X
শুক্রবার, ০৭ অক্টোবর ২০২২
২২ আশ্বিন ১৪২৯

নষ্ট হওয়ার পথে মুন্সীগঞ্জ গ্রন্থাগারের ২৪ হাজার বই

তানজিল হাসান, মুন্সীগঞ্জ
০১ মার্চ ২০২২, ১১:০০আপডেট : ০১ মার্চ ২০২২, ১১:০০

মুন্সীগঞ্জ সরকারি গণগ্রন্থাগারের ৩৬ হাজার বইয়ের মধ্যে ১২ হাজার বই পাঠকের পড়ার জন্য উন্মুক্ত রয়েছে। জায়গার অভাবে ২৪ হাজার বই প্রদর্শনের সুযোগ পায় না গ্রন্থাগার কর্তৃপক্ষ। এই ২৪ হাজার বই স্টোর রুমে ফেলে রাখা হয়েছে। ফলে পড়া তো দূরের কথা, বইগুলোর চেহারাই দেখতে পারেন না পাঠকরা। কাজে না আসায় নষ্ট হওয়ার পথে এসব বাই। 

এদিকে, পাঠকের জন্য গ্রন্থাগারে তিনটি কম্পিউটার দেওয়া হলেও ব্যবহার না হওয়ায় সবগুলো নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। একটিও ব্যবহার করতে পারছেন না পাঠকরা। গ্রন্থাগারে শিশু কর্নার থাকলেও শিশুদের পাঠাগারে ঢুকতে দেওয়া হয় না। গ্রন্থাগারে যেসব বই আছে সেগুলো মানসম্মত নয় বলে অভিযোগ পাঠকদের। এতে পাঠক সংখ্যা কমে গেছে। 

গণগ্রন্থাগারে পাঠক সংখ্যা:

গত সপ্তাহে চার দিন মুন্সীগঞ্জ সরকারি গণগ্রন্থাগারে গিয়ে দেখা গেছে, পাঠকের সংখ্যা কম। একসঙ্গে কখনও ১০ জন পাঠককে দেখা যায়নি এই চারদিন। তবে উপস্থিত পাঠকদের বেশিরভাগই চাকরিপ্রার্থী। তারা বিভিন্ন চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে গ্রন্থাগারে আসেন। 

গ্রন্থাগারে সদস্য সংখ্যা:

জেলার এই সরকারি গ্রন্থাগারে সদস্য সংখ্যা ১১১ জন। সদস্য কিংবা পাঠক সংখ্যা বাড়াতে কোনও উদ্যোগ নেয়নি গ্রন্থাগার কর্তৃপক্ষ। গ্রন্থাগারিক জানিয়েছেন, পাঠক সংখ্যা বৃদ্ধির ব্যাপারে গ্রন্থাগারের পক্ষ থেকে কোনও ধরনের প্রচার-প্রচারণা চালানো হয় না।

পাঠকের মতামত: 

চাকরি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে গ্রন্থাগারে বই পড়তে আসা মো. শরিফুল ইসলাম বলেন, এখানে পড়ার পরিবেশ ভালো। কিন্তু চাকরির প্রস্তুতি সংক্রান্ত আরও ভালো মানের বই রাখা দরকার। অনেকদিন ধরে কম্পিউটারগুলো নষ্ট হয়ে আছে। সেগুলো ঠিক করে আমাদের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করলে ভালো হয়।

গ্রন্থাগারের পাঠক মো. জিয়াউর রহমান বলেন, এখানে অনেক বই রয়েছে। তবে আমরা মূলত চাকরির প্রস্তুতি নিতে গ্রন্থাগারে পড়তে আসি। অন্যান্য বই পড়ার সুযোগ হয় না।

গ্রন্থাগারের আরেকজন পাঠক মেহেদী হাসান পায়েল বলেন, এখানে যে শিশু কর্নার রয়েছে সেটি অন্য কোনও কক্ষে সরিয়ে নিলে ভালো হয়। শিশুরা এসে মাঝেমধ্যে খেলাধুলা করায় তাদের গ্রন্থাগারে ঢুকতে দেওয়া হয় না। এতে বিনোদন থেকে শিশুরা বঞ্চিত হচ্ছে। পাশাপাশি শিশুদের ঢুকতে দিলে এখানে বিশৃঙ্খলা করে। ফলে পাঠকদের মনোযোগ নষ্ট হয়। সেই সঙ্গে গ্রন্থাগারের সময়সীমা আরও বাড়ানো উচিত।

নষ্ট হয়ে গেছে ৩টি কম্পিউটার, কাজে আসে না ২৪ হাজার বই

গ্রন্থাগার নিয়ে সুশীল সমাজের ভাবনা:

