X
শনিবার, ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৩
২০ মাঘ ১৪২৯

বেপরোয়া মৌসুমি জেলেরা, ধরা হচ্ছে মা ইলিশ

সালেহ টিটু, বরিশাল
১৫ অক্টোবর ২০২২, ২৩:৫৯আপডেট : ১৬ অক্টোবর ২০২২, ১৪:২১

দিনের বেলায় ক্রেতার সঙ্গে দরদাম ঠিক করে রাতে মা ইলিশ সরবরাহ করছেন অসাধু জেলেরা। এ ক্ষেত্রে কেজি থেকে শুরু করে প্রায় দুই কেজি ওজনের ইলিশ মিলছে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা কেজি দরে। এসব মাছ সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে কিনছেন খোদ পুলিশ সদস্যরাও। আর প্রতিটি ইলিশের পেটে রয়েছে ডিম, যা থেকে জন্ম নিতো লাখ লাখ ইলিশ।

বরিশালের শায়েস্তাবাদ উপজেলার আড়িয়াল খা শাখা নদী থেকে শুরু করে মুলাদী, উজিরপুর, বানারীপাড়া, বাবুগঞ্জ, হিজলা, মেহেন্দীগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় এভাবে প্রতি রাতে মা ইলিশ নিধনে মহোৎসবে মেতেছে মৌসুমি জেলেরা।

সাধারণ ক্রেতা সেজে দিনের বেলায় ইলিশের দরদাম ঠিক করা হয়। রাত সাড়ে ১০টায় চুপিসারে দুটি বড় সাইজের ইলিশ মেলে, যার ওজন ছিল প্রায় ৩ কেজি। দাম দিতে হয়েছে দেড় হাজার টাকা। এরপর যার মাধ্যমে কেনা হয়, তার মাধ্যমেই টাকা দিতে হয়েছে। ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করতে এভাবেই জানা যায় অসাধু জেলেদের ইলিশ নিধন কার্যক্রম।

ইলিশের সঙ্গে ধরা পড়ছে ঢাউস সাইজের পাঙাশ মাছ, যা তাদের বাড়তি আয় এনে দিচ্ছে বলে জানান একাধিক জেলে জানান। ইতিমধ্যে আড়িয়াল খাঁ নদী থেকে জেলেদের জালে ধরা পড়েছে বড় বড় সাইজের পাঙাশ। এসব পাঙাশ আবার খালের পাড়ের পানিতে বেঁধে রেখে ৬০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করা হয়।

সবচেয়ে বেশি মা ইলিশ নিধন চলছে হিজলা উপজেলার মেঘনা নদী থেকে। সেখানে দলবদ্ধ হয়ে জেলেরা ইলিশ শিকারে নামে। তারা জেল-জরিমানা কোনও কিছুই মানছে না। প্রশাসন থেকে অভিযান চালাতে গেলে উল্টো তাদের ওপর হামলা চালাচ্ছে। গত বছরও একইভাবে অভিযান চলাকালে ইউএনওসহ পুলিশ সদস্যের ওপর হামলা চালানো হয়। এ বছরও একইভাবে তারা হামলা চালিয়ে মৎস্য কর্মকর্তা ও পুলিশসহ ২০ জনকে আহত করে।

বেপরোয়া মৌসুমি জেলেরা, ধরা হচ্ছে মা ইলিশ

মুলাদী উপজেলার আড়িয়াল খাঁ, জয়ন্তী, নয়াভাঙ্গুলী নদীতে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চলছে মা ইলিশ নিধন। যার সঙ্গে জড়িত রয়েছে মৌসুমি জেলে থেকে শুরু করে কিছু প্রকৃত জেলেও। ওই তিন নদীতে অভিযান চালাতে ছয়টি ট্রলার থাকলেও ট্রলারের ভাড়া বাবদ অভিযান থেকে জব্দ করা ইলিশ ও জালের তিন ভাগের এক ভাগ ট্রলার মালিককে দিতে হয় বলে জানিয়েছেন ট্রলারের মাঝি সত্তার হাওলাদার ও মনির মল্লিক। ট্রলার মালিক ওই মাছ ও জাল বিক্রি করে ট্রলারের তেল কেনেন ও কর্মরত দুজনকে তিন বেলা খাবার দিচ্ছেন।

