প্রায় ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে রায়পুর-লক্ষ্মীপুর মহাসড়কের ক্ষতিগ্রস্ত অংশের সংস্কারকাজ চলছে। তবে পাথরের পরিবর্তে বিভিন্ন স্থানে ইটের সলিং ও ইটের টুকরো ব্যবহার করা হয়েছে। শুধুমাত্র ইট ও বালু দিয়ে এমন গুরুত্বপূর্ণ একটি সংস্কার করায় কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় লোকজন। সড়ক সংস্কারে নির্ধারিত কারিগরি স্পেসিফিকেশন ও নির্মাণমান অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে স্থানীয়দের।
একই সঙ্গে কাজের মান যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের তদারকি নিয়েও রয়েছে স্থানীয়দের সংশয়। এ ছাড়া দ্রুতগতির যানবাহনের চাপে ইটের টুকরো ছিটকে পথচারী ও ছোট যানবাহনের ওপর পড়ায় দুর্ঘটনার আশঙ্কাও রয়েছে। ইটের টুকরো ভেঙে সৃষ্টি হওয়া ধুলাবালুতে একাকার হয়ে যাচ্ছে পুরো মহাসড়ক।
সরেজমিনে দেখা গেছে, প্রায় ১০ বছর ধরে রায়পুর উপজেলা অংশের মহাসড়কটি অসংখ্য খানাখন্দে ভরে আছে। মহাসড়কের কোথাও কোথাও পিচ-পাথর টিলার মতো উঁচু হয়ে আছে, আবার কোথাও সৃষ্টি হয়েছে ছোট-বড় অসংখ্য গর্ত। দেখে বোঝার উপায় নেই, এটি পশ্চিমাঞ্চল, লক্ষ্মীপুর, ঢাকা, বরিশাল ও চাঁদপুরের সঙ্গে যোগাযোগের ব্যস্ততম রায়পুর-লক্ষ্মীপুর মহাসড়ক। দীর্ঘদিন ধরে সড়কটির বেহাল দশায় চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন যাত্রীরা।
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) সকালে রায়পুরের চাঁদপুর বর্ডার বাজার থেকে সদর উপজেলার দালাল বাজার সীমান্ত পর্যন্ত প্রায় ১৮ কিলোমিটার মহাসড়ক ঘুরে দেখা গেছে, বিভিন্ন স্থানে ছোট-বড় অসংখ্য গর্ত। বিশেষ করে ব্যস্ততম মাইলের মাথা, রাখালিয়া, পাটোয়ারী রাস্তার মাথা, বাসাবাড়ী বাজার, সিকদার রাস্তার মাথা, রুস্তম আলী ডিগ্রি কলেজ গেট, মহিলা কলেজ গেট, সরকারি হাসপাতাল, লেংড়া বাজার ও বাসস্ট্যান্ড এলাকার অবস্থা সবচেয়ে বেহাল। এসব বাসস্ট্যান্ড এলাকায় সড়কের মাঝখানে ছোট-বড় অসংখ্য গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। ফলে চরম ঝুঁকি নিয়ে যানবাহন চলাচল করছে।
স্থানীয় লোকজন ও চালকদের ভাষ্যমতে, মহাসড়কের বেহাল দশার কারণে প্রায় প্রতিদিনই ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটছে। বিপর্যস্ত মহাসড়কের গর্ত ইট দিয়ে ভরাট করছে সড়ক ও জনপথ বিভাগ। এমনকি মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে ইটের সলিং করে নামমাত্র সংস্কার করা হয়েছে, যা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে আলোচনা-সমালোচনা চলছে।
স্থানীয় যানবাহন চালকদের অভিযোগ, সড়কের গর্ত ইটের টুকরো দিয়ে সাময়িকভাবে ভরাট করা হলে যানবাহনের চাপে সেগুলো দ্রুত সরে যায়। এতে অল্প সময়ের মধ্যেই একই স্থানে আবার গর্ত তৈরি হয়। দ্রুতগতির যানবাহনের চাপে এসব ইটের টুকরো ছিটকে পথচারী কিংবা ছোট যানবাহনের ওপর পড়ায় দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকে। এসব ইটের টুকরো ও কংকর ভেঙে সৃষ্টি হওয়া ধুলাবালুতে একাকার হয়ে যাচ্ছে মহাসড়ক।
