কষ্টে বেঁচে আছি, ঋণের বোঝা মাথায় নিয়েই মরতে হবে

ইবরাহিম সোহেল, বরগুনা
১২ মে ২০২৬, ০৮:৪৫আপডেট : ১২ মে ২০২৬, ০৮:৪৫

জেলে হলেও এখনও জেলে কার্ড পাননি বরগুনার আলী হোসেন। ফলে সরকারি সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এ অবস্থায় মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞার সময়ে অভাব-অনটনের মধ্য দিয়ে দিন কাটে তার।

আলী হোসেন জানান, ১১ বছর ধরে নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন। তবে সংশ্লিষ্ট দফতরে একাধিকবার যোগাযোগ করেও এখন পর্যন্ত জেলে কার্ড পাননি। এতে করে সরকারের পক্ষ থেকে জেলেদের জন্য বরাদ্দ করা খাদ্য সহায়তা, ভিজিএফ কার্ডসহ অন্যান্য সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তিনি।

আলী হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নদীতে মাছ ধরি। জেলে কার্ডের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমাও দিয়েছিলাম জেলা মৎস্য অধিদফতরে। কিন্তু কার্ড পাইনি। জেলে কার্ড না থাকায় সরকারি কোনও সহায়তা পাই না। ফলে নিষেধাজ্ঞার সময়ে সংসার চালানো কষ্টকর হয়ে যাচ্ছে। শীতের মৌসুমে দস্যুদের ভয়, বর্ষায় ঘূর্ণিঝড়ের ভয় আর প্রাকৃতিক দুযোর্গ তো আছেই। এর মধ্যে চলে জীবন-জীবিকা। বছরে তিন মাস থাকে নিষেধাজ্ঞা। সবমিলিয়ে স্ত্রী-তিন ছেলেমেয়ে নিয়ে কষ্টে আছি।’

জেলা মৎস্য অফিসের তথ্যমতে, জেলার ৫৬ হাজার জেলের কার্ড রয়েছে। তবে জেলায় লক্ষাধিক জেলে রয়েছেন। জেলে কার্ড অনুযায়ী প্রতি বছর জেলেদের সহায়তা দেওয়া হয়। তবে অর্ধলাখ কার্ডবিহীন জেলেকে কোনও ধরনের সহায়তা দেওয়া সম্ভব হয় না। সরকার বরাদ্দ বাড়ালে অন্যদেরও কার্ড দেওয়া হবে।

জেলেদের অভিযোগ, প্রকৃত জেলেদের তালিকায় অনেক সময় বাইরের লোকজন অন্তর্ভুক্ত হন। এতে প্রকৃত জেলেরা কার্ড থেকে বঞ্চিত হন। ফলে এসব জেলের দুঃখ-কষ্টে সংসার চালাতে হয়। আলী হোসেনের মতো অন্তত ২০ হাজার প্রকৃত জেলে রয়েছে। তাদের জেলে কার্ড দেওয়া জরুরি।  

মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞার সময়ে অভাব-অনটনের মধ্য দিয়ে দিন কাটে জেলেদের

বরগুনার মাছ ধরার ট্রলারের মাঝি জেলে বাবুল মিয়া বলেন, ‘অনেক ঝুঁকি নিয়ে আমরা সাগরে মাছ ধরি। আলী হোসেনের মতো এমন ২০ হাজার জেলে আছেন, যারা বছরের পর বছর জেলে পেশায় থাকলেও কার্ড পাচ্ছে না। ফলে সরকারি সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। মৎস্য কর্মকর্তাদের উচিত প্রকৃত জেলেদের বাছাই করে কার্ডের আওতাভুক্ত করা। মহাজন ও আড়তদারদের কাছ থেকে দাদনের ওপর টাকা নিয়ে আমাদের চলতে হয়। কোনোভাবেই দাদনের ভেড়াজাল থেকে বেরিয়ে আসতে পারছি না আমরা। দুঃখ-কষ্টে বেঁচে আছি। সরকার আমাদের সহযোগিতা না করলে অনাহারে শেষ হয়ে যাবো। আর মারা গেলেও ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে মরতে হবে। এটাই জেলেদের অবস্থা। এভাবে বছরের পর বছর চলছি আমরা।’

