এবারও ঈদযাত্রায় কষ্ট দেবে ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক

উজ্জল চক্রবর্তী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া
১৫ মার্চ ২০২৬, ০৯:০১আপডেট : ১৫ মার্চ ২০২৬, ০৯:০১

এবারও ঈদযাত্রায় ভোগান্তির কারণ হতে পারে ঢাকা-সিলেট ও চট্টগ্রাম-সিলেট মহাসড়ক। দুটি মহাসড়কের ব্রাহ্মণবাড়িয়া অংশ যাত্রীদের ভোগান্তিতে ফেলবে। সড়ক সংস্কার, সড়কের উন্নয়ন প্রকল্পের কাজের ধীরগতি, সড়কে অবৈধ স্ট্যান্ড, যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা ও তিন চাকার যান চলাচল এই ভোগান্তির অন্যতম কারণ।

যাত্রী ও যানবাহন চালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঈদযাত্রায় প্রতিবারই ভোগান্তির কারণ হয় ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অংশ। আশুগঞ্জ থেকে বিশ্বরোড মোড় পর্যন্ত নির্মাণাধীন ১২ কিলোমিটার সড়কটি ভোগান্তির যত কারণ। ছয় লেন মহাসড়কের আশুগঞ্জ গোলচত্বর ও বিশ্বরোড মোড়ে প্রায় প্রতিদিন যানজট লেগেই থাকছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। একইভাবে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আরেক অংশ চট্টগ্রাম-সিলেট মহাসড়কের সদর উপজেলার সুলতানপুর ও আখাউড়া উপজেলার ধরখার ইউনিয়নের তন্তর বাজার এলাকাজুড়ে যানজট লেগেছে থাকছে। ঈদে যানবাহন বাড়লে এই ভোগান্তি কয়েকগুণ বেড়ে যাবে।

যানজটের যত কারণ

যাত্রী ও যানবাহন চালকরা বলছেন, দুটি মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে সিএনজি অটোরিকশার অবৈধ স্ট্যান্ডগুলো মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়েছে। এজন্য ঈদযাত্রায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভোগান্তি পোহাতে হবে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নির্মাণাধীন ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ব্রাহ্মণবাড়িয়া অংশের ওপর দিয়ে চলাচল করেন হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সিলেট ও সুনামগঞ্জের কয়েক লাখ যাত্রী ও পরিবহন। রাজধানী পার হওয়ার পর বেশিরভাগ সড়কে স্বাভাবিকভাবে যাতায়াত করা গেলেও আশুগঞ্জ গোলচত্বর ও বিশ্বরোড গোলচত্বর অংশ অতিক্রম করতে কয়েক ঘণ্টা লেগে যায়। দুটি গোলচত্বরে মহাসড়কের কাজ চলমান থাকায় প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকতে হয়। গত কয়েক বছরেও কাজ শেষ না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন যাত্রী ও চালকরা। এর মধ্যে ঈদের ছুটিতে যানবাহনের চাপ কয়েক গুণ বেড়ে যাবে। ফলে মহাসড়কের এই অংশজুড়ে তীব্র যানজটের পাশাপাশি ভোগান্তির আশঙ্কা করছেন যাত্রী ও চালকরা। একইসঙ্গে বিশ্বরোড, কুট্টাপাড়া, আশুগঞ্জ গোলচত্বর, সোহাগপুর এবং সোনারামপুরে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা সিএনজি অটোরিকশার স্ট্যান্ডগুলো যানজটের অন্যতম কারণ হবে।

একইভাবে চট্টগ্রাম-সিলেট মহাসড়কের ব্রাহ্মণবাড়িয়া অংশের দুটি স্থান যানজটের জন্য অন্যতম। এর মধ্যে সদর উপজেলার সুলতানপুর ও আখাউড়া উপজেলার ধরখার ইউনিয়নের তন্তর বাজারের অংশে ভাঙাচোরা সড়কের কারণে যানবাহনকে ধীরগতিতে চলতে হয়। সড়কটির কাউতলী, রামরাইল, রাধিকা, সুলতানপুর, তন্তর, তিনলাখ পীর, সৈয়দাবাদ, মনকসাইর, খাড়েরা এবং কুটি চৌমুহনীতে মহাসড়কের দুই পাশে সিএনজি অটোরিকশা স্ট্যান্ডের কারণে তীব্র যানজটের শঙ্কা আছে। পাশাপাশি যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা, তিন চাকার যান চলাচলও ভোগান্তির কারণ হতে পারে।

আশুগঞ্জ গোলচত্বর ও বিশ্বরোড মোড়ে প্রায় প্রতিদিন যানজট লেগেই থাকছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা

সড়কে অবৈধ স্ট্যান্ড ও সংস্কারকাজের ধীরগতিকে দুষছেন চালকরা

ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ট্রাকচালক মো. মোজাম্মেল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এখান দিয়ে গাড়ি নিয়ে এলেই আশুগঞ্জ গোলচত্বর এবং বিশ্বরোডের কথা মনে হলে গায়ে জ্বর চলে আসে। সড়কটির অবস্থা নাজুক। বছরের পর বছর সংস্কারকাজ চলছে। কিন্তু শেষ হচ্ছে না। আমরা এই ভোগান্তি থেকে পরিত্রাণ চাই।’ 

তিনি আরও বলেন, ‘মহাড়কের দুই পাশে সিএনজি অটোরিকশা, ব্যাটারিচালিত রিকশার স্ট্যান্ড আছে। এসব স্ট্যান্ড দুর্ঘটনার কারণও। পাশাপাশি এলোমেলোভাবে চলাচল করায় যানজটের মাত্রা বেড়ে গেছে।’

ভোগান্তির কথা জানিয়ে পিকআপচালক মো. আফসার উদ্দিন বলেন, প্রতিদিনই সড়কটিতে যানজট লেগে থাকে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা সড়কে কেটে যায়। এই সড়কে যেন ভোগান্তির শেষ নেই আমাদের। ঈদযাত্রায় যানবাহনের চাপ বাড়লে ভোগান্তির মাত্রা আরও বাড়বে। অন্তত সড়কের পাশ থেকে অটোরিকশা স্ট্যান্ডগুলো দ্রুত সরানো উচিত।’

ঢাকা থেকে সিলেটগামী বাসযাত্রী রমিজ আলী বলেন, ‘ঢাকা থেকে সিলেট পর্যন্ত তেমন কোনও সমস্যা নেই। একমাত্র আশুগঞ্জ ও বিশ্বরোড মোড়ে যত ঝামেলা। এখানে স্থানীয় প্রশাসনের কোনও কার্যকর পদক্ষেপ আছে বলে মনে হয় না। যদি প্রশাসন পদক্ষেপ গ্রহণ করতো তাহলে এমন যানজট হতো না।’

যে কারণে প্রকল্পের কাজে ধীরগতি 

প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ২০১৭ সালের অক্টোবর মাসে আশুগঞ্জ নৌবন্দর থেকে আখাউড়া স্থলবন্দর পর্যন্ত ৫১ কিলোমিটার দুই লেন থেকে চার লেন সড়ক নির্মাণের লক্ষ্যে একনেকে অনুমোদন হয়। একনেকে পাসের পর ২০১৮ সালে ভারতীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এফকনস ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেডকে নিয়োগ দেওয়া হয়। প্রকল্পের তিনটি প্যাকেজের সব কটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব তাদেরকে দেওয়া হয়। করোনার কারণে ২০১৯, ২০২০ ও ২০২১ সালে তেমন একটা কাজ হয়নি। ২০২২ সালে প্রকল্পটির কাজ পুরোদমে শুরু হয়। স্থানীয় প্রকৌশলী ও শ্রমিকদের পাশাপাশি তিন শর মতো ভারতীয় নাগরিক এই প্রকল্পে কাজ করতেন। কিন্তু ২০২৪ সালে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর সবকিছু বদলে যায়। পরদিনই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এফকনস ইনফ্রাস্ট্রাকচার তাদের সব ভারতীয় কর্মীকে প্রকল্প এলাকা থেকে প্রত্যাহার করে নেয়। পরে তাদের নিজ দেশ ভারতে নিয়ে যায়। বেশিরভাগ কর্মী আখাউড়া-আগরতলা সীমান্ত দিয়ে ভারতে চলে যান। 

এর মধ্যে জোরাতালি দিয়ে চারলেন মহাসড়কটির একপাশ নির্মাণ করতে কেটে যায় আট বছর। ২০২৫ সালের ৩১ জুন প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়। এই সময়ে প্রকল্পের কাজ হয়েছে ৬০ শতাংশ। পরে সময় বাড়িয়ে ২০২৭ সালে জুনে নির্মাণকাজ শেষ করার সময় নির্ধারণ করা হয়।

তিনটি প্যাকেজে নির্মাণ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫ হাজার ৭৯১ কোটি টাকা। এর মধ্যে ধরখার থেকে আখাউড়া স্থলবন্দর পর্যন্ত ৩ নম্বর প্যাকেজ বাতিল করা হয়। যার কারণে প্রকল্প থেকে ৬৫৪ কোটি টাকা কমে যায়। বর্তমানে সংশোধিত দুটি প্যাকেজে প্রকল্পটির নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে ৫ হাজার ১৩৪ কোটি টাকা।

