২০০৪ সালে বাহার উদ্দিন রায়হান পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী। বাড়ির পাশে বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমারে ঢুকে পড়েছিল একটি চড়ুই পাখি। পাখিটিকে বাঁচাতে খুঁটিতে উঠে বৈদ্যুতিক তারে হাত দিলে ঝলসে যায় দুই হাত, বুক এবং পায়ের কিছু অংশ। এরপর চিকিৎসা চলে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। চিকিৎসার পাঁচ দিনের মাথায় দুই হাত কেটে ফেলতে হয়।
হয়তো এখানেই থেমে যেতো পথচলা। প্রাথমিকের গণ্ডি না পেরোতেই বন্ধ হয়ে যেতো লেখাপড়া। কিন্তু অদম্য রায়হান থেমে যাননি। নিজের ইচ্ছেশক্তি ও প্রচেষ্টায় এবং মায়ের উৎসাহে মুখে কলম আটকে লেখা আয়ত্ত করেন। মুখে কলম নিয়ে কনুইয়ের সাহায্যে লিখে স্নাতকোত্তর পাস করেছেন। অবশেষে পেলেন চাকরিও।
বুধবার (১৭ মে) দুপুরে নগরীর পাঁচলাইশ থানার মুরাদপুর এলাকার বাসায় কথা হয় রায়হানের সঙ্গে। দুর্ঘটনায় দুই হাত হারানোর বর্ণনা দিয়ে রায়হান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দুই হাত হারিয়ে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ছয় মাস চিকিৎসাধীন ছিলাম। হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফেরার পর দুই বছর বসেছিলাম। তখন কী করবো, বুঝে উঠতে পারিনি। সবাই যখন স্কুলে যায় তখন আমি বাড়িতে বসে একাকিত্ব বোধ করতাম।’
মুখে কলম নিয়ে যেভাবে লেখা শুরু
ইচ্ছেশক্তি ও নিজের ওপর বিশ্বাস রেখে আবারও স্কুলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম জানিয়ে রায়হান বলেন, ‘একদিন মা এবং মামাকে বললাম স্কুলে যাবো। তারা বললেন, স্কুলে গেলে লিখবে কীভাবে? আগে লেখার চেষ্টা করো। প্রথমে পা দিয়ে লেখার চেষ্টা করলাম, তাতে কষ্ট হচ্ছিল। এরপর আরও কয়েকভাবে লেখার চেষ্টা করলাম। তাতেও ব্যর্থ হই। একসময় মুখে কলম নিয়ে লেখার চেষ্টা করে কিছুটা সহজ মনে হয়। তখন থেকেই মূলত মুখ দিয়ে লেখার চেষ্টা করি। কয়েক মাসের চেষ্টায় সফল হই। এবার পঞ্চম শ্রেণিতে নয়, তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হলাম। সেইসঙ্গে মুখ দিয়ে লিখে প্রাথমিকের গণ্ডি পার হই।’
এরপর চকরিয়া সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে জিপিএ-৩.৮১ পেয়ে এসএসসি এবং চকরিয়া কলেজ থেকে জিপিএ-২.৩৩ পেয়ে এইচএসসি পাস করেন। এর ধারাবাহিকতায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাস বিভাগে সিজিপিএ-২.৭৫ পেয়ে স্নাতক ও একই বিভাগ থেকে সিজিপিএ-৩.১৩ পেয়ে স্নাতকোত্তর পাস করেন।
সংগ্রামী পথচলা
নিজের সাহসী ও সংগ্রামী পথচলার কথা উল্লেখ করে রায়হান বলেন, ‘পরিবারে মা ছাড়া আর কেউ নেই। আমি যখন ছোট তখন মা এবং আমাকে ফেলে বাবা নিরুদ্দেশ হয়ে যান। কখনও আমাদের খোঁজ নেননি। নানার বাড়িতে মামা-নানা লেখাপড়া করিয়েছেন। আমার পথচলা ছিল অত্যন্ত কঠিন, তবু লক্ষ্যে এগিয়ে গেছি।’