জেলা মৎস্য শ্রমিক ইউনিয়নের সদস্য এনামুল হক ইমু বলেন, ‘এবার সমুদ্রে মাছ কম। তার মধ্যে আবার অবরোধ ছিল। তেলের সংকটে প্রায় দুই মাস কোনও জেলে সমুদ্রে যেতে পারেনি। এ সময় জেলেদের অনেক কষ্টে দিন পার করতে হয়েছে। তবে যারা নিবন্ধিত জেলে, তারা মোটামুটি চলতে পারে। অন্যদিকে অনিবন্ধিত জেলেদের কষ্টের শেষ থাকে না। দুই বছর আগেও জেলেদের যে সরকারি সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হতো, তা মোটামুটি ভালোই ছিল। কিন্তু গত এক বছর ধরে সহায়তার নামে স্বজনপ্রীতি চলছে। তবে আমরা আবার তালিকা করছি—যারা এখনও জেলে কার্ড পাননি, তাদের নতুন করে জেলে কার্ড দেওয়া হবে।’

মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা থাকায় সাগরে যেতে পারছেন না জেলেরা

জেলা মৎস্য শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক দুলাল মাস্টার বলেন, ‘আমাদের দক্ষিণাঞ্চলে বিশেষ করে বরগুনায় প্রায় লক্ষাধিক জেলে রয়েছেন। এদের অধিকাংশ জেলে কার্ডের আওতাভুক্ত নন। আমরা অনিবন্ধিত জেলেদের জন্য কাজ করে যাচ্ছি। যাতে তারা দ্রুত সরকারি সব সুযোগ-সুবিধা পেতে পারেন।’

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বরগুনা জেলা মৎস্য মালিক সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কার্ডধারী জেলে রয়েছেন ৫৬ হাজারের মতো। কিন্তু বাস্তবে লক্ষাধিক জেলে আছেন। ওসব জেলেকে সরকারি সহায়তার আওতায় আনা না হলে একসময় মৎস্য খাতে বড় ধস নেমে আসবে।’

এ বিষয়ে জলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ জিয়া উদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘যারা প্রকৃত জেলে হওয়া সত্ত্বেও কার্ড থেকে বঞ্চিত তারা নিয়ম অনুযায়ী আবেদন করলে যাচাই-বাছাই করে ব্যবস্থা করা হবে। যারা জেলে না হয়েও কার্ডের আওতাভুক্ত, তাদের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ পেলে কার্ড বাতিল করা হবে।’ 

/এএম/ 
সম্পর্কিত
গভীর সমুদ্রে ইঞ্জিন বিকল, ১০ জেলেকে উদ্ধার করলো কোস্ট গার্ড
ট্রলারসহ পাঁচ জেলেকে ধরে নিয়ে গেছে আরাকান আর্মি
চাঁদাবাজির প্রতিবাদে সড়কে মাছ ছিটিয়ে জেলেদের বিক্ষোভ
সর্বশেষ খবর
আর্জেন্টিনাকে স্তব্ধ করে বড় অঘটন চায় কেপ ভার্দে
আর্জেন্টিনাকে স্তব্ধ করে বড় অঘটন চায় কেপ ভার্দে
জাতিসংঘ সদর দফতরের সামনে গায়ে আগুন দিয়ে ব্যক্তির মৃত্যু
জাতিসংঘ সদর দফতরের সামনে গায়ে আগুন দিয়ে ব্যক্তির মৃত্যু
ব্রাজিলের পর ফ্রান্সের প্রশংসা করলেন আর্জেন্টিনা কোচ
ব্রাজিলের পর ফ্রান্সের প্রশংসা করলেন আর্জেন্টিনা কোচ
ঋণের কিস্তির চাপ সইতে না পেরে ব্যবসায়ীর আত্মহত্যা
ঋণের কিস্তির চাপ সইতে না পেরে ব্যবসায়ীর আত্মহত্যা
সর্বাধিক পঠিত
খামেনির শেষ বিদায়: চার মাস কীভাবে সংরক্ষণ করা হলো মরদেহ
খামেনির শেষ বিদায়: চার মাস কীভাবে সংরক্ষণ করা হলো মরদেহ
এমপি মনির বক্তব্য ‘ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান’ ছাত্রদল সভাপতির
এমপি মনির বক্তব্য ‘ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান’ ছাত্রদল সভাপতির
৫৪ বছরের ইতিহাসে প্রথমবার ঐকমত্যে সরকার-বিরোধী দল: চিফ হুইপ 
৫৪ বছরের ইতিহাসে প্রথমবার ঐকমত্যে সরকার-বিরোধী দল: চিফ হুইপ 
অবশেষে খুলছে জুলাই স্মৃতি জাদুঘর 
অবশেষে খুলছে জুলাই স্মৃতি জাদুঘর 
আমেরিকার জনপ্রিয় ‘টুডে শো’ মাতালেন সানজয় ও নোরা ফাতেহি
আমেরিকার জনপ্রিয় ‘টুডে শো’ মাতালেন সানজয় ও নোরা ফাতেহি