টুপটুপ রিসোর্টে আগুনের সূত্রপাত নিয়ে তদন্তে উঠে এলো যেসব তথ্য

কক্সবাজার প্রতিনিধি
২৩ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৩৩ আপডেট : ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৩৩

কক্সবাজারের উখিয়ায় টুপটুপ রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় প্রাথমিকভাবে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিটকে দায়ী করা হচ্ছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ধারণা, রিসোর্টের নিচতলার একটি ফ্রিজ থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। পরে রান্নাঘরের গ্যাস সিলিন্ডারে বিস্ফোরণ ঘটলে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। গুদামে দাহ্য রাসায়নিক পদার্থ থাকার বিষয়টিও আগুনের তীব্রতা বাড়িয়ে থাকতে পারে। তবে আগুন লাগার প্রকৃত কারণ এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

গত ১৭ অক্টোবর সকালে উখিয়ার পাটুয়ারটেক সৈকতসংলগ্ন মেরিন ড্রাইভের পাশে অবস্থিত তিনতলা রিসোর্টটিতে আগুন লাগে। এ ঘটনায় ১০ পর্যটকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। রিসোর্টটির ওপরের দুই তলায় অতিথিদের থাকার ব্যবস্থা ছিল। নিচতলায় ছিল রেস্তোরাঁ ও কর্মীদের থাকার জায়গা।

উখিয়া থানার ওসি আতিকুর রহমানের ভাষ্য অনুযায়ী, গ্রেফতার হওয়া রিসোর্টের সহকারী ব্যবস্থাপককে জিজ্ঞাসাবাদ এবং প্রাথমিক অনুসন্ধানে ফ্রিজের শর্টসার্কিট থেকে আগুন লাগার তথ্য পাওয়া গেছে। পরে রান্নাঘরের গ্যাস সিলিন্ডারে বিস্ফোরণ ঘটে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ওসি জানান, রিসোর্টের গুদামে দাহ্য রাসায়নিক পদার্থ ছিল বলে তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে। পাশাপাশি বাতাসের তীব্রতা ও কাঠের তৈরি অবকাঠামোর কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। তবে গুদামে ঠিক কী ধরনের রাসায়নিক পদার্থ রাখা হয়েছিল, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানা যায়নি।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক রিমন ঘোষ জানিয়েছেন, অগ্নিকাণ্ডের কারণ সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। প্রকৃত ঘটনা নিশ্চিত করতে আরও তদন্ত প্রয়োজন।

জেলা প্রশাসনের গঠিত তদন্ত কমিটিও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। কমিটির এক সদস্যের মতে, বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুন লাগা এবং পরে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের বিষয়টি প্রাথমিকভাবে সামনে এসেছে। তদন্ত শেষে বিস্তারিত প্রতিবেদন দেওয়া হবে।

অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় করা মামলার প্রধান আসামি রিসোর্টের মালিক তানভীর সুলতান মিয়া এখনও পলাতক। তদন্তসংশ্লিষ্ট পুলিশের এক কর্মকর্তার দাবি, তিনি বর্তমানে ইন্দোনেশিয়ায় অবস্থান করছেন। রিসোর্টের আরেক মালিক নেওয়াজ মোরশেদও আত্মগোপনে রয়েছেন বলে জানা গেছে।

এ ঘটনায় রিসোর্টের সহকারী ব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের রিমান্ড চাওয়া হয়েছে। তবে রিমান্ড আবেদনের শুনানি এখনও হয়নি।

জানা গেছে, প্রায় ২০ শতক জমির ওপর নির্মিত রিসোর্টটির বিভিন্ন অংশে কাঠের ব্যবহার ছিল। কক্ষের মেঝে, দেয়াল ও সিঁড়ির বড় অংশ কাঠ দিয়ে তৈরি হওয়ায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা ছিল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। অগ্নিকাণ্ডে রিসোর্টটির কাঠের বিভিন্ন অংশ পুড়ে যায়। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালিত হচ্ছিল। 

জালিয়াপালং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এস এম ছৈয়দ আলম জানান, নিয়ম অনুযায়ী নির্ধারিত ফি নিয়ে টুপটুপ রিসোর্টের নামে ট্রেড লাইসেন্স দেওয়া হয়েছিল।

তবে তার ভাষ্য অনুযায়ী, অগ্নিকাণ্ডের পর জানা যায়, প্রতিষ্ঠানটির ফায়ার সার্ভিস, পরিবেশ অধিদফতর ও কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছিল না। এ বিষয়টি রিসোর্টটির নিরাপত্তাব্যবস্থা ও পরিচালনার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।

এদিকে অগ্নিকাণ্ডের সময় রিসোর্টে ঠিক কতজন পর্যটক ছিলেন, তা নিয়ে স্বজনদের বক্তব্য ও পুলিশের হিসাবের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।

স্বজনদের দাবি, ১৬ অক্টোবর রাতে রিসোর্টে নারী ও শিশুসহ ২১ জন পর্যটক ছিলেন। পরদিন সকালে দুজন সৈকতে যাওয়ায় আগুন লাগার সময় সেখানে ১৯ জন অবস্থান করছিলেন। তাদের হিসাবে, ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, ছয়জন আহত হয়েছেন এবং দুজন লাফ দিয়ে প্রাণে বেঁচেছেন। এ হিসাব অনুযায়ী, আরও একজনের সন্ধান পাওয়া যায়নি বলে দাবি করেছেন তারা।

