খাগড়াছড়ির ৯ উপজেলার মোট গুচ্ছগ্রামের সংখ্যা ৮১টি। নিরাপত্তার স্বার্থে ১৯৮৮ সালে এখানে বসবাসরত বাঙালি পরিবারগুলোকে নিয়ে এসব গুচ্ছগ্রাম গঠন করা হয়। এখন এসব গ্রামের মোট ২৬ হাজার ২২০ পরিবার রেশন কার্ডের আওতায় আছে। প্রতি পরিবারকে মাসে ৮৫ কেজি করে চাল ও গম দিয়ে আসছে সরকার, যা বিতরণের জন্য দুই বছর পর পর প্রতি গুচ্ছগ্রামের জন্য একজন প্রকল্প চেয়ারম্যানসহ তিন সদস্যের কমিটি করা হয়। এসব কমিটিতে একজন চেয়ারম্যান ও দুজন সদস্য হিসেবে নিয়োগ পান। তবে এই নিয়োগকে কেন্দ্র করে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের বিরুদ্ধে লাখ লাখ টাকার বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নীতিমালা অনুসারে খাদ্যশস্য বিতরণের এসব কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে গুচ্ছগ্রামের কার্ডধারী বাসিন্দা, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট গুচ্ছগ্রামের জনপ্রতিনিধিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা। তবে নিয়ম অনুসরণ না করে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা টাকার বিনিময়ে তাদের তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের দিয়ে এসব কমিটি গঠন করছেন।
অভিযোগকারীরা বলছেন, স্থানীয় সংসদ সদস্য ও প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নাম ভাঙিয়ে ক্ষমতাসীন দলের অনেক নেতা এই ঘুষ বাণিজ্যের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। ইতোমধ্যে প্রকল্প চেয়ারম্যানসহ তিন সদস্য বিশিষ্ট কমিটির নাম প্রস্তাব ও পুনর্গঠন নিয়ে উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সম্পাদকদের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে। নিজেদের পছন্দের ব্যক্তিদের নাম প্রস্তাব নিয়ে এই দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছে।
এ ব্যাপারে কথা হয় জেলা আওয়ামী লীগের একাধিক নেতার সঙ্গে। তারা জানান, চলমান এই প্রকল্প কমিটি পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় স্থানীয় সংসদ সদস্য কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা আস্থা রেখেছেন মাটিরাঙা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও মাটিরাঙা পৌর মেয়র মো. শামছুল হকের ওপর। তিনি ৯ উপজেলার আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকদের সঙ্গে সমন্বয় করে তালিকা তৈরি করছেন।
মাটিরাঙা পৌর আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘সংসদ সদস্য, জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী অফিসারদের নাম ভাঙিয়ে ৮ থেকে ১০ লাখ করে টাকা নিয়ে পুরো জেলার সব গুচ্ছগ্রামের প্রকল্প কমিটির মনোনয়ন দিচ্ছেন শামছুল হক।’
মাটিরাঙা উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা মো. তাজুল ইসলাম বলেন, ‘গুচ্ছগ্রামের প্রকল্প চেয়ারম্যান ও সদস্য মনোনয়ন নিয়ে ঘুষ বাণিজ্য চলছে। ঘুষ নিয়ে গুচ্ছগ্রামগুলোতে অরাজকতা সৃষ্টি করছেন শামছুল হক। খাদ্যশস্য বিতরণ নীতিমালা-২০১৬ অনুযায়ী নির্বাচনের মাধ্যমে গুচ্ছগ্রামের প্রকল্প চেয়ারম্যান ও দুই সদস্য নির্বাচিত করার বিধান থাকলেও তা মানা হচ্ছে না।’
পানছড়ির একাধিক আওয়ামী লীগ নেতা নাম না প্রকাশের শর্তে জানিয়েছেন, প্রকল্প চেয়ারম্যানের নাম প্রস্তাবের জন্য প্রতি ছোট গুচ্ছগ্রামের বিপরীতে আড়াই থেকে তিন লাখ টাকা এবং বড়গুলোতে পাঁচ থেকে ছয় লাখ টাকা করে লেনদেন হচ্ছে।
