টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকা এখনও পানির নিচে। সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি সাতকানিয়া ও বাঁশখালী উপজেলায়। দুই উপজেলার কয়েক লাখ বাসিন্দা এখনও পানিবন্দি।
এ ছাড়াও হাটহাজারী, ফটিকছড়ি, বোয়ালখালী, চন্দনাইশ ও লোহাগাড়া উপজেলায়ও বন্যায় বহু মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। সাত উপজেলায় জেলা প্রশাসনেন হিসেবে শুক্রবার (১০ জুলাই) পানিবন্দি এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ৫৪ হাজার ৫৯০ জন। তারা খাদ্য সংকটে পড়েছেন। এসব উপজেলায় পর্যাপ্ত ত্রাণ পৌঁছেনি বলে জানিয়েছেন বন্যাকবলিত এলাকার বাসিন্দারা। একই সঙ্গে বিশুদ্ধ পানির সংকটেও পড়েছেন তারা।
সাতকানিয়া ও বাঁশখালী উপজেলায় গত কয়েক দিন ধরে বেশিরভাগ এলাকায় বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন থাকায় অন্ধকারে দিন কাটছে অধিকাংশ পরিবারের। ঘরে নেই খাবার, রান্নার সুযোগ নেই, তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানির। মোবাইল ফোনে চার্জ না থাকায় অনেকেই পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছেন না আত্মীয়-স্বজনরা। এ দুই উপজেলায় ভেঙে পড়েছে অসংখ্য বসতঘর।
বাঁশখালী উপজেলায় সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি বিরাজ করছে পশ্চিম বাঁশখালীর কাথারিয়া, বড়ইতলী, গণ্ডামারা, ডোমরা, কদমরসূল, খানখানাবাদ, বাহারছড়া, চাম্বল, ছনুয়া, শেখেরখীল, সরল, রায়ছাটা, পুঁইছড়িসহ উপকূলীয় বিভিন্ন এলাকায়। এসব এলাকার অধিকাংশ বাড়িঘর পানির নিচে তলিয়ে গেছে। অনেক একতলা বাড়িও পুরোপুরি পানিতে ডুবে রয়েছে। অসংখ্য কাঁচা ঘর বিধ্বস্ত হয়েছে, পাকা ও আধাপাকা বাড়ির নিচতলায় জমেছে কোমরসমান পানি। অনেক পরিবার ঘর ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্র কিংবা আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে। আবার অনেকে বাড়ির উঁচু অংশ কিংবা টিনের ছাদে আশ্রয় নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
বাঁশখালী উপজেলার ছনুয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা আনোয়ার সাঈফী বলেন, বন্যায় অন্যান্য ইউনিয়নের মতো ছমুয়া ইউনিয়নের বেশিরভাগ এলাকা পানিতে ডুবে আছে। এই এলাকায় পানির কারণে ঘরে রান্না করা যাচ্ছে না। সরকারি সহায়তাও তেমন মিলছে না। এখানে খাবারের পাশাপাশি বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।
জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, টানা পাঁচ দিনের ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, চন্দনাইশ, বাঁশখালী, হাটহাজারী ও ফটিকছড়িসহ জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত সাতকানিয়া উপজেলা। এই উপজেলার ১৭টি ইউনিয়নের সবকটিই পানির নিচে তলিয়ে গেছে। শুধু এই উপজেলাতেই চার লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দি আছেন।
সাতকানিয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খোন্দকার মাহমুদুল হাসান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, উপজেলার সব ইউনিয়ন পানিতে ডুবে আছে। অসংখ্য ফসলি জমি ও মাছের ঘের প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি এলাকার মানুষের মধ্যে শুকনো খাবার বিতরণের জন্য উপজেলায় ৮৯টি জরুরি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে।
