নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে গাজী টায়ার কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার দুই বছর অতিবাহিত হলেও নিখোঁজ ১৮২ জনের সন্ধান এখনও মেলেনি। পুলিশ বলছে, নিখোঁজদের সবাই মারা গেছেন। আগুনে দগ্ধ হয়ে তাদের শরীর ছাই হয়ে গেছে। তবে নিখোঁজের স্বজনরা দাবি করছেন, এখনও তাদের নিখোঁজ স্বজনরা জীবিত আছেন। ফলে এখনও আশায় অপেক্ষার প্রহর গুনছেন তারা।
জানা গেছে, ২০২৪ সালের ২৫ আগস্ট নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে গাজী টায়ার কারখানায় অগ্নিকাণ্ড ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। ভবনটিতে ২১ ঘণ্টা ধরে আগুন জ্বলার ফলে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ফলে ভবনের ভেতরে উদ্ধার অভিযান চালায়নি কর্তৃপক্ষ। তবে ১৫ খণ্ড হাড় পাওয়া গেছে। ওই বছরের ১২ সেপ্টেম্বর গাজী টায়ার কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় তদন্ত প্রতিবেদন দিয়েছে ৮ সদস্যের তদন্ত কমিটি। সেখানে বলা হয়েছে, ১৮২ জন নিখোঁজ রয়েছেন। সেই নিখোঁজদের তালিকা ধরে পুলিশ তদন্ত শুরু করে। সবশেষ পুলিশ জানিয়েছে, নিখোঁজদের সবাই মারা গেছে।
এদিকে এ ঘটনার দুই বছর পর নিখোঁজ ব্যক্তিদের স্বজনরা বলছেন, নিখোঁজরা এখনও বেঁচে আছে। আর যদি তারা মারা গিয়ে থাকে তাহলে লাশ-কিংবা শরীরের হাড়-গোড় কোথায়?
অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় মোবাইল মেকার ফয়সাল নিখোঁজ আছেন। ফয়সালের বাবা কবির হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিভিন্ন ব্যক্তি ফোন করে জানিয়েছে, আমার সন্তান জীবিত আছে। আর যদি আমার ছেলেসহ এতগুলো মানুষ মারা গিয়ে থাকে, তাহলে এদের হাড়-গোড় কোথায় গেলো। এতগুলো মানুষের কাপড় ও জুতা পুড়ে সব কী ভ্যানিস হয়ে গেলো? তাহলে এগুলো কোথায় গেলো? আর যদি এসব মানুষ জীবিত থাকে সেটাও আমাদের বলুক। কিন্তু দুই বছর ধরে কীভাবে এতগুলো মানুষ নিখোঁজ থাকে? সন্তানের চিন্তায় কাঁদতে কাঁদতে আমাদের চোখের পানিও শুকিয়ে গেছে। আর কোথায় গেলে- কার কাছে অভিযোগ করলে সন্তানের সন্ধান পাবো তা ভাবতে পারছি না।’
নিখোঁজ মাদ্রাসাছাত্র রাকিবের বাবা মজিবর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দীর্ঘ দুই বছরেও আমার সন্তানের সন্ধান দিতে পারেনি পুলিশ-প্রশাসন। তারা কীভাবে সন্ধান দেবে, অগ্নিকাণ্ডের সময় কাভার্ডভ্যানে-ট্রাকে করে কারখানা থেকে অনেক মানুষ নিয়ে গেছে। সেসব মানুষ কোথায় নিয়ে গেছে তা কারও জানা নেই। সেই খোঁজ পেলে আমার সন্তানের সন্ধানও পাওয়া যাবে।’
নিখোঁজরা জীবিত রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এ ঘটনায় পুলিশ বলছে, আমাদের সন্তানরা মারা গেছে। কিন্তু অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় নিখোঁজদের অনেকের মোবাইল ফোন দীর্ঘদিন সচল ছিল। সেসব নম্বরে ফোন দিলে রিসিভ করতো, কিন্তু কেউ কথা বলতো না। এ ছাড়া বেশ কয়েকটি অচেনা নম্বর থেকে ফোন করে আমাদের সন্তানরা জীবিত রয়েছে বলে আমাদের জানিয়েছেন। নিখোঁজদের কোনও একটি নিরিবিলি স্থানে রাখা হয়েছে। এসব বিষয়ে পুলিশ-প্রশাসনের কাছে একাধিকবার গিয়েছি। এখন আমরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে এ বিষয়ে যাবো, তদন্ত করে আমাদের সন্তানদের খুঁজে বের করার অনুরোধ করবো।’
