পদ্মা নদীর ভাঙনের কবলে পড়েছে মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার চরাঞ্চলের ৪১নং সুতালড়ী রামচন্দ্রপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি। ইতোমধ্যে পদ্মার পেটে বিদ্যালয়টির এক-তৃতীয়াংশ চলে গেছে। প্রমত্তা পদ্মা যেকোনও সময়ে গিলে খাবে বাকি অংশটিও।
স্থানীয় শিক্ষা অফিস জানিয়েছে, গত বছরও বিদ্যালয় থেকে পদ্মার দূরত্ব ছিল আধা কিলোমিটার। কিন্তু ভাঙতে ভাঙতে সেই দূরত্ব ঘুচিয়ে এবার বিদ্যালয়টি গিলে খাচ্ছে। প্রমত্তা পদ্মার ভাঙাগড়ার খেলায় আবারও স্থান পরিবর্তন করতে হচ্ছে ৮৪ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত ৪১নং সুতালড়ী রামচন্দ্রপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি।
সোমবার (৯ আগস্ট) দুপুর পর্যন্ত বিদ্যালয়টির এক-তৃতীয়াংশ নদীগর্ভে চলে গেছে। আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই সম্পূর্ণ বিদ্যালয়টি বিলীন হয়ে যাবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। শিক্ষা বিভাগসহ স্থানীয় প্রশাসন এখন নতুন একটি স্থান দেখছেন, যেখানে বিদ্যালয়টি নতুন করে গড়ে তোলা হবে।
উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয় ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ১৯৩৭ সালে বিদ্যালয়টি উপজেলার ধুলশুড়াতে স্থাপিত হয়। পরে পদ্মানদীর ভাঙনের কবলে পড়ায় ২০০৭ সালে উপজেলার সুতালড়ী ইউনিয়নে স্থানান্তর কর হয়। পরে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত প্রাথমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পুনর্বাসন/পুনর্নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় ৪৫ ফুট দৈর্ঘ্য ও ১২ ফুট প্রস্থবিশিষ্ট দুইতলা পাকা ভবন নির্মিত হয়। তখন নদীর সীমানা ছিল বিদ্যালয় থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে। বর্তমানে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সংখ্যা ২৬ জন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, প্রতিবছরের মতো এ বছরও পদ্মা নদীতে পানি বৃদ্ধির ফলে প্রায় দুই মাস পূর্বে ভাঙন শুরু হয়। প্রথমে ভাঙনের তীব্রতা কম থাকলেও গত ১৫ দিন ধরে ভাঙনের তীব্রতা বাড়ে। ফলে গত ৪ আগস্ট (বুধবার) দিবাগত রাতে বিদ্যালয় ভবনের এক-তৃতীয়াংশ ভেঙে যায়। পরিস্থিতি সামাল দিতে না পারলে রক্ষা করা সম্ভব হবে না বিদ্যালয়টি।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, গত এক মাসে ওই এলাকার শতাধিক পরিবার বসতভিটা হারিয়েছেন। ভাঙনের ভয়ে ঘরবাড়ি অন্যত্র স্থানান্তর করেছেন অনেকে। এছাড়াও, কৃষি জমি, বিভিন্ন ফলের বাগান ও স্থাপনাও নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।
স্থানীয় বালিয়াগোপা গ্রামের আব্দুর রব মোল্লা বলেন, ‘১৫ দিন আগেও বিদ্যালয় থেকে নদীর দূরত্ব ৫০-৬০ ফুট দূরে ছিল। ১ আগস্ট থেকে বিদ্যালয় ভাঙন রোধে বালুভর্তি জিও ব্যাগ ডাম্পিং করে পানি উন্নয়ন বোর্ড। এতেও বিদ্যালয়টির শেষ রক্ষা হচ্ছে না। আরও বেশি জিও ব্যাগ ফেলা হলে অন্তত বিদ্যালয়টি শেষ রক্ষা করা যেত।’
সুতালড়ী রামচন্দ্রপুর গ্রামের রুস্তম খাঁ বলেন, ‘পানি উন্নয়ন বোর্ড যদি আগে থেকে বিদ্যালয়টি রক্ষার উদ্যোগ নিতো তাহলে হয়তো বিদ্যালয়টি রক্ষা করা যেত।’
এদিকে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা তাপস কুমার অধিকারী, উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. জালাল উদ্দিনসহ আরও কয়েকজনকে নিয়ে বিদ্যালয়টি পরিদর্শনে আসেন। এ সময় জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা বলেন, ‘গত বছরও সহকারী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা বিদ্যালয়টি পরিদর্শনে এসেছিলেন। তখন পদ্মা নদী থেকে বিদ্যালয়টির দূরত্ব ছিল প্রায় আধা কিলোমিটার। আর এবার এক ইঞ্চি বাঁকি নেই পদ্মা থেকে। বিদ্যালয়ের একাংশ এখন পদ্মার পেটে।’
তিনি বলেন, ‘ভাঙন শুরুর প্রথম দিকে উপজেলা শিক্ষা অফিস থেকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) মাধ্যমে পানি উন্নয়ন বোর্ডে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড থেকে যে ব্যবস্থা (বালুভর্তি জিও ব্যাগ ডাম্পিং) নেওয়া হয়েছে তা খুবই অপ্রতুল ছিল। খুব দ্রুতই একটা জায়গা নির্ধারণ করে বিদ্যালয়টি স্থানান্তর করা হবে।’
মানিকগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাঈন উদ্দিন বলেন, ‘গত মাসের ২৫ বা ২৬ তারিখে আমি ভাঙনের বিষয়ে ইউএনও-এর কাছ থেকে চিঠি পেয়েছি। চরাঞ্চল আমাদের কর্মপরিধির বাইরে। এরপরও ১ আগস্ট থেকে বিদ্যালয়টি রক্ষার জন্য জরুরি ভিত্তিতে ২০০ মিটার অংশে প্রায় ৯ হাজার জিও ব্যাগ ডাম্পিং করা হয়েছে।’
হরিরামপুর ইউএনও মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস থেকে যেদিন চিঠি পেয়েছি, ওইদিনই আমি জেলা প্রশাসকসহ পানি উন্নয়ন বোর্ডকে জানিয়েছি।’









