বিয়ের পাঁচ বছরেও সন্তান হয়নি আঁখি আক্তারের। সন্তানের আশায় মানত করতে স্বামী, বাবা, বোন, ভাগনে ও ভাগনিকে নিয়ে মৈনট পীরের বাড়ির মাজারে যাচ্ছিলেন তিনি। পথে ধামরাইয়ের নান্দেশ্বরী এলাকায় তাদের বহনকারী সিএনজিচালিত অটোরিকশার সঙ্গে বিপরীত দিক থেকে আসা একটি পিকআপের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে ঘটনাস্থলে অটোরিকশাটি দুমড়েমুচড়ে যায়। গুরুতর আহত হন কয়েকজন। পরে হাসপাতালে নেওয়ার পর আঁখি, তার ১২ বছর বয়সী ভাগনে জাকারিয়া ও সিএনজিচালক জুয়েলের মৃত্যু হয়।
বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) বিকালে ধামরাই উপজেলার আমতা ইউনিয়নের পশ্চিম নান্দেশ্বরী বটতলা এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহতরা হলেন—সিএনজি অটোরিকশাচালক জুয়েল (৪০), অটোরিকশার যাত্রী আঁখি আক্তার (৩০) ও তার ভাগনে জাকারিয়া (১২)। নিহতদের সবার বাড়ি টাঙ্গাইলে। জাকারিয়া ছিল আঁখির বড় বোনের ছেলে। দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন লাকী আক্তার (৩২), আবুল হোসেন (৬৫), সেলিম আহমেদ (৩৫) ও লাকী আক্তারের পাঁচ বছর বয়সী মেয়ে সাদিয়া।
আহত আবুল হোসেন একসঙ্গে মেয়ে ও নাতিকে হারিয়ে হাসপাতালে আহাজারি করছিলেন। দুর্ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা যামু মৈনট, আমার জামাই-মেয়ে নিয়া যামু পীর বাড়ির মাজারে। হেই সময় এরকম হইলো। জামাই সামনে ড্রাইভারের পাশে বাম সাইডে বইছে। ডান সাইডে খালি। হঠাৎ কইরা সামনে থাইকা গাড়িডা আইলো।’
তিনি বলেন, ‘আমার ছোট মেয়ের সন্তান হচ্ছিল না। বড় মেয়ে মানত করার পর মেয়ে হয়েছিল। সেই নাতনির মানত পূরণ করতে আর ছোট মেয়ের জন্য সন্তানের মানত করতে যাচ্ছিলাম। কিন্তু এখন আমার সব শেষ।’ এ কথা বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।
নিহত আঁখির স্বামী সেলিম আহমেদ বলেন, ‘আমাদের বিয়ের পাঁচ বছর হয়েছে। তবে আমরা নিঃসন্তান। আমরা মৈনট পীরের বাড়ি যাচ্ছিলাম। গাড়িতে ছয় জন ছিলাম। আমি, আমার স্ত্রী, জেঠাস ও তার দুই ছেলে যাচ্ছিলাম। আমার স্ত্রী ও তার বড় ভাগনে মারা গেছে।’
পুলিশ ও স্থানীয়রা জানায়, বৃহস্পতিবার বেলা আড়াইটার দিকে নান্দেশ্বরী বটতলা এলাকায় আরবিসি ব্রিকসের পাশে পাকা সড়কে কালামপুরগামী একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশার সঙ্গে সাটুরিয়াগামী একটি অজ্ঞাত পিকআপের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে অটোরিকশাটি দুমড়েমুচড়ে যায়। অটোরিকশার চালকসহ চার জন গুরুতর আহত হন। আহতদের উদ্ধার করে মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া ৫০ শয্যাবিশিষ্ট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় জুয়েল ও জাকারিয়ার মৃত্যু হয়। গুরুতর আহত আঁখিকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়ার পথে তারও মৃত্যু হয়।
সাটুরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক মো. রোকনুজ্জামান বলেন, ‘২টার দিকে তাদের নিয়ে আসে। তিনজন অজ্ঞান ছিল। রক্তপাত ছিল প্রচুর। পরে আঁখিকে রেফার করি। বাকি দুজনকে চিকিৎসা দিই। প্রায় ১০ মিনিট পর দুজনের মৃত্যু হয়। আর আঁখিকে ঢাকা নেওয়ার পথে তাঁরও মৃত্যু হয়।’
খবর পেয়ে স্থানীয় লোকজন ও পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে উদ্ধারকাজ চালান। ধামরাই থানার কাওয়ালীপাড়া পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ (আইসি) মোহাম্মদ ইলিয়াস হোসেন বলেন, আহতদের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। নিহতদের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরির কাজ চলছে। দুর্ঘটনার ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে।









