চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) নির্বাচন ২০২১ একটি পূর্বপরিকল্পিত তামাশা ও প্রহসনের নির্বাচন। সরকারি দল মনোনীত প্রার্থীকে মেয়র ঘোষণা দেওয়ার কৃত্রিম আনুষ্ঠানিকতামাত্র। আদালতের পূর্ণাঙ্গ রায়ে নির্বাচনি ট্রাইব্যুনাল এবং জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ মোহাম্মাদ খাইরুল আমীন এ কথা উল্লেখ করেন।
এর আগে, মঙ্গলবার (১ অক্টোবর) চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) বিএনপি দলীয় মেয়রপ্রার্থী ডা. শাহাদাত হোসেনকে মেয়র ঘোষণা করে রায় দেন আদালত। একই সঙ্গে আগামী ১০ দিনের মধ্যে গেজেট প্রকাশ করার জন্য নির্বাচন কমিশন সচিবকে নির্দেশ দিয়েছেন। পৌনে ৩ বছর আগে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে ফলাফল কারচুপির অভিযোগে দায়ের করা মামলায় আদালত আজ এ আদেশ দেন।
রায়ে আদালত বলেছেন, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) ২০২১ সালের ২৭ জানুয়ারি নির্বাচনের দিনে নির্বাচনি চিত্র, ঘটনা ও অনিয়ম এবং স্থানীয়, জাতীয় প্রিন্ট, ও ইলেক্ট্রনিক এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক, ইউটিউব প্রকাশিত অব্যবস্থাপনা ও অনিয়মের পাহাড়সম অভিযোগে প্রতীয়মান হয় যে, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচন একটি পূর্বপরিকল্পিত তামাশা ও প্রহসনের নির্বাচন। সরকারি দল মনোনীত প্রার্থীকে মেয়র ঘোষণা দেওয়ার কৃত্রিম আনুষ্ঠানিকতামাত্র। ফলাফলের পার্থক্য সম্পূর্ণরূপে অবিশ্বাস্য ও অযৌক্তিক এবং বাস্তবতাবিবর্জিত।
এতে আরও বলা হয়, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচন ২০২১-এর দায়িত্বপ্রাপ্ত রিটার্নিং কর্মকর্তা ও আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তার ফলাফলের চট্টগ্রাম অফিস থেকে প্রাপ্ত কপি এবং মামলার বিবাদী তৎকালীন আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা মো.হাসানুজ্জামানের ২৮ ফেব্রুয়ারির স্বাক্ষরিত, নির্বাচন কমিশন সচিবালয় থেকে সরবরাহকৃত কপি, কেন্দ্রভিত্তিক ফলাফল প্রকাশের জালজালিয়াতি ও অনিয়মের চিত্র চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচন ২০২১-এর ভোটের ফলাফল গ্যাজেটের চরম অনিয়ম ও জালজালিয়াতির চিত্র স্পষ্টত প্রতিফলিত হয়। তৎকালীন আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা, নির্বাচন কমিশনারের সচিব ও প্রধান নির্বাচন কমিশনার নির্বাচনি আইন ও বিধিমালাকে কোনও প্রকার তোয়াক্কা না করে রেজাউল করিম চৌধুরীর কর্মকাণ্ডকে বৈধতা দান করেছেন এবং অন্যায় ও অবৈধভাবে নির্বাচিত ঘোষণা করেছেন।
রায়ে উল্লেখ করা হয়, সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে রেজাউল করিম চৌধুরীকে নির্বাচিত ঘোষণা করার জন্য তৎকালীন আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা, নির্বাচন কমিশনারের সচিব ও প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ বিবাদীর নির্বাচনি এজেন্ট এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) নির্বাচন বিধিমালা-২০১০, সিটি করপোরেশন (নির্বাচন আচরণ) বিধিমালা-২০১৬ এবং সিটি করপোরেশন নির্বাচন (ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিন) বিধিমালা-২০১৯ চরমভাবে লঙ্ঘন করেন।
এতে আরও বলা হয়, চূড়ান্ত অনিয়ম, বেআইনি ভোটারবিহীন নির্বাচন দ্বারা অনুষ্ঠিত তামাশা ও প্রহসনের নির্বাচনের মাধ্যমে মিথ্যা ভিত্তিহীন প্রকাশিত বিগত ২০২১ সালের ৩১ জানুয়ারি গেজেট বাদী কর্তৃক বাতিল ঘোষণার প্রার্থনা করেন। নিকটতম প্রার্থী হিসাবে বাদীকে স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) নির্বাচন বিধিমালা-২০১০ অনুসারে মেয়র পদে বিজয়ী ঘোষণার প্রার্থনা করেন। বাদীর উল্লিখিত দাবির সত্যতা প্রদর্শনী ২২, ২৩, ৩৮, ৩৯ পর্যালোচনায় প্রতীয়মান হয়। এমতাবস্থায়, নির্বাচনি বিধিবিধান প্রতিপালন না করে সম্পূর্ণ অন্যায় ও বেআইনিভাবে রেজাউল করিমকে নির্বাচিত করে বিগত ২০২১ সালের ৩১ জানুয়ারি প্রকাশিত গেজেট বেআইনি, অবৈধ ও ন্যায়নীতির পরিপন্থি।
ডা. শাহাদাত হোসেনের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. মঈনউদ্দীন হোসাইন সোহেল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী ডা. শাহাদাত হোসেনকে নির্বাচিত মেয়র হিসাবে ঘোষণা দিয়ে রায় ঘোষণা করেছেন আদালত। একই সঙ্গে আগামী ১০ দিনের মধ্যে গেজেট প্রকাশ করার জন্য নির্বাচন কমিশন সচিবকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’
২০২১ সালের ২৭ জানুয়ারি চসিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ভোটের দিন দুপুর পর্যন্ত ৪ থেকে ৬ শতাংশ ভোট পড়ে। কিন্তু ভোটের হিসাবে দেখানো হয়, ২২ শতাংশ ভোট পড়েছে। ঘোষিত ফলাফলে ৩ লাখ ৬৯ হাজার ২৪৮ ভোট পাওয়ায় নৌকার প্রার্থী রেজাউল করিম চৌধুরীকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। ঘোষণা অনুসারে, তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির মেয়রপ্রার্থী শাহাদাত হোসেন ধানের শীষ প্রতীকে পেয়েছিলেন ৫২ হাজার ৪৮৯ ভোট।
২০২১ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি চসিক নির্বাচনে কারচুপি ও ফল বাতিল চেয়ে মেয়র প্রার্থী ডা. শাহাদাত হোসেন তৎকালীন প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ ৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। এ মামলায় বিবাদী করা হয়েছিল চসিকের সাবেক মেয়র এম রেজাউল করিম চৌধুরী, আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা মো. হাসানুজ্জামান, নির্বাচন কমিশনারের সচিব, প্রধান নির্বাচন কমিশনার, আবুল মনজুর, এম এ মতিন, খোকন চৌধুরী, মুহাম্মাদ ওয়াহেদ মুরাদ, মো. জান্নাতুল ইসলামকে। দীর্ঘ সাড়ে তিন বছর পর আজ এ মামলায় রায় ঘোষণা করা হয়।








