দাফনে বাধা, তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের জন্য কিনে দেওয়া হলো জমি

নাটোর প্রতিনিধি
০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১০:২৪ আপডেট : ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১০:২৪

মৃত্যুর পরও শেষ ঠিকানা নিয়ে অনিশ্চয়তায় থাকতে হতো গুরুদাসপুরের তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের। সামাজিক কবরস্থানে তাদের দাফনে আপত্তি জানাতেন স্থানীয়রা। বাধ্য হয়ে কারও মরদেহ দাফন করতে হয়েছে বাড়ির আঙিনায়। তবে সেই পরিস্থিতির অবসান ঘটতে যাচ্ছে। নাটোরের গুরুদাসপুরে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের জন্য কেনা হয়েছে চার শতাংশ জমি। এখন থেকে নিজস্ব কবরস্থানেই সমাহিত হতে পারবেন এ সম্প্রদায়ের সদস্যরা।

তিন বছর আগে শীতকালে মারা যান তৃতীয় লিঙ্গের সদস্য ছোহা (৩০)। স্থানীয় কবরস্থানে তার মরদেহ দাফনের অনুমতি না পাওয়ায় পরিবারের সদস্যরা বাড়ির আঙিনায় কবর খুঁড়ে তাকে সমাহিত করেন। একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছিল গুরুদাসপুরের হিজড়া সম্প্রদায়ের গুরুমাতা নদী সরকারের বাবাকেও। তাকেও স্থানীয় কবরস্থানে দাফন করতে দেওয়া হয়নি।

এসব অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে আক্ষেপ প্রকাশ করেন নদী সরকার। তিনি গুরুদাসপুর উপজেলার নাজিরপুর ইউনিয়নের কুমারখালী গ্রামের বাসিন্দা।

তবে এবার নিজেদের সম্প্রদায়ের জন্য স্থায়ী কবরস্থানের ব্যবস্থা হওয়ায় উচ্ছ্বসিত নদী সরকার। তিনি বলেন, এতদিন তাদের মৃত্যুর পর দাফনের নির্দিষ্ট কোনও জায়গা ছিল না। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফাহমিদা আফরোজের উদ্যোগে এখন সেই সংকটের সমাধান হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কুমারখালী গ্রামের ব্যবসায়ী তৌফিক আলীর কাছ থেকে পাঁচ লাখ ১০ হাজার টাকায় চার শতাংশ জমি কেনা হয়েছে। জমি কেনার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। জমির গ্রহীতা হিসেবে হিজড়া সম্প্রদায়ের পক্ষে উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তার নাম উল্লেখ করা হয়েছে। গত ৩১ মার্চ মঙ্গলবার দুপুরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফাহমিদা আফরোজ গুরুমাতা নদী সরকারের হাতে জমির দলিল তুলে দেন। উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে কেনা এ জমি পুরো উপজেলার তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের কবরস্থান হিসেবে ব্যবহৃত হবে।

তৃতীয় লিঙ্গের গুরুদাসপুর উপজেলা কমিটির তথ্য অনুযায়ী, উপজেলায় এ সম্প্রদায়ের ৪৫ জন সদস্য রয়েছেন। তাদের মধ্যে ২১ জনের বসবাস কুমারখালী গ্রামে। অধিকাংশেরই স্থায়ী কর্মসংস্থান ও নির্ভরযোগ্য আবাসন নেই। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজেদের নামে একটি স্থায়ী কবরস্থান পাওয়াকে বড় অর্জন হিসেবে দেখছেন তারা। ইতিমধ্যে জমিটি বুঝে নিয়েছেন তারা। এখন মৃত্যুর পর নিজেদের জমিতেই সমাহিত হওয়ার নিশ্চয়তা পাচ্ছেন।

সম্প্রদায়ের সদস্য নুপুর, সোনালী, সৌখীন, মাধবী, ইতি ও দীপা বলেন, তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ হওয়ায় সমাজে নানা ধরনের কটূক্তি ও বৈষম্যের শিকার হতে হয় তাদের। জন্মগত পরিচয়ের কারণে অনেকেই তাদের স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করেন না। বিভিন্ন প্রয়োজনে তাদের ব্যবহার করা হলেও বিপদে পাশে দাঁড়াতে চান না অনেকে।

