X
রবিবার, ২১ এপ্রিল ২০২৪
৮ বৈশাখ ১৪৩১

‘মাকে ছাড়া আমাদের কোনও ঈদ নেই’ 

আরিফ হোসাইন কনক, নারায়ণগঞ্জ
২৫ এপ্রিল ২০২২, ১০:১০আপডেট : ২৫ এপ্রিল ২০২২, ১০:২৩

‘মা কে ছাড়া প্রতিটা মুহূর্ত কষ্টের, বিশেষ করে যখন মায়ের স্মৃতি মনে পড়ে, কিছুতেই নিজেকে মানাতে পারি না। সেই মাকে ছাড়া আমাদের কোনও উৎসব নেই, ঈদ নেই, নেই কোনও উদযাপন। তবে ভাগ্য মেনে নেওয়া ছাড়া আমরা আর কিইবা করতে পারি? মাকে ছাড়া আমাদের প্রথম ঈদে বাবা কোনও জামা-কাপড় কেনেননি। আগে মা বাবাকে পছন্দ করে জামা কিনে দিতো, এখন কে কিনে দিবে?’ এভাবেই মাকে ছাড়া ঈদ করার কষ্ট আর অনুভূতির কথাগুলো বলছিলেন শীতলক্ষ্যা জাহাজের ধাক্কায় লঞ্চডুবিতে নিহত স্কুল শিক্ষক উম্মে খায়রুল ফাতেমার বড় ছেলে মো. আরশাদ ফাহিম তালহা। 

গত ২০ মার্চ শীতলক্ষ্যা নদীতে কার্গো জাহাজ রূপসী-৯ এর ধাক্কায় যাত্রীবাহী লঞ্চ এম.এল আফসার উদ্দিন ডুবে ১০ জনের মৃত্যু হয়। লঞ্চডুবির দ্বিতীয় দিন ২১ মার্চ দুপুরে নদী থেকে স্কুল শিক্ষিকা উম্মে খায়রুল ফাতেমার লাশ উদ্ধার করে ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা। তিনি সোনারগাঁয়ের বৈদ্যরবাজার হারিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। তবে লঞ্চডুবির ঘটনায় অলৌকিকভাবে বেঁচে যায় তার স্বামী আবু তাহের।  

নিহতের ছেলে তালহা (১৮) রাজধানীর সাভারের মারকাজুল উলুম আশ-শারইয়াহ মাদ্রাসার হেদায়াতুন নাহুম হাদিস বিভাগে পড়াশোনা করেন। ঈদের ছুটিতে বাড়ি এসেছেন। তবে মায়ের কথা বার বার মনে পড়ায় আপাতত ফুপির বাড়িতে কয়েকদিন ধরে অবস্থান করছেন। প্রতি বছর ঈদ এলে গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে যাওয়াসহ নানা আয়োজন নিয়ে পরিকল্পনা হতো। তবে এবারের ঈদে কোনও পরিকল্পনা নেই। ঈদের নামাজ শেষে মায়ের কবর জিয়ারত করে সেখানে সময় কাটাবেন বলে জানান তালহা। 

তিনি বলেন, ‘মাকে ছাড়া ঈদ কাটানোর কথা কখনও ভাবিনি। ঈদের দিনে মা সব সময় আমার পছন্দের বিরিয়ানি রান্না করতেন। আমাদের দুই ভাইয়ের পছন্দের খাবার রান্না করতেন। তবে এ বছর কে আমাদের জন্য রান্না করবেন?

তালহা আরও বলেন, ‘মা মারা যাওয়ার পর আমি খুব ভেঙে পড়েছিলাম। তার কথা বার বার মনে পড়ে। তার সঙ্গে আমার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। এভাবে চলে যাওয়া কিছুতেই মেনে নিতে পারিনি।’  

ঈদে কেনাকাটার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এবার ঈদের জন্য বাবা পাঞ্জাবি ও পায়জামা কিনে দিয়েছেন। ছোট ভাইয়ের জন্যও কিনেছেন। তবে মায়ের শোকে বাবা কিছুই কেনেননি। মূলত প্রতি ঈদে আম্মু বাবার জন্য জামা পছন্দ করে দিতেন। এবার মা নেই, বাবাও কোনও জামা কেনেননি। তবে আমি বাবাকে কিনতে বলেছি। তিনি রাজি হননি।’

