টাঙ্গাইল-আরিচা মহাসড়কের উন্নয়নকাজের জন্য কাটা হচ্ছে সড়কের পাশের দুই হাজার ৩৭৯টি গাছ। এর মধ্যে শতবর্ষী ফলদ-বনজসহ অনেক আম, জাম, কাঁঠাল, মেহগনি ও বটগাছ রয়েছে। ইতোমধ্যে বেশ কিছু গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। বাকিগুলো কাটা হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন পরিবেশবাদী ও স্থানীয়রা।
তারা বলছেন, একসঙ্গে এত গাছ কাটলে পরিবেশের ক্ষতি হবে। ফলে যতটা সম্ভব গাছগুলো রক্ষা করে কাজ করা দরকার। তা না হলে পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়বে। তার ফল ভোগ করতে হবে আমাদের।
সড়ক ও জনপথ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, মানিকগঞ্জের বরাংগাইল থেকে টাঙ্গাইল শহর পর্যন্ত ৫৯ দশমিক ৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ মহাসড়কের উন্নয়নকরণ প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। এর মধ্যে টাঙ্গাইল অংশে পড়েছে ৪০ কিলোমিটার এবং মানিকগঞ্জ অংশে ১৮ দশমিক ৫০ কিলোমিটার। প্রকল্পের আওতায় সড়কটি ১৮ ফুট থেকে বাড়িয়ে ৩৪ ফুট প্রশস্ত করা হবে। প্রকল্প বাস্তবায়নে ভূমি অধিগ্রহণসহ ব্যয় ধরা হয়েছে এক হাজার ৬৩৫ কোটি টাকা। মহাসড়কটি ময়মনসিংহ ও ঢাকা বিভাগের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করছে। ২০২১ সালের ২৩ নভেম্বর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটি অনুমোদন হয়।
সরেজমিনে দেখা গেছে, কাগমারী সেতু এলাকায় দুটি বটগাছ কাটা হয়েছে। সেইসঙ্গে আশপাশের আম, জাম, কাঁঠাল, কড়ই ও মেহগনি গাছ কাটা হচ্ছে।
পরিবেশকর্মী ও স্থানীয়রা জানান, পুরনো গাছগুলো কাটার কারণে পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। গাছগুলো দেখতে অনেক সুন্দর। পথচারী ও স্থানীয়রা গাছতলায় বসে প্রশান্তি পেতেন। পরিবেশ রক্ষায় গাছগুলো রক্ষা করা জরুরি।
স্থানীয় পরিবেশকর্মী নওশাদ রানা সানভী বলেন, ‘গাছগুলো ছায়া দিতো, ফল দিতো। বর্তমানে তাপমাত্রা অনেক, এক মিনিটও রাস্তায় দাঁড়ানো যায় না। শতবর্ষী গাছগুলো কাটা হচ্ছে। অথচ বলা হচ্ছে, গাছ লাগান পরিবেশ বাঁচান। এটি শুধু স্লোগানই দেন সংশ্লিষ্টরা। বাস্তবে গাছ লাগানোর পরিবর্তে কাটা হচ্ছে বেশি।’
গাছগুলো রক্ষার দাবিতে আন্দোলন করবেন বলে জানিয়েছেন পরিবেশবাদী সংগঠন সবুজ পৃথিবীর সাধারণ সম্পাদক শহীদ মাহমুদ। তিনি বলেন, ‘সড়ক ও জনপথ বিভাগের কর্মকর্তারা চাইলে অধিকাংশ গাছ রক্ষা করতে পারতেন। কিন্তু তা না করে তারা গাছগুলো কেটে ফেলছেন।’
এভাবে গাছ কাটলে পরিবেশ ধ্বংস হবে বলে জানালেন মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী রেজিস্ট্রার আজাদ খান ভাসানী। তিনি বলেন, ‘সম্প্রতি গাছ কাটা, খাল-বিল ও পুকুর ভরাটের মহোৎসব চলছে। উত্তরের মরুকরণ কোন পর্যায়ে চলে গেছে—তা প্রকৃতির বিরূপ আচরণ দেখলে বোঝা যায়। যে গাছগুলো কাটা হচ্ছে সেগুলো আগামী ১০০ বছরেও লাগাতে পারবো না আমরা। প্রকৃতির যে পরিমাণ ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে, তার তুলনায় আমাদের উন্নয়ন কিন্তু নগণ্য। ভবিষ্যত প্রজন্ম শতবর্ষী এই গাছগুলো আর দেখতে পাবে না। পরিবেশের স্বার্থে ভবিষ্যতে কোনো উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নিলে যাতে গাছ রেখেই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা যায়, সে উদ্যোগ নিতে হবে সংশ্লিষ্টদের। না হয় এভাবে একদিন পরিবেশ ধ্বংস হয়ে যাবে; সেইসঙ্গে আমরাও।’
টাঙ্গাইল সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আলিউল হোসেন বলেন, ‘মহাসড়ক প্রশস্তকরণের কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। এ জন্য গাছগুলো কাটা হচ্ছে। বৃক্ষপালন বিভাগ ইতোমধ্যে টেন্ডারের মাধ্যমে গাছগুলো বিক্রি করেছে।’
সড়ক ও জনপথ বিভাগের বৃক্ষপালন বিভাগের নির্বাহী কর্মকর্তা মীর মুকুট আবু সাইদ বলেন, ‘মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় দেলদুয়ার-লাউহাটি-সাটুরিয়া সড়কে কাটা হচ্ছে এক হাজার ৩৭০টি গাছ। এগুলোর জরিপ মূল্য ধরা হয়েছিল ১৬ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। আর টেন্ডারের মাধ্যমে বিক্রি হয়েছে ২১ লাখ ৬০ হাজার টাকা। এ ছাড়া একই প্রকল্পের আওতায় আরিচা-ঘিওর-দৌলতপুর-নাগরপুর সড়কে কাটা হচ্ছে এক হাজার ৯টি গাছ। এগুলোর জরিপ মূল্য ধরা হয়েছিল ১৯ লাখ ৯৫ হাজার টাকা। টেন্ডারের মাধ্যমে বিক্রি হয়েছে ২৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা।’
গাছগুলো রেখে সড়ক করা যেতো কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘মহাসড়ক প্রশস্ত করার পর পুনরায় দুই পাশে গাছ লাগানো হবে।’









