পদত্যাগ কিংবা ভবিষ্যতে ক্যাম্পাসে না ফেরার শর্তে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে বের হতে দেওয়া হয়েছে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত এমন খবরকে অসত্য ও ভিত্তিহীন দাবি করেছেন তিনি। উপাচার্য জানিয়েছেন, তিনি এ ধরনের কোনও মুচলেকা দেননি। সুস্থ হয়ে আবারও বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব পালন করবেন।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) সকালে গণমাধ্যমে পাঠানো এক প্রতিবাদলিপিতে এসব কথা বলেন উপাচার্য।
প্রতিবাদলিপিতে শেখ শরীফুল আলম বলেন, গত মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) প্রায় ৩০ ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকার পর চুয়েটের প্রশাসনিক ভবনে নিজ কার্যালয় থেকে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের উপস্থিতিতে তাকে ক্যাম্পাসের বাইরে নেওয়া হয়। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে কয়েকটি গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে, তিনি আর কখনও ক্যাম্পাসে ফিরবেন না এমন শর্তে শিক্ষার্থীরা তাকে বের হতে দিয়েছেন। কোনও কোনও প্রতিবেদনে তার পদত্যাগের কথাও বলা হয়েছে। অথচ তিনি এ ধরনের কোনো বক্তব্য বা বিবৃতি দেননি। তার বক্তব্য না নিয়েই এমন তথ্য প্রকাশ করা দুঃখজনক ও অনভিপ্রেত।
উপাচার্য বলেন, অসুস্থতার কারণেই তাকে ক্যাম্পাস থেকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। গত সোমবার দুপুর ১২টা থেকে বিদ্যুৎবিহীন অবস্থায় অবরুদ্ধ থাকায় তিনি শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। একই সময়ে সেখানে অবস্থানরত আরও কয়েকজনের স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটে। প্রায় ১১ জন অসুস্থ হয়ে পড়েন। এর আগে সোমবার রাতে দুই অ্যালামনাই সদস্য অসুস্থ হলে তাদের একজনকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়। পরে সরকারি চিকিৎসক ও সিভিল সার্জনের পরামর্শে তাকেও হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়।
নিজের বক্তব্য তুলে ধরে শেখ শরীফুল আলম বলেন, বিভিন্ন গণমাধ্যমে মিথ্যা সংবাদ প্রচার করা হচ্ছে যে আমি পদত্যাগ করেছি এবং ভবিষ্যতে কখনও চুয়েট ক্যাম্পাসে পদার্পণ করবো না। এ ধরনের কোনও বক্তব্য বা বিবৃতি আমি দিইনি। যখন আমাকে নিয়ে আসা হচ্ছিল, তখন আমি কথা বলার মতো অবস্থাতেই ছিলাম না। অসুস্থতার কারণেই আমি ক্যাম্পাস ছেড়ে ছিলাম। এখনো আমি অসুস্থ এবং চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে আছি। সুস্থ হয়ে আমি আবারও বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব পালন করব, ইনশা আল্লাহ।
নিজের শারীরিক অবস্থাকে উপেক্ষা করে তার নামে পদত্যাগ ও ভবিষ্যতে ক্যাম্পাসে না ফেরার সিদ্ধান্ত প্রচারকে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার পরিপন্থী বলে উল্লেখ করেন উপাচার্য। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য না নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করলে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তার ভাষ্য, কোনও ঘটনা নিয়ে সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্য যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মতামত নেওয়া জরুরি।
প্রতিবাদলিপিতে উপাচার্য আরও বলেন, রাষ্ট্র তাকে যে দায়িত্ব দিয়েছে, তা পালন করতেই তিনি চট্টগ্রামে এসেছেন। ব্যক্তিগত স্বার্থ, বিশেষ কোনও এজেন্ডা কিংবা দলীয় বা স্বার্থসংশ্লিষ্ট উদ্দেশ নিয়ে তিনি এখানে আসেননি। বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব পালন ও প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম সচল রাখা তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, কোনও স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর প্ররোচনায় যেন তাদের শিক্ষাজীবন ও একাডেমিক কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। শিক্ষাজীবন দীর্ঘায়িত না করে দ্রুত শ্রেণিকক্ষে ফিরে আসার আহ্বান জানান তিনি। নিজেও এই ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থী ছিলেন উল্লেখ করে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের অ্যালামনাইয়ের ছোট ভাই-বোন হিসেবে বিবেচনা করেন বলে জানান উপাচার্য।
এর আগে গত সোমবার (১২ অক্টোবর) সকাল ৮টা ৪৫ মিনিটের দিকে চুয়েট ক্যাম্পাসে যান উপাচার্য শেখ শরীফুল আলম। প্রশাসনিক ভবনের সামনের দরজার তালা ভেঙে তিনি ভেতরে প্রবেশ করেন। পরে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা তাকে ভেতরে রেখেই প্রশাসনিক ভবনের মূল ফটকে তালা ঝুলিয়ে দেন। এরপর ভবনের পানি ও বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়।
গত ২১ সেপ্টেম্বর খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে চুয়েটের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এর আগে অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে অপসারণের প্রতিবাদ ও তাকে পুনর্বহালের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। ২২ সেপ্টেম্বর থেকে তারা সর্বাত্মক ‘শাটডাউন’ কর্মসূচি পালন করছেন। একই দাবিতে কর্মবিরতি পালন করছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরাও। এতে প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণি কার্যক্রম, পরীক্ষা ও অন্যান্য একাডেমিক কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।
এদিকে চুয়েটের শিক্ষকদের কর্মবিরতি ও ‘সর্বাত্মক অসহযোগ’ কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে বলে শিক্ষক সমিতির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। বুধবার (১৪ অক্টোবর) দুপুর ১২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে শিক্ষক সমিতির সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হয়।
সভা শেষে চুয়েট শিক্ষক সমিতির যুগ্ম সম্পাদক সামিউন বাসির বলেন, তালা ভেঙে উপাচার্য ভবনে প্রবেশের ঘটনায় আমরা উদ্বিগ্ন। ভবনের ভেতরে গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র রয়েছে। সেগুলো চুরি হয়েছে কি না এবং কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। অধ্যাপক সায়েমকে উপাচার্য পদে পুনর্বহালের দাবিতে আমরা অটল রয়েছি। আমরা কর্মবিরতি ও অসহযোগ চালিয়ে যাবো।
শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, উপাচার্য পদে অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহালের দাবিতে তাদের ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের একজন ও বিশ্ববিদ্যালয়ের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক কৌশল বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মো. জাহাঙ্গীর আলম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা অধ্যাপক সায়েম স্যারকে উপাচার্য পদে পুনর্বহালের দাবিতে আন্দোলন করে আসছি। এই আন্দোলন চালিয়ে যাবো। আর সায়েম স্যারকে পুনর্বহালের দাবিতে শাটডাউন কর্মসূচি চলমান থাকবে।