তাদের ভাষ্য, জীবিত অবস্থায় নানা প্রতিকূলতার মুখে পড়তে হয়। তবে মৃত্যুর পর দাফন নিয়ে সবচেয়ে বেশি বিড়ম্বনায় পড়তে হয় তাদের। গ্রামের সামাজিক কবরস্থানে হিজড়া সম্প্রদায়ের সদস্যদের দাফনে বাধা দেওয়া হয়। এমনকি নদী সরকারের বাবা আহাদ আলীকেও স্থানীয় কবরস্থানে দাফন করতে দেওয়া হয়নি। বিষয়টি নিয়ে উপজেলা পর্যায়ের এক সভায় নিজেদের জন্য স্থায়ী কবরস্থানের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন নদী সরকার। এরপর শুরু হয় জমি কেনার উদ্যোগ। শেষ পর্যন্ত ইউএনওর সহযোগিতায় সেই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়েছে।

গুরুদাসপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফাহমিদা আফরোজ বলেন, মৃত্যুর পর তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের সামাজিক কবরস্থানে দাফন করতে দেওয়া হয় না বিষয়টি জানার পর তিনি ব্যথিত হয়েছেন। অন্তত মৃত্যুর পর যেন তারা নিজেদের জমিতে সমাহিত হতে পারেন, সেই ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ সম্প্রদায়ের সদস্যদের পুনর্বাসনসহ আরও কিছু পরিকল্পনা রয়েছে তার।

/আরএইচ/
সম্পর্কিত
ছোট ভাইয়ের মারধরে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী বড় ভাইয়ের মৃত্যু
ভাড়া বাসা থেকে ছাত্রলীগ নেতার লাশ উদ্ধার, শ্বাসরোধে হত্যা বলছে পুলিশ
একসঙ্গে ২ জনের লাশ: একজনের কপালে, আরেকজনের থুতনিতে গুলির চিহ্ন
সর্বশেষ খবর
শুধু চিন্তাতেই চলবে কম্পিউটার-স্মার্টফোন, যেভাবে কাজ করে নিউরালিংকের ‘টেলিপ্যাথি’
শুধু চিন্তাতেই চলবে কম্পিউটার-স্মার্টফোন, যেভাবে কাজ করে নিউরালিংকের ‘টেলিপ্যাথি’
দুই দিনব্যাপী সোলার এক্সপোর উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী
দুই দিনব্যাপী সোলার এক্সপোর উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী
গাজীপুরে মহাসড়কে আগুন দিয়ে শ্রমিকদের অবরোধ, যান চলাচল বন্ধ
গাজীপুরে মহাসড়কে আগুন দিয়ে শ্রমিকদের অবরোধ, যান চলাচল বন্ধ
কিশোরদের সহিংস কর্মকাণ্ডের আর নির্দেশনা দেবে না চ্যাটজিপিটি
কিশোরদের সহিংস কর্মকাণ্ডের আর নির্দেশনা দেবে না চ্যাটজিপিটি
সর্বাধিক পঠিত
অনুর্বর জমিতে ৩০ দিনেই ফুটলো জাফরান, লাদাখে কৃষির নতুন সম্ভাবনা
অনুর্বর জমিতে ৩০ দিনেই ফুটলো জাফরান, লাদাখে কৃষির নতুন সম্ভাবনা
হীরার ওপর দাঁড়িয়ে আছে যে শহর
হীরার ওপর দাঁড়িয়ে আছে যে শহর
এক মাসের ব্যবধানে আবারও বাড়লো এলপিজির দাম
এক মাসের ব্যবধানে আবারও বাড়লো এলপিজির দাম
বরিশালে বাস ধর্মঘটে ভোগান্তিতে যাত্রীরা
বরিশালে বাস ধর্মঘটে ভোগান্তিতে যাত্রীরা
‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে জুলাই স্মৃতিস্তম্ভে আগুন, দুই পুলিশ সদস্য ক্লোজড
‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে জুলাই স্মৃতিস্তম্ভে আগুন, দুই পুলিশ সদস্য ক্লোজড