কাগজে-কলমে প্রথম শ্রেণির পৌরসভা। অথচ নাগরিক সেবার চিত্রে তার প্রতিফলন নেই। ভাঙাচোরা সড়ক, অকার্যকর সড়কবাতি, দুর্বল ড্রেনেজ ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা, বিশুদ্ধ পানির সংকট সব মিলিয়ে দুর্ভোগে দিন কাটছে লক্ষ্মীপুরের রায়পুর পৌরবাসীর। শহরের অধিকাংশ সড়ক চলাচলের অনুপযোগী। বৃষ্টি হলেই সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা। ময়লা-আবর্জনা ফেলার নির্দিষ্ট জায়গা নেই। প্রায় ৩২ বছরেও নির্মাণ হয়নি একটি শিশুপার্ক।
অন্যদিকে, নাগরিক সেবার মান না বাড়লেও কয়েক গুণ বেড়েছে হোল্ডিং ট্যাক্স। পৌরসভার প্রায় ৬০ শতাংশ হোল্ডিংয়ে নেই পানির সংযোগ। সড়কবাতির জন্য প্রয়োজন প্রায় দুই হাজার বাতি, অথচ রয়েছে মাত্র ১১০টি সেগুলোও অকেজো বলে অভিযোগ বাসিন্দাদের। উন্নয়ন প্রকল্পে বরাদ্দ এলেও যথাযথ বাস্তবায়ন হচ্ছে না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
পৌরসভার আয়-ব্যয়ের হিসাব নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি, সরকারি অনুদান, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) ও রাজস্ব আদায়সহ বিভিন্ন খাত থেকে গত পাঁচ বছরে পৌরসভার আয় হয়েছে প্রায় ৪০ কোটি টাকা। এরপরও দৃশ্যমান উন্নয়ন না হওয়ায় ক্ষোভ বাড়ছে বাসিন্দাদের মধ্যে। বস্তি উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ প্রায় এক কোটি টাকা অব্যবহৃত থাকায় ফেরত গেছে বলেও জানা গেছে। প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের অভিযোগও রয়েছে।
১৯৯৪ সালের ৫ জানুয়ারি ‘গ’ শ্রেণির পৌরসভা হিসেবে যাত্রা শুরু করে রায়পুর পৌরসভা। ২০০০ সালের ৬ মার্চ ‘খ’ শ্রেণিতে এবং ২০০৪ সালের জুনে ‘ক’ শ্রেণিতে উন্নীত হয় এটি। তবে স্থানীয় সরকার বিভাগের শর্ত অনুযায়ী প্রথম শ্রেণির পৌরসভায় পাকা রাস্তা, বিদ্যুৎ, পানি সরবরাহ, সড়কবাতি, নালা-নর্দমা ও পয়ঃনিষ্কাশনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা থাকার কথা। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব সেবার অনেক ক্ষেত্রেই প্রয়োজনীয় সক্ষমতার ধারেকাছেও পৌঁছাতে পারেনি পৌরসভাটি।
জানা গেছে, পৌরসভার মোট পাকা সড়ক ৯ দশমিক ৫ কিলোমিটার। এর বেশির ভাগই বেহাল। প্রায় ১০ হাজার পরিবারের মধ্যে মাত্র তিন হাজার পরিবার সাপ্লাইয়ের পানি পাচ্ছে। ময়লা-আবর্জনা ব্যবস্থাপনার জন্য নেই কোনো ডাম্পিং স্টেশন। ফলে শহরের বিভিন্ন স্থানে জমে থাকে বর্জ্য। ড্রেনেজ ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা দুর্বল হওয়ায় বৃষ্টির সময় জলাবদ্ধতায় ভোগান্তিতে পড়েন বাসিন্দারা।
পৌরসভার শ্রেণি উন্নীত হওয়ার প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, জমি নিবন্ধন থেকে দুই শতাংশ হারে রাজস্ব আদায়ের মাধ্যমে বছরে এক কোটি টাকা আয়ের শর্ত পূরণ করেই পৌরসভাটি ‘ক’ শ্রেণিতে উন্নীত হয়। তবে অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও নাগরিক সেবার মানে সেই শ্রেণির উপযোগিতা অর্জিত হয়নি। ‘ক’ শ্রেণির পৌরসভার জন্য নির্ধারিত জনবল কাঠামোর চেয়েও বেশি কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন বলেও অভিযোগ। বর্তমানে সহকারী প্রকৌশলী, হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা, কর নির্ধারক, অফিস সহায়ক, নলকূপ মিস্ত্রি, রোলার চালক, মিক্সার মেশিন অপারেটর ও গাড়িচালকসহ ৭৮ জন কর্মরত আছেন।
