‘এত খারাপ সময় আর আসেনি, সংসার আর চলছে না’

আব্দুর রহমান, টেকনাফ
১২ মে ২০২৬, ১৬:৪৭আপডেট : ১২ মে ২০২৬, ১৮:০১

বঙ্গোপসাগরে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং ৪৭৫ প্রজাতির মাছের অবাধ প্রজনন ও উৎপাদন বৃদ্ধি নিশ্চিত করতে মাছ ধরার ওপর ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে সরকার। এর ফলে ১৫ এপ্রিল মধ্যরাত থেকে আগামী ১১ জুন পর্যন্ত সাগরে সব ধরনের মাছ ধরা বন্ধ আছে। যদিও এ বছর জ্বালানি সংকটের কারণে নিষেধাজ্ঞার দেড়-দুই মাস আগ থেকে নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরতে যেতে পারেননি জেলেরা। 

জেলেরা বলছেন, এ বছর দীর্ঘমেয়াদে একপ্রকার নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়েছেন তারা। টানা প্রায় চার মাস ধরে চরম খাদ্য সংকট এবং আর্থিক দুরবস্থায় পড়েছেন তারা। বিকল্প আয়ের সুযোগ না থাকায় ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। সরকারি সহায়তার অপর্যাপ্ততা এবং দাদন ব্যবসার কবলে পড়ে হাজারো জেলে পরিবার মানবেতর জীবনযাপন করছে। জীবিকার একমাত্র অবলম্বন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বেশিরভাগ জেলের পরিবারে নেমেছে অনিশ্চয়তা। মিয়ানমার সীমান্তে আরকান আর্মির অস্থিরতা, জেলেদের ধরে নিয়ে যাওয়া, জ্বালানি সংকট এবং এখন চলা নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়ে টেকনাফের কয়েক হাজার জেলে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন।

একাধিক জেলে জানিয়েছেন, মিয়ানমার সীমান্তঘেঁষা এই এলাকায় গত দেড় বছর ধরে আরাকান আর্মি কর্তৃক অপহরণ, নাফ নদী ও সাগরে মাছ ধরাকে ঘিরে ছিল নানা ভয়ভীতি ও অস্থিরতা। সেই পরিস্থিতি না কাটতেই দেখা দেয় জ্বালানি সংকট। এতে অনেক জেলে নিয়মিত সাগরে যেতে পারেননি, ফলে আয়-রোজগার কমে গেছে উল্লেখযোগ্যভাবে। এর মধ্যেই আবার ১৫ এপ্রিল থেকে শুরু হয়েছে ৫৮ দিনের সরকারি নিষেধাজ্ঞা, যা তাদের নতুন করে চাপ তৈরি করেছে। কারণ টেকনাফের অধিকাংশ জেলে নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগরে মাছ শিকার করেই সংসার চালান। দীর্ঘ চার মাস কর্মহীন হয়ে থাকায় না খেয়ে জীবনযাপন করছেন তারা।

নিষেধাজ্ঞার দেড়-দুই মাস আগ থেকে নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরতে যেতে পারেননি জেলেরা

জেলা মৎস্য অফিসের কর্মকর্তারা বলছেন, নিষেধাজ্ঞার সময়ে জেলেদের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে খাদ্য সহায়তা হিসেবে চাল দেওয়া হয়। তবে জেলেদের ভাষ্য, এই চালে সংসার চলে না তাদের।

জেলা মৎস্য অফিসের তথ্যমতে, টেকনাফ উপজেলায় নিবন্ধিত (কার্ডধারী) জেলের সংখ্যা ১০ হাজার ৬৮৩ জন। এসব জেলের রয়েছে ১ হাজার ৫৩২টি নৌযান। পাশাপাশি অনিবন্ধিত আরও এক হাজার জেলে আছেন। এ ছাড়া নাফ নদীর মোহনায়ও কয়েকশ জেলে আছেন। নিবন্ধিত জেলেরা সরকারি সহায়তা পেলে অনিবন্ধিত জেলেরা সহায়তা পান না। ফলে নিষেধাজ্ঞার সময়ে তাদের মানবেতর জীবনযাপন করতে হয়। 

টেকনাফ পৌর শহর থেকে প্রায় ১৪ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত শাহপরীর দ্বীপ। দ্বীপটির অধিকাংশ বাসিন্দা জেলে। যারা নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগরে মাছ শিকার করেই জীবিকা নির্বাহ করেন। এখানে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ৭০০ থেকে ৮০০ মাছ ধরার নৌকা রয়েছে। ছয়টি ঘাটকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে তাদের জীবিকার মূল অবকাঠামো। তবে গত এক বছর ধরে সীমান্তে আরাকান আর্মির তৎপরতা, জ্বালানি সংকট এবং ৫৮ দিনের সরকারি নিষেধাজ্ঞাসহ সবমিলিয়ে চরম অর্থকষ্টে পড়েছেন এখানকার জেলেরা।