গত সোমবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ের আইসিটি টাওয়ারে রায়হানের হাতে চাকরির নিয়োগপত্র তুলে দেন আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক। আইসিটি বিভাগের এনহান্সিং ডিজিটাল গভর্নমেন্ট অ্যান্ড ইকোনমি প্রকল্পের আওতায় পরিচালিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস (পিএমআইএস) কেন্দ্রে ‘প্রশিক্ষণ সমন্বয়ক’ পদে চাকরি পেয়েছেন তিনি।
প্রতিমন্ত্রী চাকরির নিয়োগপত্র হাতে তুলে দেবেন জীবনেও কল্পনা করেননি
আইসিটি বিভাগে চাকরি পাবো, আবার প্রতিমন্ত্রী হাতে নিয়োগপত্র তুলে দেবেন এমনটি জীবনেও কল্পনা করেননি বলে উল্লেখ করেন রায়হান। তিনি বলেন, ‘আসলে এই সময়ে একটা চাকরির খুব প্রয়োজন ছিল। চাকরি পাওয়ার খবর পেয়ে অনেক খুশি হয়েছি। সঙ্গে সঙ্গে মাকে ফোন করে জানিয়েছি। মামাকেও জানিয়েছি। তারাও অনেক খুশি হয়েছেন। তবে আইসিটি প্রতিমন্ত্রী নিয়োগপত্র তুলে দেবেন, এটি কল্পনা করিনি। দিনটি আমার কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। এ জন্য বিশেষ করে প্রতিমন্ত্রীর কাছে কৃতজ্ঞ।’
আগামী মাসে চাকরিতে যোগ দেবো জানিয়ে রায়হান আরও বলেন, ‘চাকরিতে সর্বোচ্চ দিয়ে ভালো করার চেষ্টা করবো। আমাকে যে কাজ ও টার্গেট দেওয়া হবে, তা সঠিকভাবে করবো। যাতে ভবিষ্যতে আরও ভালো জায়গায় যেতে পারি।’
আমার মা অনেক কষ্ট করেছেন, আজকের এই দিনে তার প্রতি সর্বোচ্চ কৃতজ্ঞতা জানিয়ে চাকরি পাওয়া এই যুবক বলেন, ‘নিয়োগপত্র নিয়ে প্রথমে চকরিয়ায় মায়ের সঙ্গে দেখা করি। নানি-মামাদের সঙ্গে দেখা করেছি। সবাই খুশি হয়েছেন। এই পর্যায়ে আসতে মা অনেক কষ্ট করেছেন, মামারা অর্থ-শ্রম দিয়েছেন। তাদের প্রতিও কৃতজ্ঞ।’
লক্ষ্য স্থির করে এগিয়ে যেতে হবে
নিজের ওপর বিশ্বাস রাখলেই সফল হওয়া যায় দাবি করে এই সংগ্রামী যুবক বলেন, ‘আমরা অনেক সময় নিজের ওপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলি। মনে রাখতে হবে, যেখানে আশা, সেখানে হতাশা। তবে হতাশ হওয়া যাবে না। সবসময় নিজের ওপর বিশ্বাস রাখতে হবে। আমি পারবো, এই আত্মবিশ্বাস থাকা চাই। এ জন্য প্রথমে লক্ষ্য স্থির করতে হবে। সেই লক্ষ্যে পৌঁছাতে চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। তবেই সফলতা আসবে।’
ইচ্ছেশক্তি প্রবল থাকলে কোনো প্রতিকূলতাই বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না উল্লেখ করে রায়হান বলেন, ‘যারা আমার মতো; হাত-পা নেই এবং দরিদ্র। তাদের বলতে চাই—টাকার অভাবে পড়ালেখা করা যাচ্ছে না এটি অত্যন্ত নিম্নমানের অজুহাত। টাকার জন্য লেখাপড়া আটকে থাকে না। ইচ্ছেশক্তি হলো আসল। ইচ্ছেশক্তির জোরে আমি এই পর্যায়ে আসতে পেরেছি। যারা হতাশাগ্রস্ত তাদের জন্য ভবিষ্যতে আমার কিছু করার স্বপ্ন আছে। সে জন্য নিজেকে তৈরি করছি।’