এতে ছোট যানবাহনের চালক, পথচারী ও মহাসড়কের পাশের ব্যবসায়ীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। ধুলাবালুর কারণে বিভিন্ন রোগের আশঙ্কাও করছেন স্থানীয় লোকজন। একদিকে সড়ক সংস্কারে সরকারি অর্থ ব্যয়ের পুনরাবৃত্তি হচ্ছে, অন্যদিকে জনদুর্ভোগ ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়েই চলছে বলে তাদের অভিযোগ।
স্থানীয় লোকজন জানান, মহাসড়কটি মেরামতের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কাজের নির্ধারিত কারিগরি স্পেসিফিকেশন ও নির্মাণমান যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। পাশাপাশি মেরামতকাজে ব্যবহৃত উপকরণ, পদ্ধতি ও গুণগত মান যাচাইয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলীদের তদারকি কতটা কার্যকর, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে অন্তত চার জন চালক জানান, সড়কের গর্তে সাময়িকভাবে ইটের খোয়া বা অন্যান্য উপকরণ ব্যবহার করা হয়ে থাকলে সেটি কোন ধরনের মেরামত পদ্ধতির আওতায় করা হচ্ছে, তা জনসমক্ষে স্পষ্ট করা উচিত। কারণ সাময়িক রক্ষণাবেক্ষণ ও স্থায়ী সংস্কারের পদ্ধতি এক নয়। কাজের ধরন অনুযায়ী নির্ধারিত উপকরণ ও কারিগরি পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন।
স্থানীয় বর্ডার বাজারের ব্যবসায়ী ও সচেতন মহলের দাবি, সাময়িক জোড়াতালি দিয়ে সড়ক মেরামতের পরিবর্তে নির্ধারিত কারিগরি মান বজায় রেখে টেকসই সংস্কার নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি কাজের মান পরীক্ষা করে কোনো অনিয়ম পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
মহাসড়কে নিয়মিত যাতায়াত করা দূরপাল্লার একাধিক যানবাহনের চালক জানান, সদর উপজেলার উত্তর তেমুহনী এলাকা থেকে রায়পুর অংশের কোথাও খানাখন্দ, আবার কোথাও ঢেউয়ের মতো উঁচু-নিচু। ফলে উঁচু-নিচু এই মহাসড়ক পার হতে মালবাহী ও যাত্রীবাহী পরিবহনের চাকা গর্তে পড়ে ইঞ্জিন, টায়ার ও টিউব ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পাশাপাশি যাত্রীদেরও চরম ভোগান্তি হচ্ছে।
এ ব্যাপারে রায়পুর ও রামগঞ্জ সড়ক ও জনপথ বিভাগের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. আরিফ হোসেন বলেন, ‘বিভিন্ন কারণে সড়কের বড় বড় গর্ত হয়েছে। যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক রাখতে তাৎক্ষণিকভাবে এসব গর্তে ইট-বালুর সঙ্গে পাথরও ফেলে মেরামত করা হচ্ছে। ইট দিয়ে সংস্কারের প্রক্রিয়াটি প্রাথমিক কাজ। প্রায় ১২ কোটি টাকায় স্থায়ীভাবে ইট-পাথর ও বিটুমিন ব্যবহার করে মহাসড়ক সংস্কারের কাজ হচ্ছে। সড়কে পানি ছিটাতে ঠিকাদারকে বলা হয়েছে। এই মহাসড়ক সংস্কারের কাজ ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ হবে।’