মাকে নিয়ে কবিতা লিখেছে তালহা। তিনি বলেন, ‘আমার সাহিত্য চর্চা ও কবিতা লেখালেখিতে মা খুবই উৎসাহ জুগিয়েছে। লেখালেখির কারণে আমার স্বপ্ন ছিল সাংবাদিকতা করার। তবে মায়ের ইচ্ছে ছিল আমাকে আলেম বানানোর। তাই দ্বীন প্রচারের জন্য আমাকে মাদ্রাসায় ভর্তি করিয়েছেন। তবে আমি এখনও সাহিত্য চর্চা করি। বেশ কয়েকটি কবিতা ইতোমধ্যে লেখা হয়েছে। তার মধ্যে সম্প্রতি আমি মা কে নিয়ে একটি কবিতা লিখেছি। তিনি গত হওয়ার পরে তাকে নিয়ে এটি আমার প্রথম লেখা।  

মায়ের শোকে তালহার ছোটভাই মো. মাহফুজুর রহমান মুআয (১৪) লুকিয়ে লুকিয়ে বেশ কিছুদিন কেঁদেছেন। তবে চাপা স্বভাবে হওয়ায় তার অনুভূতিগুলো কখনও অন্যের সামনে প্রকাশ করতো না। ছোটভাইয়ের বিষয়ে তালহা বলেন, মুআয সবার থেকে একটু আলাদা। সব সময় চুপচাপ থাকে ও গম্ভীর স্বভাবের। মায়ের মৃত্যুর পরে সে লুকিয়ে লুকিয়ে কান্না করেছে। ও সোনারগাঁয়ের চৌরাস্তা ক্বাসিমুল উলুম মাদ্রাসায় কোরআনে হাফেজ হিসেবে পড়াশোনা করছে। মায়ের মৃত্যুর পরে আমি ওর মাদ্রাসায় দেখা করতে গেলে মায়ের কথা জিজ্ঞাসা করেছিল। আমি কোনও উত্তর দিতে পারিনি। এখনও সে ঈদের ছুটি পায়নি, মাদ্রাসায় আছে।

শিক্ষিকা উম্মে খায়রুল ফাতেমার স্বামী মো. আবু তাহের সরকার কিছুতেই এই দুর্ঘটনা মেনে নিতে পারছেনা। চোখের সামনে প্রিয় স্ত্রী পানিতে ডুবে মারা গেছেন। তিনি বলেন, ‘সারাক্ষণ স্ত্রীর স্মৃতি আমাকে তাড়া করে বেড়ায়। বিশেষ করে চোখের সামনে পানিতে তার ডুবে যাওয়ার দৃশ্য আমি কোনোদিন ভুলতে পারবো না। ওই মুহূর্তে তাকে বাঁচানোর চেষ্টাটাকে খুবই ক্ষীণ মনে হয়। বার বার মনে হয় অন্য কোনোভাবে চেষ্টা করলে হয়তো তাকে বাঁচানো যেতো। এই স্মৃতি বার বার ঘুরে ফিরে মনে পড়ে, আমাকে তাড়া করে বেড়ায়।’

মাকে নিয়ে ছেলে তালহার লেখা কবিতা লঞ্চডুবির ঘটনায় স্ত্রীর সঙ্গেই লঞ্চে ছিলেন আবু তাহের। চোখের সামনে মুহূর্তের মধ্যে সবকিছু ঘটে যায়। সেই বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, ‘টিচার্স ট্রেনিংয়ের একটা সার্টিফিকেট জমা দেওয়ার জন্য আমার স্ত্রী আমাকে নিয়ে মুন্সীগঞ্জের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। তবে যেতে আমার মন সায় দিচ্ছিল না। কিন্তু তার জন্য যেতে বাধ্য হয়েছি। লঞ্চে ওঠার ১০-১৫ মিনিটের মধ্যে পেছন থেকে কার্গো জাহাজটি আমাদের লঞ্চকে ধাক্কা দেয়। এতে একটু ঝাঁকুনি লাগলেও ইঞ্জিনের সামনে অবস্থান করায় টের পাইনি। পরে বুঝতে পেরে লঞ্চের পেছন দিকে গিয়ে বাঁচার চেষ্টা করি। ৫ থেকে ১০ সেকেন্ডের মধ্যে লঞ্চটি কাত হয়ে পানি উঠতে শুরু করে। আমি তাকে হাতে ধরে ঝাঁপ দেওয়ার প্রস্তুতি নেই। কিন্তু সে ভয় পেয়ে চিৎকার করে আমার হাত ছেড়ে দেয়। এ সময় মুহূর্তের মধ্যে পানিতে তলিয়ে যাই। তখন বার বার তার কাপড় ধরে টেনে বের করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু পারিনি। ভাগ্যক্রমে আমি বেঁচে ফিরেছি।’