পৌরসভার দুই কর্মকর্তার অভিযোগ, এডিপির বেশির ভাগ কাজের দরপত্র বিএনপির কয়েকজন নেতা ও তাদের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নামে দেওয়া হয়। তাদের দাবি, প্রায় ১০ বছরেও পৌরসভায় উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন হয়নি। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি প্রকাশের আগে বক্তব্য নেওয়া গেলে তা যুক্ত করা প্রয়োজন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সাবেক সংসদ সদস্য কাজী শহীদ ইসলাম পাপুল পৌরবাসীর চিকিৎসাসেবার জন্য একটি অ্যাম্বুলেন্স দিয়েছিলেন। কিন্তু কর্তৃপক্ষের অবহেলায় সেটি দিয়ে কোনো রোগী সেবা পাননি। বর্তমানে গাড়িটি প্রায় অকেজো অবস্থায় পড়ে আছে।
নাগরিক সুবিধা না পাওয়ার ক্ষোভ জানিয়ে রায়পুর বাজারের মুরিহাটা এলাকার ব্যবসায়ী শরীফ হোসেন বলেন, বেহাল পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা, সড়কে ময়লা-আবর্জনায় সয়লাব। পৌরসভা হিসেবে যে সুবিধা থাকার কথা, তার কিছুই পাচ্ছি না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাসিন্দা বলেন, শুধু ট্যাক্স আদায় ছাড়া পৌরসভার আর কোনো দায়িত্বই দেখছি না।
সমাজসেবক অ্যাডভোকেট আবদুল আহাদ শাকিল বলেন, রায়পুর শহরটি পুরো উপজেলার মানুষের কাছে ঐতিহ্যের প্রতীক হলেও উন্নয়নের দিক থেকে অনেক পিছিয়ে। রাস্তাঘাট, পার্ক, টার্মিনাল, ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও বস্তি উন্নয়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। বরাদ্দ এলেও কাজের যথাযথ বাস্তবায়ন হচ্ছে না। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কিছু উন্নয়নকাজ শুরু হলেও ঠিকাদারদের গাফিলতিতে নির্ধারিত সময়ে প্রকল্প শেষ হচ্ছে না। এতে জনদুর্ভোগ বাড়ছে। দ্রুত সড়কগুলোর উন্নয়নসহ প্রয়োজনীয় নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।
রায়পুর বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি ইব্রাহিম খান বলেন, পৌর প্রশাসক বাজার ইজারা দেওয়ার পরও ফুটপাতের হকার ও ভ্যানগাড়ি থেকে প্রতিদিন খাজনা আদায় করা হচ্ছে। এতে অবৈধ ব্যবসায়ীরা একধরনের বৈধতা পাচ্ছেন। বড় একটি পৌরসভার উপজেলা পরিষদে যাওয়ার সড়কটিও বেহাল। সংকীর্ণ সড়কের ওপর ফুটপাত দখল হওয়ায় দুর্ভোগ আরও বেড়েছে।
তিনি বলেন, প্রায় ১৬ কোটি টাকা ব্যয়ে দুই কিলোমিটার সড়কের কাজ এক বছরের মধ্যে শেষ করার কথা থাকলেও সাত মাসে মাত্র ৪ শতাংশ কাজ হয়েছে। বাকি পাঁচ মাসে কাজ শেষ করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। শহরের সৌন্দর্যবর্ধনেও কোনো উদ্যোগ নেই। পুরোনো পৌরসভার সড়কগুলো এখন মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। দ্রুত উন্নয়নকাজ শেষ করার দাবি জানান তিনি।
এসব বিষয়ে পৌর প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আজিজুন্নাহার বলেন, তিনি সম্প্রতি দায়িত্ব নিয়েছেন। বস্তি উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ পাওয়া প্রায় এক কোটি টাকা ফেরত গেছে। সেই অর্থ পুনরায় আনার চেষ্টা চলছে। নতুনবাজার ও ট্রাফিক মোড় থেকে নর্দমা পর্যন্ত সড়কসহ ১৪টি সড়কের উন্নয়নকাজে প্রায় ২০ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে। তবে কাজের ধীরগতির কারণে সমস্যা তৈরি হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, আঞ্চলিক মহাসড়কের সড়কবাতিগুলো পুনরায় স্থাপনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পৌরসভার ড্রেনেজ ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং যেসব হোল্ডিংয়ে পানির সংযোগ নেই, সেগুলোতে সংযোগ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে।