আলীপুর মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র

সরকারি মিটারে অটোভ্যান চার্জ দিয়ে মাসে লাখ টাকা আয় ম্যানেজারের

কুয়াকাটা (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি
১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৭:২১আপডেট : ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৭:২১

দেশে বিদ্যুতের সংকট চলছে। সরকার বিদ্যুৎ অপচয় রোধে অতিরিক্ত আলোকসজ্জা, রাত ৮টায় মার্কেট বন্ধসহ সংকট মোকাবিলায় নানামুখী উদ্যোগ নিয়েছে। ঠিক তখন পটুয়াখালীর আলীপুর মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে (বিএফডিসি মার্কেটে) চলছে তার উল্টো। খোদ মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের ম্যানেজার শরিফুল ইসলাম সরকারি মিটার থেকে অটোগাড়িতে চার্জ ও সাব-মিটার বাণিজ্যের মাধ্যমে মাসে লাখ টাকা আত্মসাৎ করছেন। সরেজমিনে এর সত্যতাও মিলেছে। 

অভিযোগ উঠেছে, মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের সরকারি মিটার থেকে অবৈধভাবে লাইন দিয়ে রাত দিনে মিলে প্রতিদিন গড়ে অর্ধশত ব্যাটারিচালিত অটোভ্যান চার্জ দেওয়া হয়। প্রতিটি অটোভ্যান থেকে মাসে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা করে নেওয়া হয়।

অপরদিকে মার্কেটে প্রায় অর্ধশতাধিক মাছের আড়ত রয়েছে। প্রতিটি আড়তে একটি করে সাব-মিটার আছে। এসব সাব-মিটার ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে বাণিজ্যিক রেটে বিল নেওয়া হয়। অথচ বিএফডিসি মার্কেটটি জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট এবং সরকারি প্রতিষ্ঠান হওয়ায় সর্বনিম্ন বিদ্যুৎ বিল নেওয়া হয়। এই সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে মৎস্য কেন্দ্রের ম্যানেজার শরিফুল ইসলাম অটোভ্যান চার্জের মাধ্যমে লাখ টাকা আত্মসাৎ করে আসছেন।

বিএফডিসির অফিস সূত্রে জানা গেছে, গত আগস্ট মাসে ১৬ হাজার টাকা বিদ্যুৎ বিল এসেছে বিএফডিসি মার্কেটে। অথচ অটোভ্যান ও সাব-মিটার থেকে মাসে লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়। উত্তোলনকৃত এসব টাকার নেই কোনও রশিদ কিংবা হিসাব। 

ম্যানেজার শরিফুল ইসলাম দাবি করেন, মার্কেটের শুরু থেকেই চার্জ বাণিজ্য চলে আসছে। এই চার্জ বাণিজ্য থেকে ৫ বছরে প্রায় অর্ধকোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের।

গত ৮ সেপ্টেম্বর রাতে আলীপুর মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে অবস্থিত বিএফডিসি মার্কেটে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, ৩৫ থেকে ৪০টি অটোভ্যান চার্জ দেওয়া হচ্ছে। ৯ সেপ্টেম্বর বিকালে গিয়েও দেখা গেছে ১৫-২০টি অটোভ্যান চার্জ দেওয়া রয়েছে।

মার্কেটের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যবসায়ী জানান, মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের মাছ আনা নেওয়ার কাজে ব্যবহৃত ৫০-৬০টি অটোভ্যান দিন রাতে চার্জ দেওয়া হয়। অটোভ্যান চার্জের টাকা রাজস্ব খাতে জমা না দিয়ে ম্যানেজার, হিসাবরক্ষকসহ কর্মকর্তারা ভাগ-ভাঁটোয়ারা করে নিচ্ছেন।

অটোভ্যান চার্জ বাণিজ্য, সাব-মিটার বাণিজ্যসহ আড়তগুলোর রাজস্বে শুভঙ্করের ফাঁকিসহ নানা অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা বিষয় জানতে চাইলে বিএফডিসি মার্কেটের ম্যানেজার শরিফুল ইসলাম অটোভ্যান বাণিজ্যের কথা স্বীকার করলেও এ বিষয়ে তিনি বক্তব্য দিতে রাজি হননি। তিনি বলেন, ‘ব্যবসায়ীদের অনুরোধে অটোভ্যান চার্জ দেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছি।’ 

এই টাকা সরকারি খাতে জমা হয় কিনা এমন প্রশ্নের জবাব না দিয়ে বিষয়টি ধামাচাপা দিতে মার্কেটের ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে ফোন করে তার অফিসে জড়ো করেন।

ফোন পেয়ে প্রথমে আসেন বিএফডিসি মার্কেটের শ্রমিক সংগঠনের সভাপতি সালাউদ্দিন, এর কিছুক্ষণ পরে আসেন লতাচাপলী ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মহিউদ্দিন মুসুল্লী সুলতান, লতাচাপলী ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান, স্বেচ্ছাসেবক দলের মহিপুর থানার সাধারণ সম্পাদক আতিকুর রহমান মিলন, আলীপুর বাজার ব্যবসায়ী কমিটির সাধারণ সম্পাদক আলমগীর হোসেন, প্রভাবশালী মৎস্য ব্যবসায়ী আবুল হোসেন কাজীসহ কয়েকজন ব্যবসায়ী।

এসব ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে বিএফডিসি মার্কেটের অন্যান্য কর্মকর্তারা ট্রলিংয়ের মাছ টানতে বাধা দেওয়া হচ্ছে বলে উসকানি দেওয়া হয়। তাদের সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চালান। তবে আগত ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের অনেকেই তাতে সাড়া দেননি।

