ভাওয়াল বনাঞ্চলে আগুন দেয় কারা? অস্তিত্ব সংকটে জীববৈচিত্র্য

রায়হানুল ইসলাম আকন্দ, গাজীপুর
১৪ মার্চ ২০২৬, ২৩:০৫আপডেট : ১৪ মার্চ ২০২৬, ২৩:০৫

গাজীপুরের ভাওয়ালের বিস্তীর্ণ গজারি বন এলাকায় প্রতি বছর আগুনে পুড়ে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন বন্য প্রাণী ও উদ্ভিদ। বাগান পরিষ্কার, অব্যবস্থাপনা কিংবা অসতর্কতার ফলে ছড়িয়ে পড়া আগুন গ্রাস করছে শাল গজারি বনের জীববৈচিত্র্য। আগুনে সরীসৃপ, পাখি, ক্ষুদ্র স্তন্যপায়ী প্রাণী থেকে শুরু করে অগণিত কীটপতঙ্গ পুড়ে মারা যাচ্ছে। ধ্বংস হচ্ছে পাখির ডিম, নতুন চারা ও ঔষধি গাছ। অস্তিত্ব সংকটে পড়ছে জীববৈচিত্র্য।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গাজীপুরে প্রায় ৬৫ হাজার একর বনভূমি রয়েছে। জেলার ভাওয়াল, কালিয়াকৈর, শ্রীপুর, রাজেন্দ্রপুর ও কাঁচিঘাটা রেঞ্জ অফিসের মাধ্যমে বনভূমিগুলো দেখাশোনা করা হয়।

বন বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, দুষ্কৃতকারী এবং মাদকসেবীরা বনের ভেতর বসে মাদক সেবন করে। যাওয়ার সময় তারা সিগারেট বা বিড়ির শেষ অংশ জঙ্গলে ফেলে যায়। তা থেকেও বনে আগুন লাগতে পারে। বনের আশপাশের জমির মালিকেরা তাদের জমির সীমানা বাড়ানোর জন্যও বাগান পরিষ্কাররের অজুহাতে বনে আগুন লাগাতে পারে।

এদিকে, এক শ্রেণির বনখেকো রাতের আঁধারে বন থেকে গজারি গাছ কেটে বিক্রি করছে। সম্প্রতি শ্রীপুর উপজেলার কাওরাইদ ইউনিয়নে বলদীঘাট বিটের আওয়াতাধীন গালদাপাড়া গ্রামের গজারি বন থেকে রাতের আঁধারে গজারি গাছ কেটে নিয়ে যাচ্ছিল বনখেকোরা। গোপন সংবাদে রাতেই গ্রামবাসী গজারি গাছ আটক করে বন কর্মকর্তাদের খবর দিলে বিট অফিসার ও রেঞ্জ কর্মকর্তা গাছগুলো জব্দ করেন।

স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এখন চলছে ফাল্গুন মাস এবং শুষ্ক মৌসুম। প্রতি বছর এ মৌসুম এলেই শাল গজারি বনে আগুনের আতঙ্ক শুরু হয়। দুষ্কৃতকারীরা মাঝেমধ্যে আগুন ধরিয়ে দেয়। বিভিন্ন প্রজাতির দেশীয় গাছ, ঔষধি উদ্ভিদ ও বিরল প্রজাতির লতা-গুল্ম রয়েছে গজারি বনে। আগুনে এসব উদ্ভিদ পুড়ে গেলে শুধু বর্তমান প্রজন্ম নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মও বঞ্চিত হবে। বিভিন্ন ভেষজ গাছের চারা আগুনে নষ্ট হয়। আগুন বনাঞ্চল, ঝোপঝাড় ও প্রাকৃতিক উদ্ভিদ বিন্যাসে ছড়িয়ে পড়লে মাটির উপরে ও নিচে বসবাসকারী প্রাণীরা পালানোর সুযোগ পায় না।

ভাওয়াল বনাঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে আগুন, অস্তিত্ব সংকটে জীববৈচিত্র্য

