পটুয়াখালীর কুয়াকাটা-সংলগ্ন বঙ্গোপসাগরের গভীর সমুদ্রে জেলের জালে ধরা পড়েছে ‘সোলজার ফিশ’ নামে একটি বিরল সামুদ্রিক মাছ। লালচে বর্ণ ও ভিন্নধর্মী গঠনের মাছটি আলীপুর মৎস্যবন্দরে এনে বরফে সংরক্ষণ করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বন্দরে আনার পর সেটি দেখতে উৎসুক মানুষের ভিড় জমে।
জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এফবি মায়ের দোয়া ট্রলারের মাঝি ইদ্রিস মিয়ার জালে তিন-চার দিন আগে গভীর সমুদ্রে মাছটি ধরা পড়ে। পরে বৃহস্পতিবার বিক্রির জন্য আলীপুর মৎস্যবন্দরের মেসার্স সিফাত ফিশ আড়তে আনা হয়।
ট্রলারের মাঝি ইদ্রিস মিয়া বলেন, ‘গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার জন্য জাল ফেলাইছিলাম। জাল টাইনা তোলার সময় অন্য মাছের লগে এই মাছ উইঠ্যা আসে। এর নামও আমি জানতাম না। দ্যাখতে খুব সুন্দর হওয়ায় আমরা এইডা ফেলাইয়া না দিয়া তীরে লইয়া আইছি। আমার জালে এই ধরনের মাছ এই প্রথম ধরা পড়ছে।’
মেসার্স সিফাত ফিশ আড়তের ম্যানেজার মাইনুল ইসলাম শামিম বলেন, মাছটি দেখতে অনেক সুন্দর। তাই বরফ দিয়ে সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে। আগে কখনও এমন মাছ দেখিনি।
মাছটির ছবি দেখে পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ বায়োলজি অ্যান্ড জেনেটিকস বিভাগের চেয়ারম্যান রাজিব সরকার জানান, উজ্জ্বল লাল বা কমলা রং, বড় চোখ, চাপা ডিম্বাকার দেহ, শক্ত আঁশ ও কাঁটাযুক্ত পৃষ্ঠীয় পাখনা এই মাছের প্রধান বৈশিষ্ট্য। বড় চোখের কারণে অল্প আলোতেও এই মাছ সহজে চলাচল ও খাদ্য সংগ্রহ করতে পারে। এরা সাধারণত নিশাচর। সামুদ্রিক খাদ্যশৃঙ্খলে সোলজার ফিশ গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী ভোক্তা হিসেবে ভূমিকা রাখে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে এর আগে মূলত সেন্ট মার্টিনের প্রবালপ্রাচীর এলাকায় সোলজার ফিশের উপস্থিতির তথ্য পাওয়া গেছে। কুয়াকাটা-সংলগ্ন বঙ্গোপসাগরে এ মাছ ধরা পড়া উপকূলীয় সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের জন্য উল্লেখযোগ্য ঘটনা। এটি ইঙ্গিত করতে পারে, পরিবেশগত পরিবর্তন, সামুদ্রিক স্রোত, পানির তাপমাত্রা বা খাদ্যের প্রাপ্যতার কারণে এ মাছ নতুন এলাকায় বিস্তৃত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মাছটির সঠিক প্রজাতি নিশ্চিত করতে দেহগত বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণের পাশাপাশি ডিএনএ বারকোডিং প্রয়োজন। এ ধরনের গবেষণা বঙ্গোপসাগরের সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য, মৎস্যসম্পদ ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেবে।
কলাপাড়া উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা অপু সাহা বলেন, সোলজার ফিশ মূলত গভীর সমুদ্রের প্রবালপ্রাচীর ও পাথুরে পরিবেশে বসবাসকারী একটি সামুদ্রিক প্রজাতি। আমাদের উপকূলীয় জেলেদের জালে এটি খুব কম ধরা পড়ে। তাই স্থানীয়ভাবে এটি মানুষের কাছে অপরিচিত। এ ধরনের মাছ ধরা পড়া বঙ্গোপসাগরের সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেয়। জেলেদের এমন ভিন্নধর্মী বা অচেনা প্রজাতির মাছ ধরা পড়লে দ্রুত মৎস্য বিভাগকে জানানো উচিত। যাতে প্রয়োজনীয় তথ্য সংরক্ষণ ও গবেষণার কাজে ব্যবহার করা যায়।
ব্লু অ্যাকশন ফান্ডের অর্থায়নে পরিচালিত ডাব্লিউসিএস ও ওয়ার্ল্ডফিশের সমন্বয়ে বাস্তবায়িত ‘সুস্থ সাগর’ প্রকল্পের গবেষণা সহকারী মো. বখতিয়ার রহমান বলেন, সোলজার ফিশের বৈজ্ঞানিক নাম Myripristis murdjan। এটি Holocentridae পরিবারের একটি সামুদ্রিক মাছ। যা ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল এবং বঙ্গোপসাগরের গভীর সমুদ্রে পাওয়া যায়।
তিনি আরও বলেন, মাছটি সাধারণত ৫ থেকে ২০০ মিটার গভীরতায় প্রবালপ্রাচীর, পাথুরে তলদেশ ও গুহাময় এলাকায় বসবাস করে। দিনের বেলায় আশ্রয়ে থাকলেও রাতে খাদ্যের সন্ধানে বের হয়। ছোট মাছ, চিংড়ি, জুপ্ল্যাঙ্কটন ও অন্যান্য অমেরুদণ্ডী প্রাণী এই মাছের প্রধান খাদ্য। সামুদ্রিক খাদ্যশৃঙ্খল ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এ প্রজাতির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বাংলাদেশের উপকূলে এটি বিরল। তবে বৈশ্বিকভাবে বিরল নয়।