যা বললেন প্রকল্পের ব্যবস্থাপক

এ বিষয়ে প্রকল্পের ব্যবস্থাপক মো. শামীম আহমেদ বলেন, ‘৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর  নিরাপত্তাজনিত কারণে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সব কর্মী ভারতে চলে গেছেন। ইতিমধ্যে তাদের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ হয়েছে। তারা জানিয়েছেন, ভারতীয় হাইকমিশন থেকে নিরাপত্তাসংক্রান্ত সবুজ সংকেত পেলেই কেবল কাজে ফিরবেন।’

প্রকল্পের বিভিন্ন জিনিসপত্রও এখন অনেকটা অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। এদিকে অর্ধসমাপ্ত কাজের জন্য জনগণের ভোগান্তি বেড়েছে। মহাসড়কের এক পাশে খানাখন্দ থাকায় অনেকটা ঝুঁকি নিয়ে যান চলাচল করতে হচ্ছে। সৃষ্টি হচ্ছে তীব্র যানজট। এতে যানচালক ও যাত্রীদের ভোগান্তি বাড়ছে।

সুলতানপুর ও আখাউড়া উপজেলার ধরখার ইউনিয়নের তন্তর বাজার এলাকাজুড়ে যানজট লেগেছে থাকছে

এ ব্যাপারে শামীম আহমেদ বলেন, ‘বর্তমানে পর্যাপ্ত নির্মাণসামগ্রী রয়েছে। কাজও পুরোদমে চলছে। কোনও সমস্যা নেই। তবে আশুগঞ্জ গোলচত্বর ও বিশ্বরোড গোলচত্বরের ১২ কিলোমিটার অংশের দুটি স্থান যানজটের জন্য অন্যতম। মহাসড়কের এই অংশটি নির্মাণাধীন ঢাকা থেকে সিলেট পর্যন্ত ২১০ কিলোমিটার ছয়লেন সড়কের সঙ্গে মিল রেখে বর্ধিত করা হচ্ছে। মূলত এসব কারণে প্রকল্পের কাজের দেরি হয়েছে।’

শামীম আহমেদ জানিয়েছেন, ঈদযাত্রায় যেন ভোগান্তি সৃষ্টি না হয়, সেই লক্ষ্যে নির্মাণাধীন ছয়লেন মহাসড়কটির আশুগঞ্জ গোলচত্বর ও বিশ্বরোড মোড়ে সড়কের উভয় অংশের দুটি লেনে অস্থায়ী ডাইভারশন সড়ক নির্মাণ করে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। ১৬ মার্চ এগুলো চালুর লক্ষ্য নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। আশা করা যায়, ঈদযাত্রায় সড়কের এসব অংশ কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে যাবে।

হাইওয়ে পুলিশের প্রস্তুতি

মহাসড়কে দায়িত্বরত হাইওয়ে পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জাহাঙ্গীর আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ঈদযাত্রা নির্বিঘ্নে করার লক্ষ্যে অতিরিক্ত লোকবল অর্থাৎ ৩৮ জন হাইওয়ে পুলিশ সদস্যের পাশাপাশি আরও ১৮ জন অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য নিয়োজিত থাকবেন। একইসঙ্গে দুর্ঘটনাকবলিত গাড়ি উদ্ধারের জন্য রেকারও আছে। আশা করছি, ভোগান্তি ছাড়াই যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে পারবো।’

/এএম/ 
সম্পর্কিত
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
খসে পড়ছে পলেস্তারা, তার ভেতরে নাগরিক সেবা
ফিরতি যাত্রায় দুর্ভোগ, বাড়তি ভাড়া আদায়
সর্বশেষ খবর
হাদি হত্যা নিয়ে মন্তব্যের জের, মমতার বিরুদ্ধে মামলা
হাদি হত্যা নিয়ে মন্তব্যের জের, মমতার বিরুদ্ধে মামলা
তীব্র গরমে ৪ জনের মৃত্যু
তীব্র গরমে ৪ জনের মৃত্যু
বজ্রপাতে একদিনে ১২ জনের মৃত্যু
বজ্রপাতে একদিনে ১২ জনের মৃত্যু
মধ্যপ্রাচ্যের তিন যুদ্ধবিরতিকেই কেন যুদ্ধ মনে হচ্ছে
মধ্যপ্রাচ্যের তিন যুদ্ধবিরতিকেই কেন যুদ্ধ মনে হচ্ছে
সর্বাধিক পঠিত
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
আপা ডাকায় নয়, বাসি মিষ্টি পাওয়ায় জরিমানা করেছি
সংবাদ সম্মেলনে ইউএনও মুনমুন নাহার আশাআপা ডাকায় নয়, বাসি মিষ্টি পাওয়ায় জরিমানা করেছি