স্ত্রীর ইচ্ছার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘২০১২ সালে আমি তাবলিগে যাই এবং ধর্মীয় রীতি-নীতিতে নিজেকে পরিবর্তন করি। আমার কথায় অনুপ্রাণিত হয়ে আমার স্ত্রীও পর্দা করা শুরু করে। ধর্মীয় নিয়ম-কানুন মেনে চলা শুরু করে। দুই সন্তানকে মাদ্রাসায় ভর্তি করিয়েছি, যাতে তারা আলেম হয়ে দ্বীন প্রচার করতে পারে। এটা আমাদের দু’জনের স্বপ্ন ছিল। আমাদের আরেকটা স্বপ্ন ছিল নিজেদের বাড়ি তৈরি করে সবাই একসঙ্গে থাকবো। কিন্তু এসব ইচ্ছা ও স্বপ্নগুলোর বাস্তবায়ন সে দেখে যেতে পারলো না।’ 

আবু তাহের জানান, এবার ঈদের জামাত শেষে পারিবারিক কবরস্থানে বাবা ও স্ত্রীর কবর জিয়ারত করবেন। সোনারগাঁয়ের বারদি নাটুয়াটি গ্রামে পারিবারিক কবরস্থানে তাদের সমাহিত করা হয়েছে। 

 

 

/টিটি/
সম্পর্কিত
সৈকতে জনসমুদ্র!
চিড়িয়াখানায় মানুষের ঢল
জঞ্জালের নগরে প্রাণ ভরানো সবুজের খোঁজে...
সর্বশেষ খবর
ইসরায়েলি বিমান হামলায় এক পরিবারের ১৩ শিশু নিহত
ইসরায়েলি বিমান হামলায় এক পরিবারের ১৩ শিশু নিহত
বোরো মৌসুমে ধান-চাল সংগ্রহের মূল্য নির্ধারণ
বোরো মৌসুমে ধান-চাল সংগ্রহের মূল্য নির্ধারণ
দুবাই পৌঁছেছে এমভি আবদুল্লাহ
দুবাই পৌঁছেছে এমভি আবদুল্লাহ
শ্রমবাজার ইস্যুতে মালয়েশিয়ার সঙ্গে বসতে চায় বাংলাদেশ
শ্রমবাজার ইস্যুতে মালয়েশিয়ার সঙ্গে বসতে চায় বাংলাদেশ
সর্বাধিক পঠিত
ফেসবুকে উসকানিমূলক পোস্ট, হিন্দু মহাজোট ‘নেতা’ পুলিশ হেফাজতে
ফেসবুকে উসকানিমূলক পোস্ট, হিন্দু মহাজোট ‘নেতা’ পুলিশ হেফাজতে
জানা গেলো বেইলি রোডে আগুনের ‘আসল কারণ’
জানা গেলো বেইলি রোডে আগুনের ‘আসল কারণ’
চট্টগ্রামে ভূমিকম্প, মাত্রা ৩ দশমিক ৭
চট্টগ্রামে ভূমিকম্প, মাত্রা ৩ দশমিক ৭
কেএনএফের গুলিতে সেনাসদস্য নিহত, কেঁদে কেঁদে স্ত্রী বললেন আমার ৩ সন্তানকে কে দেখবে?
কেএনএফের গুলিতে সেনাসদস্য নিহত, কেঁদে কেঁদে স্ত্রী বললেন আমার ৩ সন্তানকে কে দেখবে?
আজকের আবহাওয়া: ৩ বিভাগে বৃষ্টির আভাস
আজকের আবহাওয়া: ৩ বিভাগে বৃষ্টির আভাস