এদিকে নিয়মিত অভিযানের জন্য প্রয়োজন পুলিশ সদস্য, তা-ও মিলছে না বলে জানিয়েছেন মুলাদী উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা। সেখানকার জেলেরাও রাত-দিন নদীতে ‍মা ‍ইলিশ শিকার করছেন।

বরিশাল সদর উপজেলা শায়েস্তাবাদ ইউনিয়ন জেলে সমিতির সহসভাপতি খোরশেদ মন্সিসহ একাধিক জেলের সঙ্গে আলাপকালে জানা গেছে, বেশির ভাগ জেলে এখন শ্রমিকের কাজ করছেন। সরকার থেকে খাদ্যসহায়তা দেওয়া হলেও তাতে ৪ থেকে ৫ দিন ভাত খাওয়া যায়। কিন্তু ভাতের সঙ্গে তরকারি কিংবা অন্য কিছু খেতে হলে আয় করতেই হবে। এ কারণে তারা দিনমজুর হিসেবে কাজ করছেন। কেউ জাল ও মাছ ধরার ট্রলার ঠিক করার কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন।

সবার দাবি বিকল্প একটি কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দেওয়া। যাতে প্রতিদিন কমপক্ষে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা আয় করা যায়। তাতে কোনোভাবে ঋণগ্রস্ত হতে হয় না। এমনিতেই দাদন এনে আড়তদারদের কাছে ঋণগ্রস্ত হয়ে আছে। তার মধ্যে ইলিশ শিকার বন্ধ থাকলে আর কাজ না পেলে বিভিন্ন এনজিও থেকে ঋণ আনতে বাধ্য হন তারা।

বরিশাল জেলা জেলে সমিতির সাধারণ সম্পাদক বাবুল মীরা বলেন, নির্ধারিত সময়ে নিষেধাজ্ঞা শুরু হলেও আজ পর্যন্ত জেলেরা খাদ্যসহায়তা পায়নি। তার মতে, প্রকৃত জেলেরা নদীতে নামছে না। মৌসুমি জেলেরা যারা রিকশা-ভ্যান ও গার্মেন্টেসের সঙ্গে জড়িত, তারা বাড়িতে এসে ইলিশ শিকার করছে।

তিনি আরও বলেন, যে ট্রলার অভিযানে নেওয়া হয়, তাদের যত সামান্য টাকা এবং অভিযানে পাওয়া জাল ও ইলিশ মাছের কিছু অংশ দেওয়া হয়। তিনি সব জেলেকে খাদ্যসহায়তা দেওয়া এবং নতুন যারা ইলিশ শিকারে এসেছে, তাদের নিববন্ধনের মধ্যে আনার দাবি জানান।

পরিবেশ ও সমাজকর্মী কাজী মিজানুর রহমান বলেন, মৎস্য ‍আইনে ট্রলার ও নৌকা জব্দ করতে বলা হয়েছে। কিন্তু তা করা হচ্ছে না। জেলেনৌকা ও ট্রলারের তালিকা করা প্রয়োজন ‍এবং তা নির্দিষ্ট দিনে নদী এলাকায় জব্দ করে রাখা। জেলেদের সঠিক সংখ্যা নেই। যারা জেলে, তারা চাল পাননি। আবার চাল ছাড়াতে টন প্রতি যে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়, তা যত সামান্য। এ জন্য চাল আনা থেকে শুরু করে বিতরণ পর্যন্ত অর্থ দিতে হবে।

বেপরোয়া মৌসুমি জেলেরা, ধরা হচ্ছে মা ইলিশ

তিনি আরও বলেন, শত শত কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে ইলিশ পাহারায়। গত পাঁচ বছর পর্যন্ত বলে আসছি ড্রোন দিয়ে তদারকিতে আনা। বিভিন্ন জায়গায় স্টেশন করে সেখান থেকে মনিটরিং করা সম্ভব। নিষিদ্ধ সময়ে ইলিশ শিকারের সঙ্গে জড়িত রয়েছে, যারা এর তদারকিতে রয়েছেন তারাও জড়িত। এ জন্য আইনটির কঠোরতা বাড়ানো দরকার বলে মনে করেন তিনি।

