ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ উপজেলার শরীয়তনগর এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় দুই ছেলেকে নিয়ে থাকতেন শিক্ষক মকবুল হোসেন (৪০) ও রেখা বেগম (৩৫)। তাদের বড় ছেলে আরিফ হোসেন জয়ের বয়স ৯ বছর, আর ছোট ছেলে জুবায়ের হোসেনের ৭ বছর। সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন রেখা। গর্ভের সন্তান মেয়ে বলে বেশ আনন্দেই কাটছিল তাদের দিন। কিন্তু এক অগ্নিকাণ্ডে সব শেষ হয়ে গেছে। দগ্ধ হয়ে রেখার গর্ভের সন্তানসহ মারা গেছে সবাই।
গত ২২ ফেব্রুয়ারি রাতে বাসায় আগুন লাগে। এতে দগ্ধ হয়ে জুবায়ের মারা যায়। এরপর দগ্ধ অবস্থায় রাজধানীর শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন মকবুল মারা যান। রেখার গর্ভে থাকা মেয়ে সন্তানের জন্ম হয় মৃত অবস্থায়। এরপর মারা যায় বড় ছেলে জয়। সবশেষ সোমবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) রাতে মারা গেছেন রেখা বেগম।
পাঁচ জনের মৃত্যুর ঘটনায় উপজেলার চরচারতলা ইউনিয়নের শরীয়তনগর এলাকায় মকবুল হোসেনের বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। এ ঘটনায় তদন্ত করে দোষীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন পরিবারের লোকজন। অগ্নিকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধানে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
আরও পড়ুন: স্বামী ও তিন সন্তানের পর মারা গেলেন রেখাও
পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, গত ২২ ফেব্রুয়ারি রাতে শরীয়তনগর এলাকায় ভাড়া নেওয়া নিচ তলার বাসায় খাওয়ার প্রস্ততি নিচ্ছিলেন কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষক মকবুলসহ তার পরিবারের সদস্যরা। এ সময় রান্নাঘরে মশার কয়েল জ্বালাতে যায় তাদের বড় ছেলে জয়। দেশলাইয়ের কাঠি জ্বালাতেই পুরো ঘরে আগুনে ছড়িয়ে পড়ে। তাকে বাঁচাতে ছুটে আসেন তার বাবা, মা ও ছোট ভাই।
আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গে বাসার বিদ্যুতের সংযোগ বন্ধ হয়ে যায়। অন্ধকারে দরজা খুলে বের হতে পারেননি কেউ। এতে ভেতরে আটকা পড়ে মকবুল, রেখা, জয় ও জোবায়ের দগ্ধ হয়। পরে জুবায়েরের লাশ উদ্ধার করে ফায়াস সার্ভিস।
মকবুল হোসেন, অন্তঃসত্ত্বা রেখা বেগম ও বড় ছেলে জয়কে আশুগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। এরপর ঢাকায় শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে পাঠানো হয়। ২৫ ফেব্রুয়ারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান মকবুল। এরপর মৃত অবস্থায় রেখার গর্ভে থাকা মেয়ে সন্তানের জন্ম হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রবিবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) সকালে মারা যায় জয়। সোমবার রাত পৌনে ১১টায় মারা যান পরিবারটির সর্বশেষ সদস্য রেখা বেগম।
মকবুলের ভাই শামীম আহম্মেদ বলেন, ‘আমার ছোট ভাই বাড়ির মালিককে গ্যাসের সমস্যা কথা জানানোর পরও তারা ঠিক করে দেয়নি। তাদের গাফিলতির জন্য এই দুর্ঘটনা ঘটেছে। ৫০০ টাকার জন্য কাজটা করে দেয়নি। আমরা সরকারের কাছে বিচার চাই।’
মকবুলের মা খোরশেদা বেগম বলেন, ‘গ্যাসের চুলার লাইনের সমস্যা ছিল। মালিককে বলার পরও তিনি লাইন ঠিক করে দেননি। সেজন্য এ ঘটনা ঘটেছে। আমরা বিচার চাই।’
রেখার ভাবি মাহমুদা খাতুন বলেন, ‘পরিবারে আর কেউ থাকলো না। আমার ননদও আজ চলে গেলো। সবাইকে হারিয়ে ফেললাম। আমরা এই ঘটনায় দোষীদের বিচার চাই।’
আরও পড়ুন: বাবা-ছোট ভাইয়ের পর জয়ও চলে গেলো
আশুগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস স্টেশন কর্মকর্তা ও তদন্ত কমিটির সদস্য সচিব মিজানুর রহমান বলেন, স্থানীয় ও মৃতদের পরিবারের লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গ্যাস লাইনের সমস্যার কারণে আগুন লাগে।
আশুগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হানিফ মুন্সি বলেন, আগুনে পুড়ে একটা পরিবার শেষ হয়ে গেলো। ঘটনাটি খুবই দুঃখজনক। ইতোমধ্যে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। আগুন কেন লেগেছে, কার ভুল আছে, সেটা তদন্ত করা হবে।সরকারের পাশাপাশি ব্যক্তিগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারটিকে সহায়তার আশ্বাস দেন তিনি।
অগ্নিকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধানে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আজ সকালে সহকারী কমিশনার ভূমি আশরাফুল ইসলামকে প্রধান করে ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। আগামী তিন কার্য দিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে দেবে এই কমিটি।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অরবিন্দু বিশ্বাস বলেন, ইতোমধ্যে তদন্ত কমিটি কাজ শুরু করেছে। প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।