বাংলাদেশ প্রগতি লেখক সংঘের মুন্সীগঞ্জ শাখার সভাপতি ও ভাগ্যকুল পাঠাগার এবং
সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের সভাপতি মুজিব রহমান বলেন, মুন্সীগঞ্জ সরকারি গণগ্রন্থাগারে গিয়ে আমি একবার বলেছিলাম, পাঠককে আকৃষ্ট করতে হলে প্রথমে আপনাদের উচিত কিছু বই পুড়িয়ে ফেলা। কারণ গ্রন্থাগারে যেসব বই আছে, তা খুবই নিম্নমানের। পাঠযোগ্য নয়। এসব বই পড়লে পাঠকরা হতাশ হবেন। কোনও দিন বই পড়তে চাইবেন না। তারা নিম্নমানের বই কিনেছে। পাঠকরা সেগুলো পড়ে আনন্দ পান না। এজন্য পাঠকের সংখ্যা কমে গেছে। 

তিনি বলেন, আমরা শ্রীনগরে যে গ্রন্থাগার দিয়েছি, সেখান থেকে গত দুই বছরে তিন হাজার বই ইস্যু করেছি। এত বই ইস্যু করতে পারার একটাই কারণ, তা হচ্ছে আমাদের গ্রন্থাগারের বই মানসম্মত। ভালো বই থাকলে পাঠক লাইন ধরে নিয়ে যান। এছাড়া সরকারি গ্রন্থাগারে বই ইস্যু করে বাসায় নিতে হলে কিছু টাকা জামানত রাখতে হয়। এসব কারণে একজন শিক্ষার্থীর মনে ভয় ঢুকে যায়। আমাদের গ্রন্থাগার থেকে বই নিতে কোনও জামানত লাগে না। শুধু নাম ঠিকানা ও মোবাইল নম্বর লিখে বই ইস্যু করা হয়। এ কারণে শিক্ষার্থীরা বাসায় নিয়ে বই পড়তে উৎসাহিত হয়। আমাদের গ্রন্থাগার থেকে ইস্যু করা বই ফেরতও আসে শতভাগ। কখনও মনে হয়নি বই পড়তে পাঠকের অনীহা আছে। ভালো বই পড়ার জন্য পাঠকরা আগে থেকে বুকিং করে যান।

সরকারি হরগঙ্গা কলেজের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মাহফুজা বেগম বলেন, বর্তমান প্রজন্ম অনেক বেশি অনলাইন কার্যক্রমে ব্যস্ত। তাই বই পাঠে সময় দিতে পারে না। এমন পরিস্থিতিতে গ্রন্থাগার কর্তৃপক্ষ যথাযথ পদক্ষেপ নিলে বর্তমান প্রজন্মের কাছে গ্রন্থাগারগুলো আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে। সেই সঙ্গে পাঠক বাড়বে। যদিও এখন অনলাইনমুখী একটা প্রজন্ম গড়ে উঠেছে। তবু বইয়ের বিকল্প নেই। বই পাঠকের মনে অন্যরকম যে একটা অনুভূতি তৈরি করে, তা বর্তমান শিক্ষার্থীদের মাঝে অনুপস্থিত। বই না পড়ার কারণে বর্তমান প্রজন্ম অনেক বেশি বাণিজ্যিক চিন্তাধারার হয়ে উঠছে। কাজেই আমাদের ভালোর জন্যই গ্রন্থাগার-সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখতে হবে।

তিনি বলেন, পিডিএফ বই কিংবা অনলাইন পড়াশোনাও হয়তো কেউ কেউ করছেন। তবে তা অল্প। কিন্তু এতে স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি আছে। কাজেই শুধু গ্রন্থাগার খুলে বসে থাকলে হবে না। কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। 

মুন্সীগঞ্জ প্রেসক্লাবের সভাপতি অ্যাডভোকেট শহীদ-ই-হাসান তুহিন বলেন, বর্তমান ‌যুগে বইয়ের প্রতি মানুষের আগ্রহ কমেছে। স্কুল-কলেজ পর্যায়ে একই অবস্থা। এখন পিডিএফ আকারে বই পাওয়া যায়। সেসব সুবিধার কারণে গ্রন্থাগারে হয়তো পাঠক কম যায়। সেটা খারাপ কিছু নয়। পত্রিকা পাঠও অনেক কমে যাচ্ছে। ইন্টারনেট কিংবা গুগলের কারণে সশরীরে গ্রন্থাগারে যাওয়া পাঠকের সংখ্যা কমে গেছে।

গ্রন্থাগারিকের বক্তব্য:

মুন্সীগঞ্জ সরকারি গণগ্রন্থাগারের গ্রন্থাগারিক এসএম জহিরুল ইসলাম বলেন, ‌‘জায়গা ও শেলফের অভাবে ২৪ হাজার বই স্টোর রুমে রাখা হয়েছে। সেগুলো পাঠক পড়তে পারেন না।’