মৎস্য কর্মকর্তা (ইলিশ) বিমল চন্দ্র দাস বলেন, বরিশাল জেলায় নিবন্ধন করা মোট জেলের সংখ্যা ৭৫ হাজার ৬৯০। এর মধ্যে ৩০ কেজি করে চাল পাচ্ছেন ৫১ হাজার ৭০০ জেলে। তার মধ্যে যারা নিষেধাজ্ঞার মধ্যে মা ইলিশ শিকার করছে, তারা সবাই মৌসুমি অসাধু জেলে। প্রকৃত জেলেরা কেউ নদীতে নামছেন না। তারা যথেষ্ট সচেতন বলে দাবি করেন তিনি।

বরিশাল জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান বলেন, সরকার থেকে কমবেশি অর্থসহায়তা দেওয়া হয়। তা দিয়ে নৌযান ভাড়া করে অভিযান পরিচালিত হয়ে আসছে। অভিযান থেকে পাওয়া ইলিশ ও জালের অংশবিশেষ দিয়ে অভিযান পরিচালনার বিষয়টি তার জানা নেই। খাদ্যসহায়তার বিষয়ে দাবি করেন জেলেদের মাঝে চাল বিতরণ শুরু হয়েছে। বাস্তবে এখনও চাল বিতরণ শুরু হয়নি।

ড্রোনের ব্যবহার করা যেতে পারে কি না, এ প্রশ্নের জবাবে এই কর্মকর্তা বলেন, তা সময়ের ব্যাপার। আমরা আপ্রাণ চেষ্টা করছি মা ইলিশ রক্ষায়। এ জন্য জেলা থেকে উপজেলা এবং গ্রাম পর্যায়ে পর্যন্ত বিভিন্ন নদীতে অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। ইতিমধ্যে বহু সংখ্য জেলেদের অর্থ ও কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। হাজার হাজার মিটার জাল ধ্বংস করা হয় এবং জব্দকৃত ইলিশ গরিবের মাছে বিতরণ করা হয়েছে। দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা নজরদারিতে রাখা হয়েছে।

কোস্টগার্ড ও নৌ পুলিশের নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করেছে, বেশির ভাগ রাতের বেলায় ইলিশ শিকারে নামছে মৌসুমি জেলেরা। তাদের আটক করে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে কারাদণ্ড দেওয়া হচ্ছে।

/এনএআর/
সর্বশেষ খবর
সড়কে লাশ হলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী
সড়কে লাশ হলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী
ব্রাহ্মণবাড়িয়া সীমান্ত থেকে আহত অবস্থায় এক যুবককে উদ্ধার
ব্রাহ্মণবাড়িয়া সীমান্ত থেকে আহত অবস্থায় এক যুবককে উদ্ধার
রংপুরে বিএনপির বিভাগীয় সমাবেশের মঞ্চ ভেঙে দেওয়ার অভিযোগ
রংপুরে বিএনপির বিভাগীয় সমাবেশের মঞ্চ ভেঙে দেওয়ার অভিযোগ
নিজের বিয়েতে নাচতে হবে কিয়ারাকে, এটাই রীতি!
নিজের বিয়েতে নাচতে হবে কিয়ারাকে, এটাই রীতি!
সর্বাধিক পঠিত
যা থাকছে ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনে
যা থাকছে ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনে
‘বারবার বলেছি আর মারিস না’
‘বারবার বলেছি আর মারিস না’
যুক্তরাষ্ট্রে উড়ছে চীনের গোয়েন্দা বেলুন, প্রস্তুত এফ-২২ যুদ্ধবিমান
যুক্তরাষ্ট্রে উড়ছে চীনের গোয়েন্দা বেলুন, প্রস্তুত এফ-২২ যুদ্ধবিমান
৫০০ ছাত্রীর মধ্যে নিজেকে একা দেখে জ্ঞান হারালো ছাত্র
৫০০ ছাত্রীর মধ্যে নিজেকে একা দেখে জ্ঞান হারালো ছাত্র
৩০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি, ৮ ঘণ্টা পর মিললো লাশ
৩০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি, ৮ ঘণ্টা পর মিললো লাশ