চট্টগ্রামে নিয়ন্ত্রণে আসছে না ডেঙ্গুর প্রকোপ। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে জেলায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন ২ হাজার ৩৬ জন। অথচ সেপ্টেম্বরের প্রথম ১১ দিনেই আক্রান্ত হয়েছেন ৭০৬ জন। অর্থাৎ বছরের প্রথম আট মাসের মোট আক্রান্তের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছেন মাত্র ১১ দিনে। বর্ষা মৌসুমে আক্রান্তের হার দ্রুত বাড়তে থাকায় ডেঙ্গু নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে চট্টগ্রামে।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) নগরীতে ক্র্যাশ প্রোগ্রামসহ মশক নিধন কার্যক্রম চালালেও আক্রান্তের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা থামছে না। নগরীর বিভিন্ন এলাকায় এডিস মশার সম্ভাব্য ১৫৫টি প্রজননস্থলও চিহ্নিত করেছে চসিক।
চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) পর্যন্ত চট্টগ্রামে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন ২ হাজার ৭৪২ জন। এর মধ্যে চট্টগ্রাম মহানগর এলাকায় ১ হাজার ১৬৯ জন, বিভিন্ন উপজেলায় ১ হাজার ২২৪ জন এবং অন্যান্য জেলার ৩৪৯ জন রয়েছেন। এ সময়ে ডেঙ্গুতে মারা গেছেন নয় জন। বর্তমানে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন ২০৮ জন। সবচেয়ে বেশি রোগী ভর্তি রয়েছেন চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে।
চলতি বছর মাসভিত্তিক হিসাবেও আক্রান্তের ঊর্ধ্বমুখী চিত্র স্পষ্ট। জানুয়ারিতে ৬৮ জন, ফেব্রুয়ারিতে ২২, মার্চে ২০, এপ্রিলে ২৯, মে মাসে ৩৭, জুনে ১২২, জুলাইয়ে ৫৩৬, আগস্টে ১ হাজার ২০৬ এবং সেপ্টেম্বরের প্রথম ১১ দিনে ৭০৬ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছেন।
চট্টগ্রামে ডেঙ্গুতে মারা যাওয়া ৯ জনের মধ্যে তিন জন পুরুষ, পাঁচ জন নারী ও একজন শিশু। আক্রান্তদের মধ্যে পুরুষ ১ হাজার ৪৩১ জন, নারী ৭৬০ জন এবং শিশু ৫৫১ জন।
জেলার ১৫ উপজেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে সীতাকুণ্ডে—৩৫৫ জন। এরপর কর্ণফুলীতে ১৯৫, বাঁশখালীতে ৯৫, রাউজানে ৬৭, লোহাগাড়ায় ৫২, পটিয়ায় ৬২, আনোয়ারায় ৬১, সাতকানিয়ায় ৫৭, রাঙ্গুনিয়ায় ৮৩, মিরসরাইয়ে ৩৬, হাটহাজারীতে ৩৭, চন্দনাইশে ৩২, বোয়ালখালীতে ৪৯, ফটিকছড়িতে ৩০ এবং সন্দ্বীপে ১৫ জন আক্রান্ত হয়েছেন।
নগরীতে ১৫৫ সম্ভাব্য প্রজননস্থল
ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার মধ্যে চট্টগ্রাম নগরীতেও এডিস মশার সম্ভাব্য প্রজননস্থল নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। চসিকের স্বাস্থ্য বিভাগের জরিপে নগরীতে ১৫৫টি স্থানকে এডিস মশার সম্ভাব্য প্রজননক্ষেত্র বা হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব স্থানের মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, নির্মাণাধীন ও পরিত্যক্ত ভবন এবং আবাসিক এলাকা।
চসিকের মশক নিয়ন্ত্রণ পরিদর্শকদের তৈরি তালিকায় পাঁচলাইশ আবাসিক এলাকার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বাসভবন ‘নিরিবিলি’র আঙিনার নামও রয়েছে। সেখানে এডিস মশার প্রজননস্থল পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে চসিক। এ ছাড়া চট্টগ্রাম কলেজ, হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজ, কাপাসগোলা সিটি করপোরেশন মহিলা কলেজ, কাতালগঞ্জের পরিত্যক্ত ভবন, এগারো ডাইমের বিল্ডিং, টুপিওয়ালা পাড়া, মীর নাসির গলি, মুন্সিপুকুর পাড় ও চকবাজার কাঁচাবাজারসহ বিভিন্ন স্থানকে সম্ভাব্য প্রজননস্থল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
চসিকের ম্যালেরিয়া ও মশক নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা মো. সরফুল ইসলাম মাহি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের দফতরের কীটতত্ত্ববিদদের জরিপ অনুযায়ী নগরীর আটটি ওয়ার্ডকে ডেঙ্গুর হটস্পট হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। এর পাশাপাশি নগরীর ১৫৫টি সম্ভাব্য প্রজননক্ষেত্র চিহ্নিত করে সেখানে কীটনাশক প্রয়োগ ও প্রজননস্থল ধ্বংস করা হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর বাসস্থান চিহ্নিত করে ওই বাড়ির আঙিনা ও আশপাশের ৫০০ মিটার এলাকায় কীটনাশক প্রয়োগ করা হচ্ছে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে চসিকের ক্র্যাশ প্রোগ্রামও চলছে।’
মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করতে হবে
চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ সাজেদুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ডেঙ্গু মশাবাহিত রোগ। এই রোগ থেকে বাঁচতে হলে মশা নিধনের পাশাপাশি এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করতে হবে। মশা নিধনের দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের। এ বিষয়ে স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে সিটি করপোরেশনকে চিঠি দিয়ে মশক নিধন কার্যক্রম জোরদারের অনুরোধ করা হয়েছে।’
চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. সেখ ফজলে রাব্বি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ডেঙ্গু রোগীদের জন্য চট্টগ্রামের সব সরকারি হাসপাতালে শয্যা রয়েছে। মজুত রয়েছে প্রয়োজনীয় ওষুধসহ চিকিৎসাসামগ্রী।’
তিনি জানান, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে জমে থাকা পানি অপসারণ, এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং বাড়ির আশপাশে পানি জমতে না দেওয়ার বিষয়ে সবাইকে সচেতন হতে হবে। একই সঙ্গে জ্বরসহ ডেঙ্গুর উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও সচিব আশরাফুল আমিন বলেন, ‘ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে চসিক বিটিআই নামের আমেরিকান প্রযুক্তিতে তৈরি ওষুধ ব্যবহার করছে। এর ফলে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় চলতি বছর সিটি করপোরেশন এলাকায় ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘নগরীর আটটি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করা হয়েছে। এগুলো হলো ২, ৩, ১৭, ১৮, ১৯, ৩২, ৩৪ ও ৩৯ নম্বর ওয়ার্ড। এসব এলাকায় বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। কার্যক্রম আরও কার্যকর করতে শতাধিক কর্মীকে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অতিরিক্ত জনবল দিয়ে কাজ করার পাশাপাশি নগরীর অন্যান্য এলাকায় নিয়মিত মশক নিধন কার্যক্রমও অব্যাহত থাকবে।’
নাগরিকদেরও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান
ডেঙ্গুতে মৃত্যুর ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করে চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘কোনও মৃত্যুই কাম্য নয়। আমরা চাই আগামী দিনগুলোতে ডেঙ্গুতে আর একজন মানুষও যেন প্রাণ না হারান। এজন্য সিটি করপোরেশনের কার্যক্রমের পাশাপাশি নগরবাসীকেও স্বাস্থ্য সচেতন হতে হবে এবং নিজ নিজ অবস্থান থেকে ডেঙ্গু প্রতিরোধে ভূমিকা রাখতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘ডেঙ্গু প্রতিরোধে সিটি করপোরেশনের মশক নিধন কার্যক্রমের পাশাপাশি নাগরিকদেরও সচেতন ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। আমরা সবাই মিলে যদি নিজেদের বাসাবাড়ি ও আশপাশ পরিষ্কার রাখি এবং কোথাও পানি জমতে না দিই, তাহলে ডেঙ্গুর প্রকোপ অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।’
চসিকের চলমান মশক নিধন কার্যক্রমের কথা উল্লেখ করে মেয়র বলেন, ‘এডিস মশার লার্ভা ধ্বংসে বিটিআই পদ্ধতিতে ওষুধ প্রয়োগের পাশাপাশি পূর্ণাঙ্গ মশা নিধনে ফগার মেশিনের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। নগরীর ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে সেখানে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে মশক নিধন ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।’
বিশেষ করে কোতোয়ালি, ডবলমুরিং, পাহাড়তলী, হালিশহর ও বন্দরসহ কয়েকটি এলাকা ডেঙ্গুর জন্য তুলনামূলক ঝুঁকিপূর্ণ উল্লেখ করে মেয়র বলেন, ‘এসব এলাকায় বিশেষ নজরদারি ও মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। চসিকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কোথাও ঠিকমতো ওষুধ ছিটাচ্ছেন না বা কোনও ধরনের গাফিলতি করছেন—এমন অভিযোগ থাকলে নাগরিকরা তা আমাদের জানাবেন। “আমাদের চট্টগ্রাম” অ্যাপের মাধ্যমে সরাসরি অভিযোগ করা যাবে। অভিযোগ পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট এলাকায় দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’









