ঘূর্ণিঝড় গোর্কির ভয়াল স্মৃতি

‘ঝড়ের পর দেখলাম, গাছে গাছে মানুষের লাশ ও সাপ’

ভোলা প্রতিনিধি
১২ নভেম্বর ২০২২, ০৮:৪৯আপডেট : ১২ নভেম্বর ২০২২, ০৮:৪৯

আজ সেই ভয়াল ১২ নভেম্বর। ১৯৭০ সালের এই দিনে ‘ঘূর্ণিঝড় গোর্কির’ আঘাতে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের চার লাখেরও বেশি ঘরবাড়ি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। ক্ষতিগ্রস্ত হন ৩৬ লাখ মানুষ। শুধু ভোলাতেই মারা যান কমপক্ষে পাঁচ লাখ মানুষ। ঘটনার ৫২ বছর পরও সেই দুঃসহ স্মৃতি ভুলতে পারছে না দক্ষিণ জনপদের মানুষ। 

সত্তর সালের ১২ নভেম্বর রাতে ভয়াল ঘূর্ণিঝড় গোর্কির ছোবলে লন্ডভন্ড হয়ে গিয়েছিল ভোলার বিস্তীর্ণ জনপদ। জেলার মনপুরা, চর নিজাম, ঢালচর, কুকরি-মুকরিসহ গোটা এলাকা মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছিল। স্থানীয়দের মতে অন্তত পাঁচ লাখ মানুষ মারা গিয়েছিল ভোলায়।

সেই দিন ভোলার এমন কোনও গ্রাম ছিল না, যে গ্রামের কেউ না কেউ মারা যায়নি। আশ্রয়কেন্দ্র না থাকায় গাছে উঠে প্রাণ বাঁচিয়েছিলেন অনেকে। ঘরবাড়ি ফসল আর প্রিয়জন হারিয়ে শোকে কাতর হয়ে পড়েছিলেন মানুষ। গোর্কির আঘাত এবং ভয়াবহতা এতই নির্মম ছিল যে- সেই দিনের কথা মনে পড়লে আজও আতঙ্ক আর ভয়ে শিহরে ওঠে ভোলাবাসীর প্রাণ।

সেই বিভীষিকাময় ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে মো. আনোয়ার মিয়া বলেন, ‘১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর ভোলাসহ উপকূলীয় এলাকা দিয়ে বয়ে গিয়েছিল ঘূর্ণিঝড়। ১০ নভেম্বর থেকেই গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি ছিল, এর পরদিন বৃষ্টি ছিল, সঙ্গে ছিল হালকা বাতাস। ১২ তারিখে রাতে প্রচণ্ডভাবে আঘাত হানে। তখন কোনও ধরনের সিগন্যাল বা আবহাওয়ার কোনও খবর ছিল না। সকালে দেখলাম, সদর রোডসহ বিভিন্ন এলাকায় এক মাজা পানি, সবকিছু ডুবে গেছে।’

তিনি বলেন, ‘সব দিকে ঘুরে দেখলাম, সব বাড়িঘর,গাছ-পালা একদম ভেঙে লন্ডভন্ড হয়ে গেছে। সব জায়গায় লাশ আর লাশ। মানুষের গবাদিপশুসহ সব কিছু নষ্ট হয়ে গেছে। যারা বেঁচে ছিলেন তাদেরও ছিল না বেঁচে থাকার মতো কোনও সম্বল। ছিল না খাবার বা পরার পোশাক। সেই দিনের সেই ভয়াবহ স্মৃতির কথা মনে পড়লে আজও ভয় লাগে।’

‘ঝড়ের পর দেখলাম, গাছে গাছে মানুষের লাশ ও সাপ’