শাহপরীর দ্বীপের রহিম উল্লাহ প্রায় ২০ বছর ধরে নাফ নদী ও সাগরে মাছ শিকার করে সংসার চালাচ্ছেন। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এতদিন আরাকান আর্মির কারণে ঠিকমতো মাছ ধরতে পারিনি। এরপর জ্বালানি সংকট, এখন আবার নিষেধাজ্ঞা চলছে। সবমিলিয়ে আমরা খুব বিপদে আছি। আমার পরিবারের সদস্য আট জন। মাছ ধরাই একমাত্র আয়ের উৎস। এখন মাছ ধরতে পারছি না। গত চার মাস ধরে এই অবস্থা চলছে। এত খারাপ সময় আর আসেনি। সংসার আর চলছে না। কোনোমতে খেয়ে না খেয়ে দিন পা এ বছর দীর্ঘমেয়াদে একপ্রকার নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়েছেন তারা র করছি।’ 

শুধু রহিম উল্লাহ নন, তার মতো একই অবস্থা মো. সুলায়মান, মোহাম্মদ ইব্রাহীম ও বেলাল উদ্দিনসহ হাজারো জেলের। জীবিকার অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে তাদের।

 

শাহপরীর দ্বীপ পশ্চিম ঘাটের প্রধান আব্দুর গফুর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘জেলেদের খারাপ সময় যাচ্ছে। ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞার মধ্যে জেলেরা কীভাবে সংসার চালাবে সেটাই বড় দুশ্চিন্তা। এর আগেই অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার জ্বালানি সংকট এবং সীমান্তে অস্থিরতার কারণে জেলেরা চার মাস মাছ ধরতে পারেনি।’

তিনি আরও বলেন, ‘নিবন্ধিত হাজারো জেলে কোনও সহায়তা পায় না। নিবন্ধিত জেলেরা মাঝেমধ্যে কিছু চাল সহায়তা পেলেও তা দিয়ে সংসার চলে না। দাদনের কবলে জর্জরিত অনেকে। ফলে অধিকাংশ জেলে পরিবার মানবেতর জীবনযাপন করছে। এখানকার জেলেরা এখনও জীবিকার অনিশ্চয়তা, নিরাপত্তাহীনতা ও প্রাকৃতিক ঝুঁকির সঙ্গে লড়াই করে যাচ্ছে। অথচ জেলেদের এই কষ্ট নিয়ে কেউ ভাবে না।’

জানতে চাইলে কক্সবাজার জেলা মৎস্য কর্মকর্তা নাজমুল হুদা বলেন, ‘নিষেধাজ্ঞার সময়ে জেলেদের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে চাল সহায়তা দেওয়া হবে। টেকনাফে সাড়ে ১০ হাজারের বেশি জেলের জন্য ৮২৬ দশমিক ১১৬ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তাদের মাছে এই চাল বিতরণ কার্যক্রম শুরু হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘নিবন্ধিত জেলেরা যেন জ্বালানি তেলের কোনও সংকটে না পড়েন, সে বিষয়ে আমাদের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট সব জায়গায় প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তারপরও কিছু এলাকায় সমস্যা হওয়ার কথা আমরা শুনেছি। সেগুলো দ্রুত সমাধানের জন্য কাজ চলছে।’
 

/এএম/ 
সম্পর্কিত
সীমান্তের ওপারে বিস্ফোরণের বিকট শব্দে টেকনাফে আতঙ্ক
করলার ঝোলে পাঁচমিশালি মাছ
গভীর সমুদ্রে ইঞ্জিন বিকল, ১০ জেলেকে উদ্ধার করলো কোস্ট গার্ড
সর্বশেষ খবর
পেলের বিশ্বকাপ রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছেন কেইন
পেলের বিশ্বকাপ রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছেন কেইন
যুবদল নেতার চেম্বারে চার যুবককে নির্যাতন, কাটা হলো চুল
যুবদল নেতার চেম্বারে চার যুবককে নির্যাতন, কাটা হলো চুল
ক্রিয়েটিভ নারীদের জন্য তিনটি চমৎকার ঘরোয়া কাজের আইডিয়া
ক্রিয়েটিভ নারীদের জন্য তিনটি চমৎকার ঘরোয়া কাজের আইডিয়া
প্রুফি কফি বনাম সাধারণ কফি: আপনার রুটিনে কোনটি থাকা উচিত
প্রুফি কফি বনাম সাধারণ কফি: আপনার রুটিনে কোনটি থাকা উচিত
সর্বাধিক পঠিত
‘এখন ক্ষমতা আছে গ্রেফতার দেখান, আমরাও শেষ দেখে নেবো’
‘এখন ক্ষমতা আছে গ্রেফতার দেখান, আমরাও শেষ দেখে নেবো’
এরদোয়ানকে ‘শান্ত হতে’ বললেন নেতানিয়াহু
এরদোয়ানকে ‘শান্ত হতে’ বললেন নেতানিয়াহু
ব্যাংক থেকে ব্যাংকে ডিজিটাল লেনদেনে নতুন নির্দেশনা 
ব্যাংক থেকে ব্যাংকে ডিজিটাল লেনদেনে নতুন নির্দেশনা 
অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা ইসলাম গার্মেন্টস, কারণ কী
অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা ইসলাম গার্মেন্টস, কারণ কী
অন্ধ ঘোড়ার দেখভাল করা কলেজছাত্রের জন্য উপহার পাঠালেন প্রধানমন্ত্রী
অন্ধ ঘোড়ার দেখভাল করা কলেজছাত্রের জন্য উপহার পাঠালেন প্রধানমন্ত্রী