মই বেয়ে উঠতে হয় ৭ কোটি টাকার সেতুতে

বরিশাল প্রতিনিধি
১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৩০আপডেট : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৩০

সাত কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সেতু। কাজ শেষ হয়েছে প্রায় দেড় বছর আগে। অথচ সংযোগ সড়ক না থাকায় সেতুটি এখনও সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করা হয়নি। ফলে সেতু পারাপারে গ্রামবাসীর ভরসা হয়ে উঠেছে বাঁশের মই। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মই বেয়ে সেতুতে উঠছেন তারা।

সংযোগ সড়ক নির্মাণ করে দ্রুত সেতুটি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করার দাবিতে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। এ নিয়ে গত মঙ্গলবার দুপুরে বরিশালের উজিরপুর উপজেলার সন্ধ্যা নদীর একটি শাখা নদীর ওপর নির্মিত ধামুরা সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে এ কর্মসূচি পালন করেন তারা।

মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সেতুটি পড়ে থাকায় সাধারণ মানুষ চরম দুর্ভোগে রয়েছেন। দ্রুত সংযোগ সড়ক নির্মাণ করে সেতুটি চালু করা না হলে আরও কঠোর কর্মসূচি দেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন তারা।

উজিরপুর উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি জামাল তালুকদার বলেন, ‌‘সাত কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সেতুটি সংযোগ সড়কের কারণে প্রায় দেড় বছর ধরে পড়ে রয়েছে। অথচ মানুষ কষ্ট করে মই দিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ওই সেতুর ওপর দিয়ে চলাচল করছে। গ্রামবাসীর এই সীমাহীন দুর্ভোগের বিষয়টি দেখার যেন কেউ নেই।’

উপজেলা কৃষক দলের সাধারণ সম্পাদক স্বপন মল্লিক বলেন, ‘আমরা সাধারণ মানুষ সেতুটির কারণে নানা সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছি। জমি নিয়ে বিরোধ থাকলেও প্রশাসন তা দ্রুত সমাধান করছে না। যে কারণে সেতুটি নির্মিত হওয়ার দেড় বছর পেরিয়ে গেলেও শুধুমাত্র সংযোগ সড়কের কারণে সেতুটি এখন মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে।’

গত মঙ্গলবার দুপুরে বরিশালের উজিরপুর উপজেলার সন্ধ্যা নদীর একটি শাখা নদীর ওপর নির্মিত ধামুরা সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে এ কর্মসূচি পালন করেন তারা

মই বেয়ে সেতু পারাপার

মানববন্ধনে অংশ নেওয়া স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, সেতুটি চালু না হওয়ায় তাদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। বিকল্প হিসেবে মই ব্যবহার করে সেতুর ওপর উঠতে হচ্ছে। সেতুটি চালু হলে শোলক, বাটাজোরসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকার সঙ্গে তাদের যোগাযোগ সহজ হবে।

তারা বলেন, সেতু নির্মাণের সময় দীর্ঘদিনের যোগাযোগ সমস্যার সমাধান হবে—এমন আশায় ছিলেন তারা। কিন্তু নির্মাণ শেষ হওয়ার পর দেখা দিয়েছে নতুন সমস্যা। সংযোগ সড়ক না থাকায় সেতুটি ব্যবহারই করা যাচ্ছে না। এতে কৃষিপণ্য পরিবহন, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের যাতায়াত এবং জরুরি রোগীদের দ্রুত চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়ার সুবিধা থেকেও তারা বঞ্চিত হচ্ছেন।

জমি নিয়ে বিরোধ

সংযোগ সড়ক নির্মাণে যে জমি নিয়ে বিরোধ তৈরি হয়েছে, সেই জমির মালিকানা দাবিদার আব্দুর রব হাওলাদার বলেন, তিনি এসএ খতিয়ানের মালিক। সেতু নির্মাণের সময় তার জমির ওপর দিয়ে সংযোগ সড়ক নির্মাণের বিষয়ে তিনি আপত্তি জানিয়েছিলেন।

তার দাবি, তখন সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা সরকারি নিয়ম অনুযায়ী প্রয়োজনীয় জমি অধিগ্রহণের ব্যবস্থা করার কথা জানিয়েছিলেন। কিন্তু সেতুর নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পর জমি ব্যবহারের বিষয়ে ভিন্ন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। জমির মালিকদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কার্যকর ব্যবস্থা না করেই জমি ব্যবহারের চেষ্টা করা হচ্ছে।

আব্দুর রবের ছেলে মাসুম হাওলাদার বলেন, ‘জমি নিয়ে বিরোধের বিষয়ে আমরা আদালতের শরণাপন্ন হয়েছি। একই সঙ্গে উপজেলা প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগও দেওয়া হয়েছে।’

সমাজসেবক মোহাম্মদ এনায়েত শরীফ বলেন, ‘এটি উপজেলা পরিষদের নিবন্ধিত সড়ক। প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে সড়কের জমি ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করেই নকশা করা হয়েছে। এরপরই সেতু নির্মাণের কাজ শুরু হয়। একটি পক্ষ ব্যক্তিস্বার্থে মালিকানা দাবি করে সংযোগ সড়কের কাজে বাধা সৃষ্টি করায় প্রকল্পটি আটকে আছে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ।’

যা বলছে প্রশাসন

উজিরপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মহেশ্বর মন্ডল বলেন, ‘উপজেলা প্রকৌশল দফতরের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। সেখানে বর্তমান বিএস জরিপে রাস্তার নামে রেকর্ড ও নকশা রয়েছে। তবে চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে আমার পক্ষে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া সম্ভব নয়। বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য সংশ্লিষ্টদের আদালতের শরণাপন্ন হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।’

সেতুটির কাজ শেষ হয়েছে প্রায় দেড় বছর আগে

উজিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আলী সুজা বলেন, ‘জমি নিয়ে বিরোধের কারণে সংযোগ সড়কটির নির্মাণকাজ বিলম্বিত হচ্ছে। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অবহিত করা হয়েছে। আশা করছি, দ্রুত সময়ের মধ্যে এ সমস্যার সমাধান হবে।’

পড়ে আছে সাত কোটি টাকার সেতু

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্রে জানা যায়, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ২০২৩ সালের ১৭ জুলাই উজিরপুর উপজেলার ধামুরা-শোলক-বাটাজোর সড়কে ৪৪ দশমিক ৬ মিটার দীর্ঘ আরসিসি গার্ডার সেতুটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। সেতুটি নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৬ কোটি ৮৩ লাখ ৩৯ হাজার ৫৩৫ টাকা।

গ্রামীণ সেতু সহায়তা কর্মসূচির আওতায় নেওয়া প্রকল্পটির চুক্তি অনুযায়ী কাজ শেষ করার নির্ধারিত সময় ছিল ২০২৫ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি। নির্মাণকাজ শেষ হলেও সংযোগ সড়ক না থাকায় সেতুটি এখনও পুরোপুরি ব্যবহার করা যাচ্ছে না। ফলে প্রায় সাত কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সেতুটি স্থানীয় মানুষের যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নে কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা রাখতে পারছে না। বরং সেতুর ওপর উঠতে বাঁশের মই ব্যবহার করতে গিয়ে প্রতিদিনই ঝুঁকি নিতে হচ্ছে গ্রামবাসীকে।

স্থানীয়দের দাবি, জমি নিয়ে বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তি করে সংযোগ সড়কের নির্মাণকাজ শেষ করা হোক। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন পড়ে থাকা সেতুটি দ্রুত জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হলে ধামুরা, শোলকসহ আশপাশের এলাকার মানুষের যোগাযোগ, কৃষিপণ্য পরিবহন ও জরুরি যাতায়াতে বড় ধরনের সুবিধা তৈরি হবে।

/এএম/ 
সম্পর্কিত
রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত, ভোগান্তিতে পরিবারগুলো  
দিনের ১৪ ঘণ্টাই বিদ্যুৎ থাকে না: কমেছে আয়, কীভাবে চলবে সংসার
শাহজালালে ইমিগ্রেশন সার্ভার আধাঘণ্টা বন্ধ, ভোগান্তিতে ক্ষুব্ধ যাত্রীরা
সর্বশেষ খবর
বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে উৎপাদন দ্বিগুণ, বাস্তবে ৮ ঘণ্টা লোডশেডিং
বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে উৎপাদন দ্বিগুণ, বাস্তবে ৮ ঘণ্টা লোডশেডিং
দেড় বছরে হামজার ৫ হাজার জার্সি বিক্রি!
দেড় বছরে হামজার ৫ হাজার জার্সি বিক্রি!
অন্য পুরুষের সঙ্গে কথা বলা সন্দেহে প্রেমিকাকে ছুরিকাঘাতে হত্যা
অন্য পুরুষের সঙ্গে কথা বলা সন্দেহে প্রেমিকাকে ছুরিকাঘাতে হত্যা
লাল কার্ডের ম্যাচে ইউনাইটেডকে হারালো ম্যানচেস্টার সিটি
লাল কার্ডের ম্যাচে ইউনাইটেডকে হারালো ম্যানচেস্টার সিটি
সর্বাধিক পঠিত
ছিনতাইয়ের ২০ ভরি স্বর্ণ একাই নিয়ে এক মাসের ছুটিতে পুলিশ সদস্য
ছিনতাইয়ের ২০ ভরি স্বর্ণ একাই নিয়ে এক মাসের ছুটিতে পুলিশ সদস্য
‘ভালোবাসি-ভালোবাসি’ বলে পাগল করে ফেলেছিল, এখন বাড়ি আসায় পালিয়ে গেছে
‘ভালোবাসি-ভালোবাসি’ বলে পাগল করে ফেলেছিল, এখন বাড়ি আসায় পালিয়ে গেছে
টাকা দিলেই কল রেকর্ড-লোকেশন: কীভাবে চলতো এই চক্র
টাকা দিলেই কল রেকর্ড-লোকেশন: কীভাবে চলতো এই চক্র
উত্তরার অফিস থেকে আওয়ামী লীগ নেতা গ্রেফতার
উত্তরার অফিস থেকে আওয়ামী লীগ নেতা গ্রেফতার
ব্রিকস নেতাদের নৈশভোজে মোদির মেনুতে যা ছিল
ব্রিকস নেতাদের নৈশভোজে মোদির মেনুতে যা ছিল