জায়গার অভাবে ২৪ হাজার বই প্রদর্শনের সুযোগ পায় না গ্রন্থাগার কর্তৃপক্ষ

গ্রন্থাগারের রেজিস্ট্রার বইতে দেখা যায়, গড়ে প্রতিদিন ৫০ জন পাঠকের উপস্থিতি লেখা রয়েছে। তবে সরেজমিনে তা পাওয়া যায়নি। তবু পাঠকের উপস্থিতি নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করে জহিরুল ইসলাম বলেন, পাঠকের উপস্থিতি ভালো। আমরা এতে সন্তুষ্ট।

এদিকে, গ্রন্থাগারে পাঠকের ব্যবহারের জন্য তিনটি কম্পিউটার থাকলেও সবগুলো নষ্ট। গ্রন্থাগারের এমএলএসএস লিটন মিয়া বলেন, চার বছর আগে তিনটি কম্পিউটার দিয়েছিল সরকার। কিন্তু সেসব কম্পিউটারে ইন্টারনেট সংযোগ দিয়েছিল চার মাস আগে।ব্যবহারের অভাবে কম্পিউটারগুলো নষ্ট হয়ে গেছে।

এ প্রসঙ্গে গ্রন্থাগারিক এসএম জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘কম্পিউটার নষ্ট হওয়ার কারণে পাঠকরা সেগুলো ব্যবহার করতে পারেন না। কিন্তু গ্রন্থাগারে ওয়াইফাই সংযোগ দেওয়া আছে। পাঠকরা ফ্রি ওয়াইফাই ব্যবহার করতে পারেন। আর ফ্রি ওয়াইফাই সংযোগ দেওয়ার কারণে কম্পিউটার সেবা আর দিচ্ছি না।’

গ্রন্থাগারে লোকবল কম:

গ্রন্থাগারে নয় জন লোকবলের অনুমোদন থাকলেও সরেজমিনে একজনকে (এমএলএসএস) দায়িত্বপালন করতে দেখা গেছে। ফোন করলে গ্রন্থাগারিক বলেন, আমি ছুটিতে আছি। নয় পদের বিপরীতে বর্তমানে তিন জন গণগ্রন্থাগারে কর্মরত আছেন। এর মধ্যে একজন রয়েছেন মাতৃত্বকালীন ছুটিতে। এছাড়া ক্যাটালগার, কম্পিউটার ও নাইট গার্ডসহ ছয়টি পদে এখনও লোক নিয়োগ দেওয়া হয়নি।

/এএম/
বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
২৪ ঘণ্টায় রাশিয়ার ২০টি ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি ইউক্রেনের
২৪ ঘণ্টায় রাশিয়ার ২০টি ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি ইউক্রেনের
স্বাস্থ্যকর সবজি ও সঠিক মূল্য নিশ্চিতে ডিএসসিসির ‘কৃষকের বাজার’
স্বাস্থ্যকর সবজি ও সঠিক মূল্য নিশ্চিতে ডিএসসিসির ‘কৃষকের বাজার’
সম্মেলনে বিএনপির দুই গ্রুপের সংঘর্ষে আহত ৮
সম্মেলনে বিএনপির দুই গ্রুপের সংঘর্ষে আহত ৮
রঙিন ছাতার আড়ালে স্মৃতির ফটক (ফটো স্টোরি)
ঢামেকের ঐতিহাসিক আমতলা গেটরঙিন ছাতার আড়ালে স্মৃতির ফটক (ফটো স্টোরি)
বাংলাট্রিবিউনের সর্বাধিক পঠিত
প্রস্তুত হন, চেরাগ জ্বালিয়ে চলতে হবে: প্রধানমন্ত্রী
প্রস্তুত হন, চেরাগ জ্বালিয়ে চলতে হবে: প্রধানমন্ত্রী
আলিবাবার জ্যাক মা পারলে আমরা পারবো না কেন: শামীমা নাসরিন
আলিবাবার জ্যাক মা পারলে আমরা পারবো না কেন: শামীমা নাসরিন
গোলমাল বাধলে ঘর স্ত্রীর নামে যাবে, স্বামীর নামে না: প্রধানমন্ত্রী
গোলমাল বাধলে ঘর স্ত্রীর নামে যাবে, স্বামীর নামে না: প্রধানমন্ত্রী
মেট্রোরেলে চাকরির সুযোগ, বড় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ
মেট্রোরেলে চাকরির সুযোগ, বড় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ
চোখের সামনে পড়েছিল কয়েকজনের লাশ, মৃত্যুর হাত থেকে ফিরলাম
চোখের সামনে পড়েছিল কয়েকজনের লাশ, মৃত্যুর হাত থেকে ফিরলাম