এ সময় বিএনপির সভাপতি সাংবাদিকদের বলেন, ‘ম্যানেজার অটোভ্যান চার্জ দিয়ে সরকারি বিল পরিশোধ করে যা থাকে তাতে ওনার পকেট খরচ চলে। তাতে আপনাদের কি?’ তিনি আরও বলেন, ‘আমার কাছে জিজ্ঞেস করে এখানে রিপোর্ট করতে আসতে হবে।’ এ সময় কুয়াকাটা প্রেসক্লাবের সিনিয়র সহসভাপতি মিজানুর রহমানও উপস্থিত ছিলেন।

ম্যানেজার শরিফুল ইসলাম তার নানা অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা ধামাচাপা দিতে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করে ভোরের কাগজের কুয়াকাটা প্রতিনিধি, কুয়াকাটা প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি আনোয়ার হোসেন আনু, তার সহযোগী তৃতীয় মাত্রার কুয়াকাটা প্রতিনিধি রুমী শরীফকে মব সৃষ্টি করে হেনস্তার চেষ্টা করেন।

বিএফডিসি মার্কেটের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যবসায়ী জানান, মার্কেটে প্রায় অর্ধশত আড়ত রয়েছে। এসব আড়তে গভীর সমুদ্র থেকে মাছ শিকার করে নিয়ে এসে এখানে খোলা বাজারে বিক্রি করে থাকে। গভীর সমুদ্রের কোনও কোনও ট্রলারে দেড়শ থেকে দুইশ মণ ইলিশ নিয়ে এসে আড়তে ৩০-৪০ লাখ টাকায় বিক্রি করছে। এসব মাছ থেকে আসা সরকারি রাজস্বের হিসাবেও গরমিল আছে। দেড়শ মণ ইলিশ বিক্রির বড় দাগের মাছের রাজস্বের হিসাব থাকে না। আড়তদারদের সঙ্গে যোগসাজশে নামমাত্র রাজস্ব দেখিয়ে আসছেন সংশ্লিষ্টরা। বড় অংশই চলে যায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পকেটে।

বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন করপোরেশন (বিএফডিসি) মার্কেট তৈরি ও রক্ষণাবেক্ষণে খাতে ব্যাপক অর্থ সরকারকে গচ্ছা দিতে হচ্ছে প্রতি বছর। সেখানে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বিএফডিসি কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া অবৈধ ব্যাটারিচালিত অটোভ্যান চার্জ, সাব-মিটার বাণিজ্য এবং মাছ বেচাকেনায় রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে সরকারি সাইনবোর্ড ব্যবহার করে লাখ লাখ টাকা নানাভাবে লোপাট করে আসছেন দীর্ঘদিন।

এ বিষয়ে কুয়াকাটা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির এজিএম সম্রাট খান সাংবাদিকদের জানান, বিএফডিসি মার্কেটে অবৈধভাবে অটোভ্যান চার্জের বিষয়ে অবগত নন। এমনটা হয়ে থাকলে লাইন কেটে দেওয়া হবে।

 

/এএম/ 
সম্পর্কিত
দিনের ১৪ ঘণ্টাই বিদ্যুৎ থাকে না: কমেছে আয়, কীভাবে চলবে সংসার
কোথায় গেলো হাওরের মাছগুলো?
বজ্রপাত থেকে বিদ্যুৎমন্ত্রী টুকুর বাসায় আগুন
সর্বশেষ খবর
‘আমাকে আপনার প্রার্থনায় রাখবেন’—বাঁধন
‘আমাকে আপনার প্রার্থনায় রাখবেন’—বাঁধন
পরিচিত জয়পুরের আড়ালে লুকিয়ে আছে যে অচেনা সৌন্দর্য
পরিচিত জয়পুরের আড়ালে লুকিয়ে আছে যে অচেনা সৌন্দর্য
শি জিনপিংয়ের সফরে চীন-ভারত সম্পর্কে বরফ গলবে?
শি জিনপিংয়ের সফরে চীন-ভারত সম্পর্কে বরফ গলবে?
র‍্যাব বিলুপ্ত করে এসআরবি বিল সংসদে পাস
র‍্যাব বিলুপ্ত করে এসআরবি বিল সংসদে পাস
সর্বাধিক পঠিত
সোনালী ব্যাংকের ছয় কর্মকর্তার ১০ বছরের সাজা, ৯৩ কোটি টাকা জরিমানা
সোনালী ব্যাংকের ছয় কর্মকর্তার ১০ বছরের সাজা, ৯৩ কোটি টাকা জরিমানা
ডব্লিউএইচওর আঞ্চলিক প্রধানের পদ ছাড়লেন সায়মা ওয়াজেদ পুতুল
রয়টার্স এক্সক্লুসিভডব্লিউএইচওর আঞ্চলিক প্রধানের পদ ছাড়লেন সায়মা ওয়াজেদ পুতুল
কোথায় গেলো হাওরের মাছগুলো?
কোথায় গেলো হাওরের মাছগুলো?
সন্তানকে ঘিরে যখন পরিবারে আনন্দ, ঠিক তখনই এলো বাবার মৃত্যুর খবর
সন্তানকে ঘিরে যখন পরিবারে আনন্দ, ঠিক তখনই এলো বাবার মৃত্যুর খবর
এখন সুযোগ পেলে কাকে নায়িকা হিসেবে চান আলমগীর, জানালেন নিজেই
এখন সুযোগ পেলে কাকে নায়িকা হিসেবে চান আলমগীর, জানালেন নিজেই