শুক্রবার লচট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা সাতকানিয়া উপজেলার বন্যাকবলিত ঢেমশা ইউনিয়ন ও পৌরসভা এলাকা সরেজমিনে পরিদর্শন করেন। দুর্গত মানুষের খোঁজখবর নেওয়ার পাশাপাশি ৮০০ পরিবারের মধ্যে জরুরি ত্রাণ বিতরণ করেন। প্রতিটি প্যাকেটে ছিল এক কেজি করে মুড়ি, চিড়া ও চিনি, দুটি বিস্কুটের প্যাকেট, দুই লিটার বিশুদ্ধ পানি, চারটি মোমবাতি, পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট এবং প্রয়োজনীয় জরুরি ওষুধ।
পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের জেলা প্রশাসক জানান, দুর্গম এলাকায় দ্রুত উদ্ধারকাজ চালাতে জেলা প্রশাসনের অনুরোধে শনিবার (১১ জুলাই) থেকেই বাংলাদেশ সেনাবাহিনী স্পিডবোট নিয়ে উদ্ধার অভিযানে নামছে। কোন উপজেলায় কতটি স্পিডবোট প্রয়োজন এবং কোন এলাকাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, সে বিষয়ে সেনাবাহিনীকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামের ১৬টি উপজেলা ও মহানগরের ১৭৬টি ইউনিয়ন ও পৌরসভা বন্যাকবলিত হয়েছে। বর্তমানে ১ লাখ ৮৮ হাজার ৬৪৮টি পরিবার পানিবন্দি এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ৫৪ হাজার ৫৯০ জন। পাহাড়ধস, দেয়ালধস ও পানিতে ডুবে এ পর্যন্ত ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং আহত হয়েছেন পাঁচ জন। বন্যার্তদের জন্য এ পর্যন্ত ৭০০ মেট্রিক টন চাল ও ৬০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৩০০ মেট্রিক টন চাল, ৪৩ লাখ টাকা, ২২ হাজার ২৫০টি শুকনো খাবারের প্যাকেট এবং ৯ হাজার ৮০০টি রান্না করা খাবারের প্যাকেট বিতরণ করা হয়েছে। জেলা প্রশাসনের কাছে বর্তমানে আরও ৪০০ মেট্রিক টন চাল ও ১৭ লাখ টাকা জরুরি ত্রাণ হিসেবে মজুত রয়েছে।
সবার কাছে ত্রাণ না পৌঁছানোর কথা স্বীকার করেছেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। তিনি বলেন, অনেক এলাকায় সাধারণ নৌকাও পৌঁছাতে পারছে না। তাই দুর্গম এলাকায় স্পিডবোট ব্যবহার করে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা হবে। উদ্ধার হওয়া মানুষের জন্য জেলার ৬৭০টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। বর্তমানে সেখানে ২৩ হাজার ৮৫০ জন আশ্রয় নিয়েছেন। আশ্রয়কেন্দ্রে শুকনো খাবারের পাশাপাশি রান্না করা খাবারেরও ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
সাতকানিয়ার জন্য ইতিমধ্যে ৯ লাখ টাকা ও ২৫ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ইউনিয়নগুলোতে ওই চাল দিয়ে রান্না করা খাবার বিতরণ করা হচ্ছে। জেলার অন্যান্য ক্ষতিগ্রস্ত উপজেলাতেও একই কার্যক্রম চলছে। সাতকানিয়ার পরিস্থিতি সরেজমিনে পরিদর্শনের পর চট্টগ্রামের জন্য অতিরিক্ত বিশেষ বরাদ্দ দেওয়ার আশ্বাসও পাওয়া গেছে বলে জানান জেলা প্রশাসক।
বন্যাকবলিত সাতকানিয়া, বোয়ালখালী, হাটহাজারী ও ফটিকছড়িতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে উদ্ধারকাজে অংশ নিচ্ছে। সন্দ্বীপে সহায়তা করছে বাংলাদেশ কোস্টগার্ড। পাশাপাশি পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির স্বেচ্ছাসেবকেরা উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন।
জেলা প্রশাসক বলেন, গত কয়েক দিনের তুলনায় বৃষ্টির তীব্রতা কিছুটা কমেছে। আবহাওয়া অধিদফতরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী দুই-এক দিনের মধ্যে বৃষ্টিপাত আরও কমলে পাহাড়ি ঢলের পানিও নেমে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে শনিবার সাংগু নদীর পানি বিপদসীমা অতিক্রম করেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে সমন্বয় করে স্লুইসগেট ও পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা সচল রাখতে কাজ চলছে।









