নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন মেয়রের ৫ বছর মেয়াদ শেষ হবে আগামী অক্টোবরে। অনেক সময় বাকি থাকলেও এখন থেকেই শুরু হয়ে গেছে প্রার্থী খোঁজা। ইতোমধ্যে বর্তমান মেয়র ডা.সেলিনা হায়াত আইভীকে বাদ দিয়ে নতুন মেয়রের খোঁজ শুরু করে দিয়েছে গত নির্বাচনে আইভীর সঙ্গে লাখো ভোটে পরাজিত নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য শামীম ওসমান ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা।
আগামী ১৬ মার্চ সিটি করপোরেশনের নগর ভবনের সামনে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা সমাবেশ করবেন। সেখানে আগামী প্রার্থী ঘোষণা করে তা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অবহিত করা হবে বলে ইতোমধ্যে জানানো হয়েছে। এদিকে, স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতারাও বলছেন, ‘আমরা নতুন মেয়র চাই।’
বর্তমান মেয়র ডা. সেলিনা হায়াত আইভী আগামীতে নির্বাচনে অংশ নেবেন কিনা কিংবা মনোনয়ন চাইবেন কিনা সেটা নিয়ে এখনও রয়েছে ধোঁয়াশা। তবে আইভী বলছেন,এখন উন্নয়নের কাজেই বেশি মনোনিবেশ করতে চাই।
এ অবস্থায় ১৬ মার্চ কাকে প্রার্থী ঘোষণা করা হবে সেটা নিয়ে অনেক প্রশ্ন থাকলেও আপাতত মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি আনোয়ার হোসেনকেই ভাবছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে এখনই নির্বাচনের প্রার্থী ঘোষণার পেছনেও ‘অদূরদর্শিতা’ রয়েছে বলে মনে করছেন আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী। তারা বলছেন, এখনই প্রার্থী ঘোষণা আইভীর অবস্থানকে নড়বড়ে নয় বরং পোক্ত করতে পারে।
অন্যদিকে, ২৫ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে নারায়ণগঞ্জের সাতটি প্রকল্প উদ্বোধনের সময় মেয়র আইভী প্রধানমন্ত্রীকে বলেছিলেন, ‘আমি আপনার পথে আদর্শিত হয়ে আপনার উন্নয়নের অগ্রযাত্রার পথিক হয়ে আপনার সহযোদ্ধা হতে চাই। আশাকরি আপনি আমাকে সেই সুযোগটা দেবেন।’
মেয়র আইভীর বক্তব্যের প্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আইভী একমাত্র নারী মেয়র। সবসময় আমার সহযোগিতা পাবে।
ওই অনুষ্ঠানের একদিন পর শুক্রবার শহরের ২নং রেলগেট এলাকায় প্রয়াত জেলা আওয়ামী লীগ নেতা মফিজুল ইসলামের স্মরণে আলোচনা সভায় নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের এমপি শামীম ওসমান বলেন, ‘আগামী ১৬ মার্চ নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন ভবনের সামনে জনসভা করা হবে। ওইদিন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনে কে হবেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী তা ঘোষণা করা হবে। আমার মাতৃতুল্য নেত্রী শেখ হাসিনা আমাদের সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে সেই প্রার্থীকেই আগামী সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকে মনোনীত করবেন। আর সেই প্রার্থীকেই নারায়ণগঞ্জবাসী নির্বাচিত করবেন। ১৬ তারিখে সেই রায় দিবো আমরা, ডিক্লেয়ার দিলাম পারলে ট্রাই করেন কোনও লাভ হবে না।’
শামীম ওসমানের বক্তব্যে অনেকটা স্পষ্ট হয়ে গেছে আনোয়ার হোসেনকেই প্রার্থী হিসেবে আগামী ১৬ মার্চ ঘোষণা করা হতে পারে। শুক্রবার তিনি আনোয়ার হোসেনের অনেক গুণকীর্তনও করেছেন।
