নামছে পানি, কাঁদছে মানুষ

নাসির উদ্দিন রকি, চট্টগ্রাম
১৪ জুলাই ২০২৬, ১০:০১ আপডেট : ১৪ জুলাই ২০২৬, ১০:০১

টানা অতি ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যার পানি চট্টগ্রাম জেলা থেকে ধীরে ধীরে নামতে শুরু করেছে। পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে ভেসে উঠছে বন্যার রেখে যাওয়া ভয়াবহ ক্ষতচিহ্ন। কোথাও বসতঘর ধসে পড়েছে, কোথাও ভেঙে গেছে রাস্তাঘাট। বানের তোড়ে তছনছ হয়েছে বিস্তীর্ণ সবজিক্ষেত ও ফসলি জমি। ভেসে ঘের ও প্রকল্পের কোটি কোটি টাকার মাছ, ধ্বংস হয়েছে পোলট্রি খামার। চারদিকে এখন কেবল ক্ষয়ক্ষতির চিহ্ন আর বিপর্যস্ত জনপদের করুণ ছবি। এসব অবস্থা দেখে কাঁদছেন ক্ষতিগ্রস্ত মানুষজন।

সাতকানিয়া উপজেলায় সোমবার থেকে বন্যার পানি নামতে শুরু করায় সরকারি আশ্রয়কেন্দ্র ছেড়ে বাড়ি ফিরছেন দুর্গত মানুষজন। তবে ঘরে ফিরেও মিলছে না স্বস্তি। বসতঘরজুড়ে জমে আছে কাদা ও ময়লা-আবর্জনা। পানিতে ভিজে নষ্ট হয়েছে আসবাবপত্র ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। আবার কারও ঘর ধসে পড়েছে। থাকার কোনও পরিবেশও নেই। ভেঙে যাওয়া বসতঘর দেখে অনেকেই কান্নায় ভেঙে পড়েন। সেই সঙ্গে খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েছে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো।

সাতকানিয়া উপজেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, রবিবার পর্যন্ত উপজেলার সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে প্রায় এক হাজার ৫০০ মানুষ আশ্রয় নিয়েছিলেন। সোমবার বন্যার পানি কমতে শুরু করায় তাদের মধ্যে প্রায় এক হাজার ২০০ জন ইতোমধ্যে নিজ নিজ বাড়িতে ফিরে গেছেন। বাকিরা পানি কমলে ফিরে যাবেন।

সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খন্দকার মাহমুদুল হাসান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বন্যার পানি কমতে শুরু করেছে। এই উপজেলার ১৮টি ইউনিয়নের ৮৫ শতাংশ এলাকা বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি ইউনিয়ন থেকে পানি কমে গেছে। কিছু কিছু এলাকায় এখনও পানি আছে। রাস্তাঘাট ডুবে আছে। পানি কমে আসায় লোকজন নিজ ঘরে ফিরতে শুরু করেছেন। বেশ কিছু মাটির ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এগুলোর তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। আশা করছি বৃষ্টি না হলে আগামী কয়েকদিনের মধ্যে সব এলাকা থেকে পানি কমে আসবে।’

এদিকে বাঁশখালীতেও পানিবন্দি অবস্থায় আছে হাজার হাজার মানুষ। এই উপজেলার ছনুয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা সাঈফ আনোয়ার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বন্যার পানি কমতে শুরু করেছে। কেউ কেউ বাড়িঘরে গিয়ে যে পরিবেশ দেখতে পাচ্ছেন, তাতে বসবাসের পরিবেশ নাই। অনেকেই গিয়ে দেখছেন তার শেষ সম্বল বসতঘরটি পুরোপুরি ভেঙে গেছে। ঘরবাড়ি হারিয়ে অনেক দরিদ্র মানুষ কান্না করছেন। সরকারি ত্রাণ সহায়তা ছিল অপ্রতুল। দুর্গত এলাকার অনেক বাসিন্দা সরকারি সহায়তা চোখেও দেখেননি। বন্যার কারণে লোকজন কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। ফলে যেসব মানুষ দিনে এনে দিনে খায় তাদের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক।’  

ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে ঘসে পড়েছে ঘর, এখনও পানিবন্দি চট্টগ্রামের কয়েক লাখ মানুষ

বাঁশখালী উপজেলার গন্ডামারা ইউনিয়নের বাসিন্দা শফকত হোসাইন চাটগামী বলেন, ‘এখনও গন্ডামারা, ছনুয়াসহ বেশ কিছু ইউনিয়নে পানিতে তলিয়ে আছে। অনেক পরিবার বাড়িঘরের মায়া ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্রে যাননি।’

বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রুহুল আমিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এই উপজেলার এখনও ৩০ হাজারের মতো মানুষ পানিবন্দি আছেন। আগামী কয়েকদিন বৃষ্টি না হলে আশা করছি পানি নেমে যাবে। ইতিমধ্যে অনেকেই নিজ বাড়িতে যেতে শুরু করেছেন। অনেকগুলো মাটির ও কাঁচাঘর বন্যার পানিতে ধসে গেছে। প্রাথমিক হিসেবে মনে হচ্ছে চার হাজারের বেশি ঘর ধসে পড়েছে। সেগুলো নতুন করে নির্মাণ করতে হবে। ইতিমধ্যে আমাদের টিম মাঠে কাজ করছে। কতটি ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তার তালিকা করা হচ্ছে।’

চট্টগ্রামের মহানগরসহ ১৬টি উপজেলায় জলাবদ্ধতা ও বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। আক্রান্ত এলাকাগুলো হলো- চট্টগ্রাম মহানগর, মীরসরাই, সীতাকুণ্ড, ফটিকছড়ি, রাউজান, রাঙ্গুনিয়া, হাটহাজারী, সাতকানিয়া, পটিয়া, চন্দনাইশ, লোহাগাড়া, সন্দ্বীপ, বোয়ালখালী, আনোয়ারা, বাঁশখালী ও কর্ণফুলী। এসব উপজেলার ১২২টি ইউনিয়ন বা এলাকা দুর্যোগের কবলে পড়েছে। চট্টগ্রামে বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বাঁশখালী ও সাতকানিয়া উপজেলা। পাহাড়ধস ও বন্যায় ১৩ জনের মৃত্যু এবং ১২ জন আহত হয়েছেন। ৪১৫টি আশ্রয়কেন্দ্রে বর্তমানে আশ্রয় নিয়েছেন ১৬ হাজার ৮২১ জন।

চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা জানিয়েছেন, সোমবার পর্যন্ত ৬৮৪ টন চাল এবং নগদ ৬২ লাখ ৫০ হাজার টাকা বিতরণ করা হয়েছে। চাহিদা ছিল ৬২২ টন চাল এবং ১ কোটি ১৫ লাখ টাকার। আগামী কয়েকদিনও ত্রাণ বিতরণ করা হবে। এসব কার্যক্রম অব্যাহত আছে জেলা প্রশাসনের।

 

/এএম/ 
সম্পর্কিত
বঙ্গোপসাগরে লঘুচাপের শঙ্কা, যেসব অঞ্চলে বৃষ্টির পূর্বাভাস
নেপালে ফের আকস্মিক বন্যা, ভেসে গেলো ঘরবাড়ি-সেতু
রাজধানীতে বৃষ্টি, কালো মেঘে ঢেকে আছে পুরো আকাশ 
সর্বশেষ খবর
আশুলিয়ায় কারখানায় নারী শ্রমিকের মৃত্যু, হাসপাতালে লাশ নিয়ে মারামারি
আশুলিয়ায় কারখানায় নারী শ্রমিকের মৃত্যু, হাসপাতালে লাশ নিয়ে মারামারি
উত্তরায় মিনিসোর ফ্ল্যাগশিপ স্টোরের যাত্রা শুরু
উত্তরায় মিনিসোর ফ্ল্যাগশিপ স্টোরের যাত্রা শুরু
শনিবার জবিতে আবারও গরুভোজের আয়োজন, থাকছে কাওয়ালি সন্ধ্যা
শনিবার জবিতে আবারও গরুভোজের আয়োজন, থাকছে কাওয়ালি সন্ধ্যা
পূজামণ্ডপে কিশোর গ্যাংয়ের সংঘর্ষ রোধ, আনসার সদস্যদের হাতে আটক ৭
পূজামণ্ডপে কিশোর গ্যাংয়ের সংঘর্ষ রোধ, আনসার সদস্যদের হাতে আটক ৭
সর্বাধিক পঠিত
মৃত্যুর ৪ দিন পর দাফন, নাসিমা খানের জানাজায় ছিলেন না বড় কোনও তারকা
মৃত্যুর ৪ দিন পর দাফন, নাসিমা খানের জানাজায় ছিলেন না বড় কোনও তারকা
ডিসির নির্দেশে রাতারাতি বদলে গেলো দেশলাই কাঠির প্রতিমা
ডিসির নির্দেশে রাতারাতি বদলে গেলো দেশলাই কাঠির প্রতিমা
প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকাতে সচিবালয়ে রাতে থাকছেন আমিনুল হক
প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকাতে সচিবালয়ে রাতে থাকছেন আমিনুল হক
সরকারি মাঠ দখলের অভিযোগ জামায়াত নেতার বিরুদ্ধে, বললেন ‘এখন আমাদের সময়’
সরকারি মাঠ দখলের অভিযোগ জামায়াত নেতার বিরুদ্ধে, বললেন ‘এখন আমাদের সময়’
বিএসএফের ধরে নিয়ে যাওয়া ২ পুলিশ সদস্য কেমন আছেন, জানালেন বিজিবি পরিচালক 
বিএসএফের ধরে নিয়ে যাওয়া ২ পুলিশ সদস্য কেমন আছেন, জানালেন বিজিবি পরিচালক