নিখোঁজ আমানুল্লাহর মা রাশিদা বেগম বলেন, ‘দীর্ঘ দিন আগে এক ব্যক্তি আমাদের কাছে ফোন করে জানায়, আমার ছেলেসহ নিখোঁজ সবাই বেঁচে আছে। ফোন করে এক ব্যক্তি সে তথ্য জানিয়েছে। আমার ছেলের আকার ও গায়ের রঙ বলেছে। ফোনে আমার ছেলের কান্নার শব্দ পেয়েছি। তবে কোথায় তাদের রাখা হয়েছে তা জানা নেই। এ বিষয়ে পুলিশ-প্রশাসনকে জানিয়েছি। কিন্তু এখনও কেউ সন্ধান দিতে পারেনি।’
নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক রায়হান কবির বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নিখোঁজের স্বজনরা আমার কাছেও এসেছিল। কিন্তু এটা নিয়ে পুলিশ তদন্ত করেছে। এরপরও স্থানীয় সংসদ সদস্যসহ সংশ্লিষ্টদের নিয়ে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’
নিখোঁজরা সবাই মারা গেছে উল্লেখ করে নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও অপারেশন) তারেক আল মেহেদী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গাজী টায়ার কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় নিখোঁজ ১৮২ জন মারা গেছে। তাদের আর কেউ বেঁচে নেই। কারখানায় লাগা আগুনের অতিরিক্ত তাপে দগ্ধ হয়ে সবাই মারা গেছে। তাদের শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। সেখানে যারা আটকা পড়েছে তারা কেউ জীবিত বের হতে পারেনি।’
উদ্ধার হওয়া ১৫ খণ্ড হাড়-গোড়ের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘উদ্ধার হওয়া এসব হাড় আদালতের মাধ্যমে সিআইডিতে পাঠিয়েছি এবং সংরক্ষণ করা হয়েছে। কোনও নিখোঁজ ব্যক্তির স্বজনরা ডিএনএ শনাক্ত করতে চাইলে তা পরীক্ষা করা হবে।’
অজ্ঞাত ব্যক্তির ফোন থেকে নিখোঁজদের জীবিত থাকার খবরে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে নিখোঁজের স্বজনরা আমাদের তাৎক্ষণিক কিছু জানায়নি। এ ঘটনার এক থেকে দেড় মাস পর আমাদের জানিয়েছে। ফলে আমরা তাদের সন্ধান করতে পারিনি। তবে আমাদের ধারণা, কোনও প্রতারক চক্র ফোন করে তাদের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে ও নিখোঁজের পরিবারের সদস্যদের আশার বাণী শোনাচ্ছে।’
নিখোঁজদের জীবিত থাকা নিয়ে স্বজনদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে তিনি বলেন, ‘স্বজনদের মধ্যে এক ধরনের আবেগ কাজ করে- হয়তো কোনোভাবে যদি তার প্রিয়জন বেঁচে থাকে। সেই আশা নিয়ে অনেকে অনেক ধরনের কথা বলতে পারে, তবে বাস্তবতা ভিন্ন।’
প্রসঙ্গত, ২০২৪ সালের ২৫ আগস্ট নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে গাজী টায়ার কারখানায় অগ্নিকাণ্ড ও লুটপাটের ঘটনায় ওই বছরের ১২ সেপ্টেম্বর তদন্ত প্রতিবেদন দিয়েছে আট সদস্যের তদন্ত কমিটি।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট কারখানাতে লুটপাটের ঘটনা ঘটে। পরে কারখানা কর্তৃপক্ষ স্থানীয় কিছু ব্যক্তিকে অর্থের বিনিময়ে কারখানা পাহারার দায়িত্ব দেন। কয়েকদিন পর পাহারার দায়িত্ব নেওয়াকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়। একটি পক্ষ পাহারার জন্য কারখানা কর্তৃপক্ষের কাছে অতিরিক্ত টাকা দাবি করে। এতে কারখানা কর্তৃপক্ষ অস্বীকৃতি জানায়। এরপর হুমকি দিয়ে ওই বছরের ২৫ আগস্ট কারখানা ত্যাগ করে।
এদিকে গাজী টায়ার কারখানার মালিক গোলাম দস্তগীর গাজী (সাবেক সংসদ সদস্য) গ্রেফতার হওয়ার খবর মিডিয়াতে প্রচার হওয়ার পরে গত ২৫ আগস্ট এলাকার লোকজন আনন্দ মিছিল বের করেন। বেলা সাড়ে ১১টায় খাদুন উত্তরপাড়া জামে মসজিদ (খাঁ পাড়া) থেকে ঘোষণা আসে বিকাল ৩টায় রূপসী মোড় ও খাদুন মোড়ে জড়ো হওয়ার জন্য। এক পর্যায়ে লুটপাটের উদ্দেশে দুষ্কৃতিকারীরা দুপুর ১২টায় কারখানায় প্রবেশ করে প্রায় ১৮০ শ্রমিক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কারখানা থেকে বের করে দেয় এবং লুটপাট শুরু করেন। বিকাল সাড়ে ৪টায় আরেক দল দুষ্কৃতিকারী কারখানায় প্রবেশ করে লুটপাট চালায়।
পরে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। দুষ্কৃতিকারীরা একাধিক দলে ভাগ হয়ে বিকালে কারখানার মধ্যে লুটপাট শুরু করে। লুটপাটকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের এক পর্যায়ে রাত সাড়ে ১০টার দিকে কারখানার ৬ষ্ঠ তলা বিশিষ্ট একটি পাকা মিক্সিং ভবনে ভয়াবহ আগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এতে ভবনের প্রতিটি তলায় থাকা বিভিন্ন মালামালসহ যন্ত্রপাতি পুড়ে যায়।
তাছাড়া গত ৫ আগস্ট থেকে কারখানাটি বন্ধ ছিল, ফলে অগ্নিকাণ্ডের সময়ে প্রতিষ্ঠানে কোনও কর্মকর্তা ও কর্মচারী সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। এমনকি কোনও কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিখোঁজ নেই। অগ্নিকাণ্ডের ওই দিন থেকে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়। ফলে গ্যাস ও বৈদ্যুতিক সংযোগের কারণে বর্ণিত অগ্নিকাণ্ড সংঘটিত হয়নি।
ফায়ার সার্ভিসের তথ্যমতে, অধিক পরিমাণে দাহ্য পদার্থ থাকার কারণে ভবনটিতে ২১ ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। ৩০ আগস্ট সন্ধ্যা ৭টা ৫৫ মিনিটের সময় আগুন সম্পূর্ণভাবে নির্বাপণ করা হয়। ভবনে আগুন লাগার পরে ১০-১৫ জন ব্যক্তি দ্রুত বের হয়ে পালিয়ে যায়। ভবন থেকে পরে কোনও লাশ উদ্ধার করা যায়নি। তবে ১ সেপ্টেম্বর ভবনের ভেতর থেকে দেহের বিভিন্ন অংশের ১৫ খণ্ড হাড় পাওয়া যায়।
ফায়ার সার্ভিস কর্তৃক ভবনটিতে উদ্ধার কাজ পরিচালনার জন্য মতামত চাওয়া হলে বুয়েট টিমসহ নারায়ণগঞ্জ গণপূর্ত বিভাগের প্রতিনিধি সরেজমিনে ফায়ার সার্ভিসের টিটিএল এবং ড্রোন দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের বিভিন্ন ফ্লোর পরিদর্শন করেন। ভবনের চার ও পাঁচ তলার ছাদ ধসে তিন তলার ওপর পতিত হয়েছে এবং কলামগুলো ফেটে গেছে। আগুনের তীব্রতা বেশি থাকায় ভবনের আরসিসি পিলার, বিম ও ছাদের ঢালাই খসে পড়ে যেতে দেখা গেছে। অত্যধিক তাপমাত্রার কারণে বিভিন্ন ফ্লোরের বিম এবং ছাদের রডগুলো বাঁকা এবং এলোমেলো অবস্থায় আছে। ইটের দেয়ালগুলো বাঁকা হয়ে হেলে পড়ে গেছে। ফলে ভবনটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে। উদ্ধার কাজ করা উচিত হবে না এবং ভবনটি অপসারণ করতে হলে পরিকল্পনা মাফিক কাজ করতে হবে বলে কমিটি জানিয়েছে। ফলে ভবনের ভেতরে উদ্ধার কাজ চালানো সম্ভব হয়নি।
এরপর অনেকেই স্বজন নিখোঁজ রয়েছে বলে দাবি করেন। এ নিয়ে উপজেলা প্রশাসন, পুলিশ, শিক্ষার্থী ও তদন্ত কমিটি কর্তৃক গণশুনানিতে ভিন্ন ভিন্ন তালিকা তৈরি করা হয়। তালিকাগুলো একত্রিত করে মোট ১৮২ জন নিখোঁজ ব্যক্তির ঠিকানা পাওয়া যায়।