এ ব্যাপারে নারায়ণগঞ্জ মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি আনোয়ার হোসেন বলেন, নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের উপনির্বাচন নিয়ে আমার বাসায় যখন শামীম ওসমান ঐক্য ডাক দিয়েছিল তখন নেতাকর্মীদের সম্মতিক্রমে উত্তর-দক্ষিণ মেরুর বিরোধকে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে মিটিয়ে একত্রে চলছে রাজনীতি।
তিনি আরও বলেন, আমরা নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের নতুন মেয়র চাই। সেজন্য মহানগর আওয়ামী লীগের সব নেতাকর্মীদের সাহসী ও শক্তিশালী করতে হবে।
মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট খোকন সাহা জানান, আগামী ১৬ মার্চ জনসভায় কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের নেতারা তো থাকবেনই পাশাপাশি দুই-তিন মন্ত্রীকে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে।
মহানগর আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি চন্দন শীল বলেন, নারায়ণগঞ্জবাসীর উন্নয়ন ও আধুনিক সেবার লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নারায়ণগঞ্জ পৌরসভাকে সিটি করপোরেশনে রূপান্তর করেছিলেন। কিন্তু বর্তমান সিটি কর্তৃপক্ষ জনসাধারণের কোনও সেবা দিতে পারেনি। তিনি কী সেবা জনগণকে দিয়েছেন তা নিয়ে প্রশ্ন জেগেছে।
এদিকে, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াত আইভী বলেন, আমি এখন উন্নয়নের দিকেই বেশি মনোনিবেশ করছি। আওয়ামী লীগ একটি বড় দল। আর এই দলে নেতৃত্বেও প্রতিযোগিতা থাকতেই পারে। তাই আনোয়ার চাচা দলীয় মনোনয়ন চাইতেই পারেন। আমি বিশ্বাস করি, বিগত দিনে আমি যে কাজ করেছি এবং জনগণ যে আমার পাশে রয়েছে সেটা আওয়ামী লীগের সর্বোচ্চ পর্যায়ে জানে। স্বয়ং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এসব বিষয়ে খোঁজ-খবর রেখেছেন। আগামী দিনেও আমাকে তিনি সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। তাই আগামী নির্বাচনে দল আমাকেই মনোনয়ন দেবে ইনশাল্লাহ। কারণ ষড়যন্ত্রকারীরা সবসময়ই দুর্বল।
উল্লেখ্য, ২০১১ সালের ৩০ অক্টোবর নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সমর্থন পেয়েও শামীম ওসমান এক লাখ ভোটেরও বেশি ব্যবধানে পরাজিত হয়েছিলেন আইভীর কাছে। তখন থেকে তাদের বিরোধ প্রকট আকারে রূপ নেয়। এর মধ্যে ২০১৩ সালে মেধাবী ছাত্র তানভীর মুহাম্মদ ত্বকীর মৃত্যুর পর ওসমান পরিবারকে দায়ী করে আইভীর কড়া বক্তব্যের পর বিরোধ আরও বাড়ে। এর মধ্যে যুবলীগ নেতা জহিরুল ইসলাম পারভেজ গুমের ঘটনায় আইভীর ভাই নগর যুবলীগের সেক্রেটারি আহাম্মদ আলী রেজা উজ্জলসহ চুনকা পরিবারের কয়েকজনকে আসামি করে মামলা এবং গ্রেফতার হওয়ার পর বিরোধ দিন দিন বাড়তে থাকে। ২০১৪ সালের ৩০ এপ্রিল এমপি নাসিম ওসমানের মৃত্যুর পর ওই বছরের ৬ জুন উপনির্বাচনে সেলিম ওসমান প্রার্থী হলে আইভীর সঙ্গে থাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি আনোয়ার হোসেন, জেলা কৃষকলীগের সেক্রেটারি রোকনউদ্দিনসহ অনেকেই সেলিম ওসমানের পক্ষে চলে যান।
/বিটি/এএইচ/আপ-এআর/








