চট্টগ্রামের পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জে পাঁচ আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের কারসাজিতে পেঁয়াজের দাম বেড়েছে বলে জানিয়েছেন আড়তদাররা। তারা দাবি করেন, এই পাঁচ প্রতিষ্ঠান দাম বাড়ার সুযোগ নিয়ে পাইকারিতে পেঁয়াজের দাম প্রায় দ্বিগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। এ কারণে বাধ্য হয়ে আড়তদারদেরও বাড়তি দামে পেঁয়াজ বিক্রি করতে হচ্ছে।
খাতুনগঞ্জের হামিদ উল্লাহ মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও আড়তদার মোহাম্মদ ইদ্রিস বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘খাতুনগঞ্জের অধিকাংশ ব্যবসায়ী কমিশনে পেঁয়াজ বিক্রি করেন। আমদানিকারকরা যে দাম ঠিক করে দেন, সেই দামে আমরা বিক্রি করি। বিক্রির টাকা থেকে ব্যবসায়ীরা একটা অংশ কেটে রাখেন। দাম বাড়ানো- কমানোর ক্ষেত্রে খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ী ও আড়তদারদের কোনও হাত নেই।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক আড়তদার বলেন, ‘পেঁয়াজের পরিমাণের ওপর আমরা কমিশন পায়। প্রতিকেজি ৫০ টাকা বিক্রি করলে যে কমিশন পাই, ১০০ টাকা বিক্রি করলেও একই কমিশন পাই। তাহলে দাম বাড়িয়ে আমাদের লাভ কী? এর সঙ্গে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো জড়িত। বেশি দামে বিক্রি হলে তাদেরই লাভ।’
ভারত পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ ঘোষণার পর একদিনে খাতুনগঞ্জে পেঁয়াজের দাম দ্বিগুণ বেড়ে যাওয়ায় মঙ্গলবার (১ অক্টোবর) ভোগ্যপণ্যের এই পাইকারি বাজারে অভিযান চালায় জেলা প্রশাসন। অভিযানে বাজার অস্থিতিশীল করার ক্ষেত্রে চাঁপাইনবাবগঞ্জ, সাতক্ষীরা ও ঢাকার আমদানিকারকদের সঙ্গে চট্টগ্রামের আড়তদার ও পাইকারি বিক্রেতাদের যোগসাজশ পান নিবার্হী ম্যাজিস্ট্রেট তৌহিদুল ইসলাম।
তৌহিদুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘পেঁয়াজের বাজারে অস্থিরতার পেছনে কয়েকজন আমদানিকারকের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পেয়েছি। অভিযানে আমরা ভারত ও মিয়ানমার থেকে আসা পেঁয়াজের চালানের কাগজপত্র কাস্টমস ক্লিয়ারেন্সের ডকুমেন্ট পেয়েছি। পেঁয়াজের দাম বেড়ে যাওয়ার পেছনে দায়ী এমন তিন-চারটি প্রতিষ্ঠানের নাম আমরা পেয়েছি। সেগুলো আমরা সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠাবো। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এসব প্রতিষ্ঠানের নাম বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, খাতুনগঞ্জে পেঁয়াজের দাম বাড়িয়ে দেওয়ার সঙ্গে সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলার মেসার্স দীপা এন্টারপ্রাইজ, চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবনগরের মের্সাস টাটা ট্রেডার্স, রিপা ট্রেডার্স ও ঢাকা ট্রেডার্স এবং টেকনাফের চৌধুরী ট্রেডার্স নামে পাঁচটি প্রতিষ্ঠান জড়িত। এসব আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান খাতুনগঞ্জের আড়তদার ও পাইকারি বিক্রেতাদের মাধ্যমে পেঁয়াজের বাজার অস্থিতিশীল করে তোলেন। এ কারণে একদিনের ব্যবধানে খাতুনগঞ্জে পেঁয়াজের দাম দ্বিগুণ বেড়ে যায়।
মঙ্গলবার খাতুনগঞ্জের মেসার্স আব্দুল আউয়াল, শাহজালাল ট্রেডার্স, মেসার্স হাজী অছি উদ্দিন সওদাগরসহ ৯টি প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালান নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। এর মধ্যে অছিউদ্দিন সওদাগর আড়ত ছাড়া অন্য আড়তগুলোতে মেসার্স দীপা এন্টারপ্রাইজ, মের্সাস টাটা ট্রেডার্স, রিপা ট্রেডার্স ও ঢাকা ট্রেডার্সের আমদানি করা পেঁয়াজ বিক্রি করা হচ্ছে।
অভিযানে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করে দেখেন, মেসার্স আব্দুল আউয়ালে এক রাতের ব্যবধানে পেঁয়াজের দাম বেড়েছে ৩৮ টাকা। রবিবার (২৯ সেপ্টেম্বর) তারা প্রতি কেজি ভারতের পেঁয়াজ বিক্রি করেন ৫২ টাকায়। কিন্তু একদিনের ব্যবধানে সোমবার (৩০ সেপ্টেম্বর) তারা ওই পেঁয়াজ বিক্রি করেন ৯০ টাকায়। একই অবস্থা শাহজালাল ট্রেডার্সেও। ওই আড়তে রবিবার ভারতের পেঁয়াজ প্রতিকেজি ৬০ টাকায় বিক্রি হয়,পরদিন বিক্রি হয় ৯০ টাকায়।
শাহজালাল ট্রেডার্সে থাকা একটি ট্রান্সপোর্ট ভাউচারে দেখা গেছে, সর্বশেষ ২৫ সেপ্টেম্বর দীপা এন্টারপ্রাইজ ওই প্রতিষ্ঠানে ৩০২ বস্তা পেঁয়াজ পাঠিয়েছে। সাতক্ষীরার ভোমরা স্থলবন্দরের আবিদ এন্টারপ্রাইজ নামে একটি সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠান মেসার্স তাহা ট্রান্সপোর্ট এজেন্সির মাধ্যমে ওই পেঁয়াজগুলো খাতুনগঞ্জের শাহজালাল ট্রেডার্সে পাঠায়।
মিয়ানমার থেকে আনা পেঁয়াজের ক্ষেত্রেও দেখা গেছে একই অবস্থা। ৪২ টাকা দরে আমদানি করা প্রতিকেজি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৭৫ থেকে ৮০ টাকায়। অভিযানে দেখা যায়, মেসার্স হাজী অছিউদ্দিন সওদার আড়তে সোমবার মিয়ানমারের পেঁয়াজ মজুত করে টেকনাফের আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান চৌধুরী ট্রেডার্স। ৪২ টাকা দরে আমদানি করা ৪৫ দশমিক ৯৯৪ মেট্রিক টন পেঁয়াজ তারা বিক্রি করছেন ৭৫ থেকে ৮০ টাকায়।
তবে অভিযানের পর বাজারে পেঁয়াজের দাম কিছুটা কমেছে। ১০ থেকে ১৫ টাকা কমে ভারতের পেঁয়াজ প্রতিকেজি ৮০ থেকে ৮৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে, মিয়ানমারের পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে প্রতিকেজি ৬৫ থেকে ৭০ টাকায়।
আরও পড়ুন...
খাতুনগঞ্জে পেঁয়াজের পাইকারি বাজারে জেলা প্রশাসনের অভিযান