আলমগীর গোলদার বলেন, ‘ঝড়ের পর দিন দেখলাম, নৌকাগুলো সব গাছের মাথায় আটকে আছে। গাছে গাছে মানুষের লাশ এবং সাপ একত্রে পেঁচিয়ে আছে। কত মানুষ যে মারা গেছে, সেই হিসাব করার মতো কোনও অবস্থা ছিল না। নদীতে কচুরিপানার মতো মানুষের লাশ ভাসছিল। মানুষকে গণকবর দেওয়া হয়েছে। এক কবরে কতজনকে দেওয়া হয়েছে সেই হিসাব করা সম্ভব হয়নি। সেই কথা মনে উঠলে এখনও গা শিউরে ওঠে। এখনও বাতাস-বৃষ্টি দেখলে বা কোনও সিগন্যালের কথা শুনলে ভয়ে ঘর থেকে বের হয়ে বাইরে বসে থাকি।’

আবু তাহের বলেন, ‘ঝড়ের কয়েকদিন পরে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের সহায়তার জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ত্রাণসামগ্রী নিয়ে আসেন। এরপর আসেন মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী। সে সময় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ এবং কোনও সাইক্লোন শেল্টার না থাকায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বেশি হয়েছে। এখনও ভোলায় পর্যাপ্ত আশ্রয়কেন্দ্র নেই।’

১৯৭০ সালের ঘূর্ণিঝড়ের পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ক্ষতিগ্রস্ত এসব মানুষের দুর্দশা দেখার জন্য ভোলা সদর, মনপুরা ও কুকরি-মুকরিসহ বিভিন্ন এলাকায় আসেন। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশেই ভোলার মানুষের জানমাল এবং গবাদিপশু রক্ষায় বনায়ন ও কিল্লা নির্মাণের কাজ শুরু হয়। তবে এখনও প্রয়োজন অনুযায়ী আশ্রয়কেন্দ্র নির্মিত না হওয়ায় বিভিন্ন চরাঞ্চল ও দুর্গম এলাকার ছয় লক্ষাধিক মানুষের দিন কাটে ঝুঁকির মাঝে।

ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচির উপ-পরিচালক আব্দুর রশীদ জানান, ১৯৭০ সালে ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় বাংলাদেশের সক্ষমতা কম ছিল। কিন্তু এখন তা অনেক বেড়েছে। ভোলা জেলায় বিভিন্ন ঝড় মোকাবিলা করার জন্য সিপিপির ১৩ হাজার স্বেচ্ছাসেবী ও ৭৪৬টি আশ্রয়কেন্দ্র রয়েছে। এ ছাড়া ভোলা জেলায় আরও কিছু আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করা হবে।

ভোলা জেলায় ২২ লাখ মানুষের বাস। এসব মানুষের নিরাপত্তার জন্য বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং আশ্রয়কেন্দ্র মিলিয়ে ৭৪৬টি প্রতিষ্ঠান দুর্যোগ মোকাবিলায় ব্যবহার করা হয়।

/এফআর/
সম্পর্কিত
এক ঘূর্ণিঝড়ে নিয়ে গেছে ১১০০ কোটি টাকা, কেমন আছেন সাইদুলরা
মাসের দ্বিতীয়ার্ধে ঘূর্ণিঝড় ও তীব্র কালবৈশাখীর শঙ্কা
চলতি মাসে তাপপ্রবাহ-ঘূর্ণিঝড়ের শঙ্কা, সঙ্গে ভারী বৃষ্টির সতর্কতা
সর্বশেষ খবর
জনগণের আস্থা অর্জনে কাজ করছে জাতীয় সংসদ: স্পিকার
জনগণের আস্থা অর্জনে কাজ করছে জাতীয় সংসদ: স্পিকার
এই অর্জন বাংলাদেশের শক্তিশালী কূটনৈতিক অবস্থানকে তুলে ধরে: খলিলুর রহমান  
এই অর্জন বাংলাদেশের শক্তিশালী কূটনৈতিক অবস্থানকে তুলে ধরে: খলিলুর রহমান  
‘মুখ খোলো মমতা, জানতে চায় জনতা’ স্লোগানে ইনকিলাব মঞ্চের মশাল মিছিল
‘মুখ খোলো মমতা, জানতে চায় জনতা’ স্লোগানে ইনকিলাব মঞ্চের মশাল মিছিল
আর্জেন্টিনা আরও চার ফুটবলারকে প্রস্তুত রাখছে
আর্জেন্টিনা আরও চার ফুটবলারকে প্রস্তুত রাখছে
সর্বাধিক পঠিত
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী