জীবন সায়াহ্নে এসে যৌবনের সেই ‘ভুল’ আর সইতে পারলেন না মফিজুল ইসলাম (৬৫)। ১৯৭৭ সাল থেকে ৩-৪ বছর ব্যবসার প্রয়োজনে বহুবার বিনা টিকিটে ট্রেনে ভ্রমণ করেছিলেন তিনি। সেই বকেয়া পাওনা মেটাতে দীর্ঘ ৪৮ বছর পর রেলওয়ের সরকারি কোষাগারে জমা দিলেন ২০ হাজার টাকা। বুধবার (১ এপ্রিল) গাজীপুরের শ্রীপুর রেলওয়ে স্টেশনে গিয়ে তিনি এই অর্থ পরিশোধ করে দায়মুক্ত হন।
অনুশোচনা থেকে মুক্তি
মফিজুল ইসলাম শ্রীপুর পৌরসভার চন্নাপাড়া এলাকার আব্দুল মান্নান বেপারির ছেলে। বর্তমানে তিনি স্থানীয় একটি মহিলা মাদ্রাসা পরিচালনা করছেন।
মফিজুল ইসলাম তার অনুভূতির কথা জানাতে গিয়ে বলেন, “১৯৭৭ সালের দিকে ব্যবসার কাজে যখন ঢাকা যেতাম, তখন টিকিট কাটলেও সেটার কোনও মূল্যায়ন হতো না। জিআরপি পুলিশকে ১ টাকা করে দিতে হতো। এভাবে টানা ৩-৪ বছর আমি যাতায়াত করেছি। টিকিট কাটলেও পুলিশকে টাকা দিতে হতো, না কাটলেও দিতে হতো। ওই ১ টাকা পুলিশের পকেটে গেলেও রেলওয়ে তার ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।”
তিনি বলেন, “এখন বয়স হয়েছে, পরকালের চিন্তা মাথায় আসায় সব সময় মনে হতো—রেলওয়ে আমার কাছে টাকা পাবে। সেই পুরনো স্মৃতিগুলো আমাকে সারাক্ষণ অনুশোচনায় দগ্ধ করত। বারবার মনে হতো, এই ঋণ আমি কীভাবে শোধ করব? এরপর আমি শ্রীপুর স্টেশন মাস্টারের কাছে গিয়ে ২০ হাজার টাকার টিকিট চাইলাম। বর্তমানের ৬০ টাকা মূল্যের টিকিট হিসেবে ৩৩৩টি টিকিটের দাম হয় ২০ হাজার টাকা।”
তার ভাষ্যমতে, শুরুতে মাস্টার সাহেব জানালেন, এত টিকিট স্টকে নেই। আমি জেদ ধরেছিলাম টিকিটই নেবো এবং সেগুলো ছিঁড়ে ফেলে দেবয়ো। কিন্তু তিনি আমাকে বুঝিয়ে বললেন, ‘এই টিকিট দিলে আপনি তো আর ভ্রমণ করবেন না, বরং এগুলো আমরা অন্যদের কাছে বিক্রি করতে পারবো। তার চেয়ে বরং আপনি ক্যাশ মেমোর মাধ্যমে বকেয়া হিসেবে টাকাটা জমা দিন, যা সরাসরি রেলওয়ের কোষাগারে চলে যাবে।’
মফিজুল ইসলাম বলেন, “তার কথামতো ২০ হাজার টাকা জমা দিয়ে আমি রশিদ নিয়েছি। এখন মনে হচ্ছে বড় এক বোঝা নেমে গেলো, ভেতরে একটা শান্তি লাগছে। আমি জানি না এই সামান্য অর্থে আমার সব ঋণ শোধ হবে কি না, তবে তখনকার ১ টাকার বদলে বর্তমানের ৬০ টাকা হিসেবে আমি পুরো টাকাটাই দেওয়ার চেষ্টা করেছি। দেরি করে দেওয়ার জন্য আল্লাহর কাছে মাফ চাই। এখন আমি দায়মুক্ত, আলহামদুলিল্লাহ।”
যেভাবে টাকা জমা হলো
শ্রীপুর রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার সাইদুর রহমান জানান, মফিজুল ইসলাম কতবার বিনা টিকিটে ভ্রমণ করেছেন তার নির্দিষ্ট হিসাব নেই। তাই একটি আনুমানিক হিসেব করে ২০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়। শুরুতে মফিজুল ইসলাম এই সমমূল্যের টিকিট কিনে ছিঁড়ে ফেলতে চেয়েছিলেন। কিন্তু একসঙ্গে এত টিকিট স্টকে না থাকায় এবং কারিগরি কারণে স্টেশন মাস্টার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরে ১ এপ্রিল বিশেষ মানি রিসিটের মাধ্যমে ২০ হাজার টাকা গ্রহণ করা হয় এবং গতকাল সোমবার (৬ এপ্রিল) সেই অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়া হয়।
স্টেশন মাস্টারের প্রশংসা
ব্যতিক্রমী এই ঘটনাকে সাধুবাদ জানিয়ে স্টেশন মাস্টার সাইদুর রহমান তার ফেসবুক পেজে একটি পোস্ট দিলে বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়। তিনি বলেন, “মফিজুল ইসলাম যে সচেতনতা ও সততার পরিচয় দিলেন, তা দৃষ্টান্তমূলক। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে টিকিট কেটে ভ্রমণের সচেতনতা বাড়বে বলে আমরা আশা করি।”