তারা বলছেন, গাছপালা পুড়ে যাওয়ায় বনাঞ্চলের ছায়া কমে, ফলে মাটির আদ্রতা হ্রাস পায়। এতে নতুন চারা জন্মানোর পরিবেশ নষ্ট হয়। আগুনের পরবর্তী সময়ে বৃষ্টিপাত হলে মাটির ওপরের উর্বর স্তর ধুয়ে নেমে যায়। বাড়ে ভূমি ক্ষয়ের ঝুঁকি। মাটিতে বসবাসকারী সাপ, ব্যাঙ, টিকটিকি, গিরগিটি এবং অসংখ্য পোকামাকড় আগুনে পুড়ে মারা যায়। বিশেষ করে ডিম পাড়া মৌসুমে আগুন লাগলে পাখির বাসা ও ডিম সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়। ঘুঘু, শালিকসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখির প্রজননচক্র ব্যাহত হয়।

উপজেলার গোসিংগা ইউনিয়নের কর্ণপুর গ্রামের বাসিন্দা আমজাদ হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বাগান পরিষ্কারের নামেও আগুন দেওয়া হয়। শুকনো পাতা ও আগাছা দ্রুত সরাতে আগুনকে সহজ পদ্ধতি হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু এই এলাকায় শুষ্ক মৌসুমে বাতাসের গতি বেশি থাকায় ছোট আগুনও দ্রুত বড় আকার ধারণ করে। এতে প্রাকৃতিক বনাঞ্চল ও ঝোপঝাড়ে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। এ ধরনের আগুনে শুধু প্রাণী নয়, উর্বর মাটির ওপরের স্তরও পুড়ে যায়। মাটির জৈব উপাদান, কেঁচো ও অণুজীব ধ্বংস হয়ে মাটির উর্বরতা কমে যায়। ফলে দীর্ঘ মেয়াদে কৃষি উৎপাদনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রাণী ও উদ্ভিদের এই ব্যাপক ক্ষতি পুরো খাদ্যশৃঙ্খলকে প্রভাবিত করে। পোকামাকড় কমে গেলে সেগুলো খেয়ে বেঁচে থাকা পাখি ও ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণীর খাদ্য সংকট দেখা দেয়। একইভাবে ছোট প্রাণী কমে গেলে বড় শিকারি প্রাণীর টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে পুরো বাস্তুতন্ত্র অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে।’

এ বিষয়ে নদী ও প্রকৃতি ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান (পরিবশে বিষয়ক সংগঠন) খোরশেদ আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বনের ভেতর আগুন পরিকল্পিত। একসঙ্গে একাধিক জায়গায় আগুন লাগা পরিকল্পিত। আগুনে বন শেষ করার পাশাপাশি বন্যপ্রাণী, কীটপতঙ্গ মারা যায়। নতুন চারা শেষ করে দিচ্ছে। আমাদের সংরক্ষিত বনাঞ্চলগুলোতে আগুন দেওয়ার ফলে সেখানকার জীববৈচিত্র্য, প্রাণ-প্রকৃতি বড় ধরনের প্রভাবের মুখে পড়ছে। ভাওয়ালের গজারি বনে এখন জীববৈচিত্র্য ও বন্যপ্রাণী নেই বললেই চলে। সামাজিকভাবে সচেতনতা তৈরি করা গেলে বিশেষ করে বনাঞ্চলের আশপাশে বসবাসকারী বাসিন্দা, গ্রামবাসী এবং বিভিন্ন পেশার লোকজন নিয়ে সচেতনতামূলক মতবিনিময় সভা বা কার্যক্রম পরিচালনা করলে এসব ক্ষতিকর কাজ থেকে বিরত থাকতে পারে তারা। শাল-গজারি বনে আগুন লাগানো বন্ধ হলেই জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা সম্ভব হবে। কমিউনিটি সাপোর্ট গ্রুপ তৈরি করে বন রক্ষা করতে হবে। সরকার এবং বিভিন্ন সংগঠনের মাধ্যমে প্রাণীর বিলুপ্তি রোধে কাজ করা হবে। জীববৈচিত্র্য টিকিয়ে রাখতে হলে এখনই সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। বন বাঁচাতে হলে বন বিভাগের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের নজরদারিও বাড়াতে হবে।’

কাওরাইদ ইউনিয়নে বলদীঘাট বিটের আওয়াতাধীন গালদাপাড়া গ্রামের গজারি বন থেকে রাতের আঁধারে গজারি গাছ কেটে নিয়ে যাচ্ছিল বনখেকোরা

