আশুলিয়ায় নাইটিংগেল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই, হাসপাতালে নেই রোগীও, শুধুমাত্র পরীক্ষা ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং বোর্ডকে দেখানোর জন্য এক মাসের চুক্তিতে শিক্ষক ভাড়া করে নিয়ে আসতো এই কলেজের কর্তৃপক্ষ। এমনকি সুস্থ লোকজনকে ভাড়া করে রোগী হিসেবে সাজিয়ে রাখা হতো ওই হাসপাতালে। এমন সব অভিযোগ উঠে এসেছে নাইটিংগেল মেডিক্যাল হাসপাতালের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে।
অমিত, রবিন, খালেদ হাসান, ইসমাত আরাসহ অনেক শিক্ষার্থীর অভিযোগ করে বলেন, নাইটিংগেল মেডিক্যাল কলেজে নীতিমালা অনুযায়ী কলেজ পরিচালনা করা তো দূরের কথা বিএমডিসির অনুমোদন ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে এই প্রতিষ্ঠান। পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই কলেজে। এমনকি কিছু বিভাগ পুরোপুরি শিক্ষকশূন্য। এছাড়াও মেডিক্যাল কলেজের জন্য যেসব যন্ত্রপাতির প্রয়োজন তার কিছুই নেই নাইটিংগেল কলেজে।
শিক্ষার্থীদের ভর্তির সময় ভর্তির প্রস্তাবনায় কলেজের যে সব সুযোগ সুবিধার কথার উল্লেখ ছিল বাস্তবে এসব কিছুর ছায়াও পড়েনি গত কয়েক বছরে। শিক্ষার্থীদের সাথে প্রতারণা করে এই কলেজে তাদেরকে ভর্তি করানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তারা।
শিক্ষার্থীরা আরও অভিযোগ করে বলেন, নাইটিংগেল কলেজের হাসপাতাল ৪শ’ বেডের বলা হয়েছিল। পরবর্তীতে সেটা কমে ২শ’ বেড হয়ে গেছে। হাসপাতালে বেড থাকলেও তাতে কোনও রোগী ছিল না। প্রতিদিন দু’একজন রোগী থাকতো ওই হাসপাতালে। এতে করে তাদের ৪শ’ শিক্ষার্থী রোগীর স্বল্পতায় ইন্টার্নি করতে পারতেন না।
কলেজ কর্তৃপক্ষের এসব প্রতারণার কথা কেউ বলতে চাইলে তাকে কলেজ থেকে বহিষ্কারের হুমকিও দিতেন প্রতিষ্ঠানটির প্রশাসনিক কর্মকর্তা নুরে ইমাম মেহেদি। এছাড়াও পরীক্ষার সময় কলেজের প্রশাসনিক কর্মকর্তা বিভিন্ন টালবাহানা করে তাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করতো বলেও অভিযোগ করেন তারা। আরও দেখা গেছে এই কলেজ থেকে পরীক্ষা শেষ করার পর ইন্টার্নিও শেষ হয়ে গেছে, তবু বিএমডিসির স্বীকৃতি না পাওয়ায় কোথাও যোগ দিতে পারেননি অনেকেই।
এমনকি বিদেশি শিক্ষার্থীদের সাথেও প্রতারণা করতেন কলেজ কর্তৃপক্ষ। স্টুডেন্ট ভিসা না দিয়ে তাদেরকে টুরিস্ট ভিসা দিয়ে বাংলাদেশে নিয়ে এসে অবৈধভাবে এই কলেজে ভর্তি করা হতো বলেও অভিযোগ করেন তারা।
এদিকে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম কলেজটি সাময়িক বন্ধ ঘোষণা করার পর থেকেই এই কলেজের অধ্যক্ষ ও পরিচালককে অবরুদ্ধ করে রাখে শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীরা বলেন, কলেজটি বন্ধ ঘোষণা করার পরই প্রশাসনিক কর্মকর্তা তাদেরকে অনিশ্চয়তার মধ্যে রেখে কলেজ থেকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। পরে শিক্ষার্থীরা তাকে আটকে অবরুদ্ধ করে রাখেন। খবর পেয়ে কলেজের প্রশাসনিক কর্মকর্তা কলেজে ছুটে আসলে শিক্ষার্থীরা তাকেও অবরুদ্ধ করে রাখেন।
রুহুল আমিন নামে শেষ বর্ষের এক শিক্ষার্থী বলেন, নাইটিংগেল মেডিক্যাল কলেজে এ পর্যন্ত তার প্রায় ২০ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। অথচ বিএমডিসির নিয়ম অনুযায়ী বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর কাছ থেকে ১২ লাখ টাকার ওপরে নেওয়ার নিয়ম নেই।
তিনি ছাড়াও ওই কলেজে এখনও অনেক শিক্ষার্থী রয়েছেন যারা জমি বিক্রি করে সেই টাকা দিয়ে পড়াশুনা করছেন। অথচ কলেজ কর্তৃপক্ষের অনিয়মের কারণে তাদের প্রায় ৪শ’ শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ আজ অনিশ্চয়তায়।
জানা যায়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় মাইগ্রেশন করে অন্য বেসরকারি কলেজে শিক্ষা কার্যক্রম সম্পন্ন করার কথা বললেও সে ক্ষেত্রে সময়ের প্রয়োজন। আগামী জানুয়ারি মাসে নাইটিংগেল কলেজের অনেক শিক্ষার্থীর পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করার কথা। এ মুহূর্তে মাইগ্রেশন করলে একদিকে তারা যেমন অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়বেন, অন্যদিকে তাদের জীবন থেকে হারিয়ে যাবে মূল্যবান কিছু সময়।
কলেজ কর্তৃপক্ষের অনিয়মের দায় তাদের কেন নিতে হবে এ প্রশ্নকে সামনে রেখে বিক্ষোভে সোচ্চার শিক্ষার্থীরা সোমবার রাত থেকেই ওই কলেজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হুমায়ুন জামান, অধ্যক্ষ ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা নূর ইমাম মেহেদিকে অবরুদ্ধ করে রাখে। খবর পেয়ে আশুলিয়া থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌছে কয়েক দফায় শিক্ষার্থীদের বোঝাতে চেয়েও ব্যর্থ হয়।
প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক হুমায়ুন আজাদ বলেন, এ বিষয়ে তাদের প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে আলোচনা চলছে। দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি জানান।
এ ব্যাপারে ঢাকা জেলা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আশরাফুল আজিম বলেন, শিক্ষার্থীদের অবরুদ্ধের খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে সোমবার রাত থেকে ওই কলেজের ভেতরে অবস্থান করছে। এছাড়াও যে কোনও অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করে রাখা হয়েছে বলেও তিনি জানান।
আরও পড়ুন: বন্ধের খবরে শঙ্কিত গাজীপুর সিটি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের শিক্ষার্থীরা
শিক্ষক, রোগী ও চিকিৎসা সামগ্রীর স্বল্পতা নিয়ে চলছে নর্দান মেডিক্যাল কলেজ
/এইচকে/