এই প্রসঙ্গে পানছড়ি উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জয়নাথ দেব ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বিজয় কুমার দেব জানান, ‘উপজেলা সভাপতি বাহার মিয়া নিজের আত্মীয়-স্বজন ও কিছু মানুষের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা নিয়ে নাম প্রস্তাব করছে। দলের ত্যাগী নেতাকর্মীরা বাদ পড়ায় আমরা আরেকটি তালিকা দিয়েছি।’
টাকা লেনদের প্রসঙ্গে পানছড়ি উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি বাহার মিয়া বলেন, ‘টাকা ছাড়া কখনও প্রকল্প চেয়ারম্যান নিয়োগ হয়নি।’
এই আওয়ামী লীগ নেতার পাল্টা অভিযোগ, ‘জয়নাথ দেব ও বিজয় কুমার দেব টাকার বিনিময়ে উপজেলা আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের কিছু নেতার নাম প্রস্তাব করেছে। আমি বিষয়টি সংসদ সদস্যকে জানানোর পর তিনি আমাকে মাটিরাঙা আওয়ামী লীগ সভাপতি শামছুল হকের কাছে আরেকটি তালিকা দিতে বলেন। পুরো জেলার ৮১ গুচ্ছগ্রামের চেয়ারম্যান ও সদস্য মনোনয়নের দায়িত্ব শামছুল হককে দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংসদ সদস্য। এজন্য আমি তার কাছে ১২ জনের নাম প্রস্তাব করি। তাদের মধ্যে কয়েকজন আমার আত্মীয় থাকতে পারে। তবে নামগুলো নীতিমালা অনুসরণ করে দেওয়া হয়েছে।’
কিন্তু ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মাটিরাঙা উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি মো. শামছুল হক। এমনকি সংসদ সদস্য কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা তাকে এই ধরনের কোনও দায়িত্ব দেননি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘দলের কিছু বিপথগামী সদস্য অহেতুক মিথ্যাচার করছে। গুচ্ছগ্রামের খাদ্যশস্য বিতরণের জন্য উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে কমিটি রয়েছে। কমিটির দায়িত্বে আছেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও জেলা প্রশাসক। তারা নীতিমালা অনুযায়ী প্রকল্প চেয়ারম্যান ও সদস্য মনোনয়ন দেবেন বা নির্বাচিত করবেন।’
এসব বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নিয়ম অনুযায়ী গুচ্ছগ্রামের খাদ্যশস্য বিতরণের এসব প্রকল্পের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের নাম তাদের প্রস্তাব করার কথা থাকলেও তা হয় না। ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা এসব তালিকা ঠিক করে সংসদ সদস্যের কাছে পাঠিয়ে দেন। তিনি ডিও লেটার দিয়ে দিলে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তা অনুমোদন করতে হয়।
তবে এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক মো. শহীদুল ইসলাম বলেন, ‘এই মুহূর্তে গুচ্ছগ্রামের প্রকল্প চেয়ারম্যান বা সদস্য পরিবর্তনের প্রক্রিয়া শুরুর বিষয়টি জানা নাই। গুচ্ছগ্রামে খাদ্যশস্য বিতরণ নীতিমালা অনুযায়ী প্রকল্প চেয়ারম্যান ও সদস্য মনোনয়ন বা নির্বাচিত করা হবে। যদি কেউ প্রশাসন বা অন্য কারও নাম ভাঙিয়ে অনিয়ম করে, তা তদন্ত করে দেখা হবে এবং আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
অভিযোগের বিষয়ে সংসদ সদস্য কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা বলেন, ‘নির্বাচনের আগে অনেকে গুচ্ছগ্রামের প্রকল্প কমিটি পরিবর্তন করতে বললেও করা হয়নি।’
তবে তিনি আরও জানান, যেসব গুচ্ছগ্রামের প্রকল্প কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে, সেগুলো পুনর্গঠন করতে জেলা প্রশাসককে বলা হয়েছে। প্রকল্প কমিটি পুনর্গঠনের কাজ উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও জেলা প্রশাসকের। এখানে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ঘুষ বাণিজ্য করার সুযোগ নেই।







