উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন ছিল ফাহিমা আক্তারের। অনলাইনে নিজের হাতে তৈরি কেক, পোশাক বিক্রি করে একদিন বড় ব্যবসায়ী হবেন, সংসারে সচ্ছলতা ফেরাবেন, ছোট পরিসরে শুরুও করেছিলেন। এমন এক বুক স্বপ্ন নিয়ে ফাহিমা দেড় মাস আগে স্বামীর সঙ্গে রাজধানীর উত্তর বাড্ডার ভাটারা এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় উঠেছিলেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন থেমে গেলো একটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনায়। স্বামী, ছোট ভাগনিসহ গ্রামের বাড়িতে ফিরলো সেই ফাহিমার লাশ। গত ২১ জুলাই ভোর ৪টার দিকে রাজধানীর নতুন বাজারের ১০০ ফিট সড়কের একটি ছয়তলা ভবনের নিচতলায় গ্যাস লাইনের লিকেজ থেকে ভয়াবহ বিস্ফোরণে থেমে যায় তার স্বপ্ন।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ১০ মাস আগে ফাহিমা আক্তার ও আনোয়ার হোসেনের বিয়ে হয়। দেড় মাস আগে তারা ঢাকায় গিয়ে সংসার শুরু করেন। ফাহিমার স্বপ্ন ছিল নিজের অনলাইন ব্যবসাকে বড় করবেন, গড়ে তুলবেন নিজেদের ভবিষ্যৎ। তার সংসারে ছিল আট বছরের ভাগনি হাফসা। তাকে ঢাকায় নতুন স্কুলে ভর্তি করাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু উত্তর বাড্ডার ভাড়া বাসায় গ্যাসলাইনের লিকেজ থেকে বিস্ফোরণে মুহূর্তেই সবকিছু বদলে গেছে। দগ্ধ হয়ে মারা গেছেন আনোয়ার হোসেন ওরফে শাহিন (২৫), শিশু হাফসা ও সর্বশেষ ফাহিমা (২০)। এক পরিবারের তিন জনের মৃত্যুতে কুমিল্লার দেবীদ্বারে স্বজনদের এখন শুধু কান্না আর শোকের দীর্ঘশ্বাস।
গত ২১ জুলাই ভোরে রাজধানীর উত্তর বাড্ডার নতুন বাজারের ১০০ ফিট সড়ক এলাকার একটি ছয়তলা ভবনের নিচতলায় জমে থাকা গ্যাস থেকে বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।
ফাহিমা দেবীদ্বার উপজেলার গোমতী আবাসিক এলাকার বাসিন্দা গোলাম হোসেনের ছোট মেয়ে। জাফরগঞ্জ মীর আবদুল গফুর ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করার পর স্নাতকে (সম্মান) ভর্তি হন। পড়াশোনার পাশাপাশি কেক তৈরি, পোশাক বিক্রি ও বিভিন্ন পণ্যের অনলাইন ব্যবসা নিয়ে নিজের একটি পরিচয় গড়ে তোলার চেষ্টা করছিলেন।
গত বছরের ৯ সেপ্টেম্বরে দেবীদ্বারের গুনাইঘর উত্তর ইউনিয়নের বাঙ্গুরী গ্রামের মির্জা আলী ব্যাপারী বাড়ির আনোয়ার হোসেনের সঙ্গে বিয়ে হয় ফাহিমার। দেড় মাস আগে তারা নতুনবাজারের ১০০ ফিট সড়ক এলাকার একটি বাসার নিচতলায় ভাড়া ওঠেন। বড় বোনের মেয়ে হাফসাকেও সঙ্গে নিয়ে আসেন, যাতে ঢাকায় পড়াশোনা করাতে পারেন।
পরিবারের সদস্যরা জানান, ২১ জুলাই ভোরে বাসায় গ্যাসের লিকেজ থেকে বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে। মুহূর্তের মধ্যে আগুন ছড়িয়ে পড়ে দুটি কক্ষে। গুরুতর দগ্ধ হন আনোয়ার, ফাহিমা ও হাফসা। তাদের জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়। শরীরের প্রায় ৪৫ শতাংশ দগ্ধ হওয়া ফাহিমা কয়েক দিন নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন থাকার পর গতকাল শনিবার সন্ধ্যায় শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। এর আগে গত শুক্রবার সকাল ৬টার দিকে আনোয়ার হোসেন এবং বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১টার দিকে হাফসা আক্তার মারা যান। আনোয়ারের শরীরের ৫০ শতাংশ ও হাফসার ৪০ শতাংশ দগ্ধ হয়েছিল।
আজ সকালে দেবীদ্বার সদরের গোমতী আবাসিক এলাকার চানমিয়া মার্কেট মাঠে ফাহিমার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে তাকে স্বামী আনোয়ার হোসেনের কবরের পাশে বাঙ্গুরী গ্রামে দাফন করা হয়। এর আগে শুক্রবার শিশু হাফসাকে দাফন করা হয় তার বাবার বাড়ি দেবীদ্বারের সুলতানপুর গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে। ফাহিমাকে হারিয়ে বারবার ভেঙে পড়েছেন বাবা গোলাম হোসেন। তার অভিযোগ, ঢাকার ভাড়া বাসায় ওঠার পরই গ্যাস লিকেজের বিষয়টি বাড়ির মালিককে জানানো হয়েছিল, কিন্তু সেটিকে গুরুত্ব দেননি তিনি।
গোলাম হোসেন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘সময়মতো যদি ব্যবস্থা নেওয়া হতো, তাহলে হয়তো আজ আমার মেয়েটা বেঁচে থাকতো। আমার মেয়ের সঙ্গে নাতনি হাফসাও চলে গেলো। একটি অবহেলা আমাদের পুরো পরিবারকে শেষ করে দিল। আমি এর সুষ্ঠু বিচার চাই।’
গুনাইঘর উত্তর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য (মেম্বার) আবু হানিফ বলেন, ‘আনোয়ার ও ফাহিমা দম্পতির মৃত্যুতে পুরো এলাকাবাসী শোকাহত। নতুন সংসার আর সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিয়েই তারা ঢাকায় গিয়েছিলেন। তাদের সঙ্গে নিষ্পাপ শিশুটির এমন করুণ মৃত্যু পুরো এলাকাকে শোকাহত করেছে।’
তিনি বলেন, ‘তিন জনের এমন মর্মান্তিক মৃত্যু এলাকার কেউ মেনে নিতে পারছে না। স্বামী আর স্ত্রীকে গ্রামের একটি কবরস্থানে পাশাপাশি দাফন করা হয়েছে। আর শিশু হাফসাকে তার গ্রামের বাড়ি সুলতানপুরে দাফন করা হয়েছে। এ ঘটনায় যদি বাড়ির মালিকের অবহেলা থাকে তা তদন্ত করে বিচার দাবি করছি।’









