদপুরে ইলিশের দাম কম হবে। কিন্তু এখানে এসে দেখি দাম আরও বেশি। দুই ঘণ্টা ধরে বাজারে ঘুরছি, কিন্তু মাছ কিনতে পারিনি। বাজারেও মাছ কম। হয়তো খালি হাতেই ফিরে যেতে হবে। ব্যবসায়ীরা আমাদের আশ্বাস দিচ্ছেন, সহসাই মাছের দাম কিছুটা কমবে।’
আরেক ক্রেতা তৌকির হোসেন বলেন, ‘অল্প পরিমাণে হলেও বাজারে কিছু মাছ আছে। কিন্তু যে পরিমাণ দাম তা আমাদের মতো সাধারণ ক্রেতার নাগালের বাইরে।’
মাছ বিক্রেতা হাসিব বলেন, ‘মাছের বাজারের অবস্থা এখন খুবই খারাপ। প্রতিদিন আট-দশ মণ মাছ আসে, যেখানে চাহিদা ২০০-৩০০ মণের। সরবরাহ কম থাকায় মাছের দাম সাধারণ ক্রেতার ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। এ কারণে বাজারে ক্রেতারাও আসছেন না। যারা আসছেন তারা ১০ কেজির জায়গায় কিনছেন ৩ কেজি।
চাঁদপুর মৎস্যবণিক সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক শবে বরাত সরকার বলেন, ‘চাঁদপুর মাছঘাটে গত কয়েকদিন ধরে ঘরে ১০ থেকে ১৫ মণ মাছ আসছে। ইলিশের এই পরিমাণ আমদানি এই বাজারের তুলনায় একেবারেই নগণ্য। ইলিশ মাছের শূন্যতার কারণে আড়তগুলো খালি পড়ে আছে। মাছের সরবরাহ কম এবং দাম বেশি হওয়ার কারণে বাজারে ক্রেতারাও আসছেন না।’
তিনি আরও বলেন, ‘আগামী মাসে সাগর অঞ্চল থেকে ইলিশের সরবরাহ বাড়লে দাম কমে আসবে।’
ইলিশ কম ধরা পড়ছে কেন? এমন প্রশ্নের জবাবে চাঁদপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম বলেন, ‘এখন আষাঢ় মাস চলছে। বৃষ্টিপাত কি আগের মতো হচ্ছে? বৃষ্টি একেবারেই নেই। সেই সঙ্গে নদীদূষণ ও ডুবোচর বেড়ে যাওয়ায় চাঁদপুরে ইলিশ কমে গেছে। তবে নদীতে পানি বাড়লে ইলিশের আমদানি আরও বাড়বে।’
জাটকা ও মা ইলিশ সংরক্ষণে নিষেধাজ্ঞা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমাদের অভিযানগুলোর উদ্দেশ্য হচ্ছে ইলিশের অতি আহরণ নিয়ন্ত্রণ করা। সেটি আমরা করেছি।’