গাজীপুর পরিবেশ অধিদফতরের উপপরিচালক আরেফিন বাদল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গাছপালা ধ্বংস হলে পরিবশে থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ কমে যায়। অক্সিজেনে পরিমাণ বৃদ্ধি করে। গাছ পুড়িয়ে ফেললে কার্বন ডাই-অক্সাইড পরিবেশে উন্মুক্ত হয়ে যায়। তখন আগের মতোই পরিবেশ দূষণ হয় এবং চলমান পরিবশে থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে সেই শোষণ আর করতে পারতেছে না। এতে কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে। এ ধরনের দূষণ হলে পরিবশ শান্ত থাকবে না। একই সঙ্গে যেখানে গাছপালা পুড়িয়ে দেয় সেখানে জীবজন্তুর বসবাস আছে। প্রতি বছর শুষ্ক মৌসুমে শাল-গজারি বনে আগুন দেওয়ার ফলে গাছপালা, জীববৈচিত্র্য, প্রাণী এবং মাটিসহ সবকিছুর ক্ষতি হয়। অনিয়ন্ত্রিত আগুনের কারণে পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন প্রজাতির গাছপালা ও প্রাণী।’

বন বিভাগের শ্রীপুরের রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. মোখলেসুর রহমান বলেন, ‘আমাদের পক্ষ থেকে আগুন ধরানোর কোনও নিয়ম নেই। মাদকসেবীরা বনে মাদক সেবন করে তখন হয়তো আগুন ধরে যায়। আরেকটা কারণ হতে পারে বনের আশপাশের জমির মালিকরা জমির সীমানা বাড়ানোর জন্য এই কাজ করতে পারে। বনে আগুন না দেওয়ার জন্য আমরা মাইকিং করি। স্থানীয় বাসিন্দাদের বুঝিয়ে থাকি। বনে আগুন দেওয়ার খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা টিম পাঠিয়ে নিভাই। এ কাজে সাংবাদিকরা ও সহযোগিতা করে থাকেন। তবে, বনে আগুন না দেওয়ার বিষয়ে আমাদের সামাজিক সচেতনতা আরও বাড়ানো প্রয়োজন।’

ঢাকা বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এম কে এম ইকবাল হোসেন চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মূলত দুষ্কৃতকারীরা আগুন দেয়। আমরা সবসময় সতর্ক থাকি যেন শুষ্ক মৌসুমে আগুনে কোনও ক্ষয়ক্ষতি না হয়। বন ধ্বংস করে যদি খালি জায়গা তৈরি করা যায়, তখন খালি জায়গা দখল করে ঘরবাড়ি তৈরি করতে পারবে বলে মনে একশ্রেণির লোকজন। আমরা সব সময় তাদের পেছনে লেগে থাকি এবং বনের ভেতরেও ফায়ার লাইন টানানো আছে, যাতে কোনও ক্ষয়ক্ষতি না হতে পারে। সেইসঙ্গে দুর্বৃত্তদের ধরার চেষ্টাও অব্যাহত আছে।’

/এএম/ 
সম্পর্কিত
কালশী বস্তিতে আগুন: একটি ঝগড়ার জেরে পথে শতাধিক পরিবার
দিল্লির অগ্নিকাণ্ডে ৫ বাংলাদেশি আহত
দিল্লির রেস্তোরাঁয় ভয়াবহ আগুন, বিদেশি নাগরিকসহ নিহত ২১
সর্বশেষ খবর
ত্রিমুখী তদন্তের ‍মুখে বেবিচকের প্রকৌশলী শরিফুল
ত্রিমুখী তদন্তের ‍মুখে বেবিচকের প্রকৌশলী শরিফুল
শিশুর হাতে স্মার্টফোন: আশীর্বাদ না অভিশাপ? 
শিশুর হাতে স্মার্টফোন: আশীর্বাদ না অভিশাপ? 
পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে কিমের বড় ঘোষণা
পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে কিমের বড় ঘোষণা
শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর হত্যা, রায় রবিবার
শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর হত্যা, রায় রবিবার
সর্বাধিক পঠিত
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
তৃতীয় বিয়ের পিঁড়িতে বসতে যাচ্ছেন আমির খান
তৃতীয় বিয়ের পিঁড়িতে বসতে যাচ্ছেন আমির খান