অন্যদিকে, উখিয়া থানার ওসি আতিকুর রহমান জানান, পুলিশের প্রাথমিক অনুসন্ধান অনুযায়ী, আগুন লাগার সময় আটটি কক্ষে ১৯ জন অতিথি ছিলেন। তাদের মধ্যে ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, সাতজন আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন এবং দুজন লাফ দিয়ে রক্ষা পেয়েছেন। এই ১৯ জনের বাইরে আর কেউ নিখোঁজ রয়েছেন, এমন তথ্য তদন্তে পাওয়া যায়নি বলে দাবি করেন তিনি।

জেলা প্রশাসনের তদন্ত কমিটির প্রধান ও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাসনীম জাহান জানান, মরদেহ উদ্ধারের পর আরও একজন নিখোঁজ থাকার বিষয়টি সামনে এসেছিল। পরে ফায়ার সার্ভিস পুনরায় তল্লাশি চালালেও আর কোনো মরদেহ পাওয়া যায়নি। নিখোঁজের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে ক্ষোভ

ঘটনার পর রিসোর্টটি দেখতে আসা পর্যটক ও স্থানীয়দের মধ্যে নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা চলছে। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও দর্শনার্থীদের কেউ কেউ মনে করছেন, পর্যটন এলাকায় আবাসিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অগ্নিনিরাপত্তা ও প্রয়োজনীয় অনুমোদন নিশ্চিত করা জরুরি।

ঢাকার এক ব্যবসায়ী তোফায়েল আহমদ বলেন, অগ্নিকাণ্ডের ভিডিও দেখে তিনি মর্মাহত হয়েছিলেন। ভবিষ্যতে এমন প্রাণহানি ঠেকাতে নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন।

চট্টগ্রামের রাউজানের ব্যবসায়ী গফুর উদ্দিনও পর্যটন এলাকায় গড়ে ওঠা রিসোর্ট ও কটেজগুলোর নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাঁর মতে, পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে বিভিন্ন প্রচার চালানো হলেও দুর্ঘটনার পর দায়দায়িত্ব নির্ধারণের বিষয়টি সামনে আসে।

টুপটুপ রিসোর্টের অগ্নিকাণ্ডে ১০ পর্যটকের মৃত্যু স্থানীয় পর্যটন খাতের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। আগুনের প্রকৃত কারণ, রিসোর্টটির অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং নিখোঁজ থাকার অভিযোগের বিষয়ে তদন্তের চূড়ান্ত ফলের অপেক্ষায় রয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

/আরএইচ/
সম্পর্কিত
বরিশালে ইয়াবাসহ সাবেক সেনাসদস্য ও তার স্ত্রী গ্রেফতার
৩১ দিনেই তদন্ত শেষ, অপ্রতিম হত্যায় চার আসামির মধ্যে দুইজন কিশোর
জুলাই আন্দোলনে আহত দাবি করে মামলা, তদন্তে উঠে এলো সড়ক দুর্ঘটনার তথ্য
সর্বশেষ খবর
‘বেহেশতের কথা বলে ভোট নিয়ে এখন সস্তা রাজনীতি বন্ধ করুন’
‘বেহেশতের কথা বলে ভোট নিয়ে এখন সস্তা রাজনীতি বন্ধ করুন’
এশিয়ান চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি খেলতে ভারতে বাংলাদেশ দল
এশিয়ান চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি খেলতে ভারতে বাংলাদেশ দল
মঈন খানকে দেখতে হাসপাতালে রাষ্ট্রপতি
মঈন খানকে দেখতে হাসপাতালে রাষ্ট্রপতি
লাউ বিক্রি হচ্ছে ১ টাকায় ৪টি, দাম না পেয়ে বাগান কাটছেন চাষিরা
লাউ বিক্রি হচ্ছে ১ টাকায় ৪টি, দাম না পেয়ে বাগান কাটছেন চাষিরা
সর্বাধিক পঠিত
এবার ময়ূখের কণ্ঠে উল্টো সুর, প্রশংসায় ভাসালেন বাংলাদেশকে
এবার ময়ূখের কণ্ঠে উল্টো সুর, প্রশংসায় ভাসালেন বাংলাদেশকে
এইচএসসির ফল প্রকাশের সম্ভাব্য তারিখ জানা গেলো
এইচএসসির ফল প্রকাশের সম্ভাব্য তারিখ জানা গেলো
থাইল্যান্ডে ‘সয়েল ফিভারে’ ৪৫ জনের মৃত্যু, আক্রান্ত ৫৭০
থাইল্যান্ডে ‘সয়েল ফিভারে’ ৪৫ জনের মৃত্যু, আক্রান্ত ৫৭০
‘একটা স্নাইপারের অভাব ছিল’ মন্তব্যকারী যুবকের বাবাও ডিবি হেফাজতে
‘একটা স্নাইপারের অভাব ছিল’ মন্তব্যকারী যুবকের বাবাও ডিবি হেফাজতে
থানায় গিয়ে নিরাপত্তা চাইলেন রুমিন ফারহানা, ওসি বললেন ‘মব সৃষ্টির কথা’
থানায় গিয়ে নিরাপত্তা চাইলেন রুমিন ফারহানা, ওসি বললেন ‘মব সৃষ্টির কথা’