চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন ছিল ছেলের। সেই স্বপ্ন পূরণে ভারতের জম্মু-কাশ্মীর থেকে ছেলেকে নিয়ে বাংলাদেশে এসেছিলেন মা নিঘাত বেগম। উদ্দেশ্য ছিল, সন্তানের পড়াশোনা শেষ করা এবং একদিন চিকিৎসক হিসেবে মানুষের সেবা করার স্বপ্ন পূরণ করা। কিন্তু সেই স্বপ্নের করুণ পরিণতি হলো ছেলের রহস্যজনক মৃত্যুতে। মায়ের চোখের সামনেই থেমে গেল আদনান আলতাফের জীবনের পথচলা।
বুধবার (৪ নভেম্বর) সকালে কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার কাবিলায় অবস্থিত ইস্টার্ন মেডিকেল কলেজের পাশের একটি পুকুর থেকে আদনানের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। কলেজ ক্যাম্পাস থেকে প্রায় ৫০০ গজ দূরে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কসংলগ্ন ওই পুকুরে তার মরদেহ ভাসছিল। গত সোমবার (২ নভেম্বর) রাত থেকে নিখোঁজ ছিলেন তিনি।
আদনান ভারতের জম্মু-কাশ্মীরের বারামুল্লা জেলার সুপুর এলাকার বুনপাড়া, দাঙ্গালপাড়ার বাসিন্দা আলতাফ হোসাইন রাথারের ছেলে। তিনি ইস্টার্ন মেডিকেল কলেজের পঞ্চম বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন।
কলেজ সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে পড়াশোনায় অনিয়মিত ছিলেন আদনান। শারীরিক অসুস্থতার কারণে নিয়মিত ক্লাস ও পড়াশোনা করতে না পারায় শিক্ষাজীবনে পিছিয়ে পড়েন তিনি। বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন পরিবারের সদস্যরা। তাকে চিকিৎসা ও কাউন্সেলিংয়ের জন্য দেশে নিয়ে যাওয়া হয়।
সুস্থ হয়ে আবার পড়াশোনা শুরু এবং পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার প্রত্যাশায় পরিবারের উদ্যোগে তাকে ফের বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয়। গত ৩০ অক্টোবর পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার উদ্দেশ্যে মাকে সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশে আসেন আদনান। সন্তানের পড়াশোনায় যাতে আর কোনও বাধা না আসে, সে জন্য তার সঙ্গে বাংলাদেশে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন মা নিঘাত বেগম।
গত ২ নভেম্বর রাতে কলেজের হোস্টেল থেকে বের হন আদনান। এরপর তার আর কোনও হদিস পাওয়া যাচ্ছিল না। কোথায় গেছেন কিংবা তার সঙ্গে কী ঘটেছে, তা জানতে না পেরে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন মা।
পরদিন ৩ নভেম্বর কলেজ কর্তৃপক্ষ ও আদনানের মা বুড়িচং থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। নিখোঁজ শিক্ষার্থীর সন্ধানে পুলিশ বিভিন্ন স্থানের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ পর্যালোচনা করে অনুসন্ধান শুরু করে। একদিকে পুলিশের তৎপরতা চলছিল, অন্যদিকে সন্তানের ফিরে আসার অপেক্ষায় ছিলেন মা।
তবে সেই অপেক্ষার অবসান হয় বুধবার সকালে। স্থানীয় লোকজন পুকুরে একটি মরদেহ ভাসতে দেখে পুলিশকে খবর দেন। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে। কলেজ কর্তৃপক্ষ ও আদনানের মা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে মরদেহটি তার বলে শনাক্ত করেন।
বুড়িচং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) লুৎফুর রহমান জানান, স্থানীয় লোকজনের কাছ থেকে খবর পেয়ে পুলিশ পুকুর থেকে মরদেহ উদ্ধার করে। পরে ময়নাতদন্তের জন্য কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ ইস্টার্ন মেডিকেল কলেজে নেওয়া হয়। প্রাথমিকভাবে মরদেহে কোনও আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি।
তিনি আরও জানান, মরদেহ ঢাকায় মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হিমাগারে রাখা হবে। সেখানে স্বজনদের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করা হবে। পরবর্তী আইনগত প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ ভারতে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। তবে আদনানের মৃত্যুর কারণ এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এটি দুর্ঘটনা, আত্মহত্যা নাকি অন্য কোনও কারণে হয়েছে, তা তদন্ত ও ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর জানা যাবে।
ইস্টার্ন মেডিকেল কলেজের বিদেশি শিক্ষার্থীদের সমন্বয়ক শিক্ষক রাজীব আশ্রাফ বলেন, আদনান কলেজের ফাইনাল বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। তবে অনিয়মিত হওয়ায় পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়েছিলেন। অসুস্থতার কারণে নিয়মিত লেখাপড়া করতে পারেননি। পরে তিনি দেশে চলে যান। বাড়িতে চিকিৎসা শেষে আবার পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার জন্য মাকে সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশে আসেন।
কলেজের চেয়ারম্যান শাহ মো. সেলিম বলেন, আদনান মানসিকভাবে কিছুটা বিপর্যস্ত ছিলেন। নিয়মিত ক্লাস করতেন না। বিষয়টি তার অভিভাবকদের জানানো হলে তারা তাকে দেশে নিয়ে কাউন্সেলিং করান।
তিনি বলেন, শিক্ষার্থীর মানসিক অবস্থার কথা বিবেচনা করে তার মাকেও সঙ্গে রাখা হয়েছিল। ঘটনার দিন রাতে মাকে খাবার দিতে বলে নিজের কক্ষ থেকে বের হন। ধারণা করা হচ্ছে, কোনও একসময় পুকুরপাড়ে গিয়ে বসেছিলেন। হয়তো পানিতে পড়ে যাওয়ার পর আর উঠতে পারেননি। তবে প্রকৃত ঘটনা ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর জানা যেতে পারে।
আদনানের মৃত্যুর ঘটনায় ইস্টার্ন মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী ও স্থানীয়দের মধ্যে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। একজন বিদেশি শিক্ষার্থীর এমন মৃত্যু নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। তার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে তদন্ত ও ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনের অপেক্ষায় রয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
‘বড় দায়িত্ব থেকে মুক্ত হলাম’, রাকসু ছেড়ে কোথায় যাচ্ছেন আম্মার
মেজর আখতারুজ্জামানের ছেলেকে নিজ এলাকায় ছুরিকাঘাত