সাভারের আশুলিয়ার জামগড়া এলাকায় তুলা ও পাটের গুদামে লাগা আগুন ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের বসতবাড়িতে। এতে পুড়ে গেছে বহু ঘরের আসবাব, রান্নার সরঞ্জাম, কাপড়চোপড়সহ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। আগুন লাগার পর প্রাণ বাঁচাতে ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন বাসিন্দারা। অনেকে ঘরের কোনো মালামালই বের করতে পারেননি। পরে কেউ কেউ ঘরে ফিরে দেখেন, আগুনে পুড়ে যাওয়া জিনিসপত্রের পাশাপাশি কিছু মালামালও খুঁজে পাচ্ছেন না। তাদের অভিযোগ, আগুনের মধ্যে উদ্ধার তৎপরতার সুযোগ নিয়ে কেউ কেউ ঘরের জিনিসপত্র চুরি করে নিয়ে গেছেন।
শুক্রবার (৯ অক্টোবর) রাত সাড়ে ৯টার দিকে আশুলিয়ার জামগড়া এলাকায় একটি গুদামে আগুনের সূত্রপাত হয়। তা ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের বসতবাড়িতে। রাত ১২টা ২০ মিনিটের দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে ফায়ার সার্ভিস। তবে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দাদের কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গুদামে আগুন লাগার পর তা দ্রুত আশপাশের বাড়িঘরে ছড়িয়ে পড়ে। আগুনের তীব্রতা দেখে তারা ঘর থেকে বেরিয়ে যান। এ সময় প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ পাননি অনেকে। পরে ঘরে ফিরে কেউ কেউ ফ্যান, চুলা, সিলিন্ডার, টাকা ও অন্যান্য মালামাল খুঁজে পাননি বলে অভিযোগ করেন।
সাথী আক্তার নামে এক গৃহবধূ বলেন, পেছনে যে জুটের গুদাম ছিল, সেখানে আগুন লাগে। প্রথমে ওই খান থেকেই আগুন খুব দ্রুত ও তীব্রভাবে ছড়িয়ে পড়ে। আমাদের ওখানে ১৪টা রুমের মধ্যে বাসার সবাই আগুন দেখে ভয়ে তাড়াতাড়ি বের হয়ে যাই। তখন কোনো জিনিসপত্র বের করতে পারিনি। পরে বড় কিছু জিনিস এক-দুটি বের করতে পেরেছি। কিন্তু রুমে থাকা বাকি অনেক জিনিসপত্র চুরি হয়ে গেছে। অনেক কিছুই আমরা আর খুঁজে পাইনি। এখন আমাদের বাসার আগুন কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আছে, কিন্তু রুমের অনেক জিনিসপত্রই আমরা পাইনি। ফ্যান, চুলা, ছোট খাটো জিনিস চুরি হয়েছে।
মুজিবুর রহমান নামে অপর এক বাড়ি মালিক বলেন, পাশের গুদাম থেকে আগুনে পুরো মহল্লার বাড়িঘর পুড়ে গেছে। মোটামুটি ২০টি বাড়ি সম্পূর্ণ পুড়েছে। ফায়ার সার্ভিস আগুন নেভাতে প্রায় দেড় থেকে দুই ঘণ্টা কাজ করেছে। আমাদের ক্ষতির পরিমাণ কমপক্ষে ২০ লাখ টাকা।
রেহানা নামে এক গৃহবধূ বলেন, আমি ম্যানেজারের রুমে বসে ছিলাম। আমার জামাই বাইরে দোকানে গেছে। তখন শুনি আগুন লাগছে। বাইরে গিয়ে দেখি আগুন জ্বলে। তখন ম্যানেজারকে বলেছি, যা কিছু আছে বিদ্যুতের সব বন্ধ করে দেন। বলে, আমার এখানে লাগেনি। অন্যটার আগুনও তো আমার এখানে আসতে পারে। এরমধ্যেই দেখি, আমার ঘর সব পুড়ে গেছে। আমি আমার স্বামীকে খুঁজে পাচ্ছি না। আমি পাঁচ তলায় থাকতাম। সব পুড়ে শেষ।
আশুলিয়ায় একটি পোশাক কারখানায় কর্মরত পোশাক শ্রমিক আসমা বেগম বলেন, আমার ঘরে সিলিন্ডার ছিল। চুলা-পাতিলসহ সবকিছু পুড়ে গেছে। ঘরের মধ্যে টাকা ছিল, কিন্তু আমি কিছুই বের করতে পারিনি। সবাই ঘর থেকে বের হয়ে যাওয়ার পর আমার যা ছিল, সব নিয়ে গেছে। এখন শুধু টুকটাক কিছু জিনিসপত্র আছে। টাকা, সিলিন্ডার, বোতল, চুলা—সব নিয়ে গেছে। আমার ঘরে ১০ হাজার টাকা ছিল। সেই টাকাও নিয়ে গেছে। আমি টাকা আর রাখতে পারিনি। যারা জিনিসপত্র বের করছিল, তারা নিয়েছে কি না, তা আমি ঠিক জানি না। আগুন দেখে আমি হতাশ ও আতঙ্কিত হয়ে বাইরে চলে গিয়েছিলাম। ঘটনাটি হঠাৎ ঘটেছে। রাত সাড়ে ৯টার দিকে শুনি, আগুন লেগেছে। পরে শুনতে পাই, আমাদের বাসার পেছনে যে জুটের গুদাম আছে, সেই গুদামে আগুন লেগেছে। গুদামটি আমাদের বাসার একেবারে পাশেই। এরপর আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং আশপাশের অনেক বাসায় আগুন ছড়িয়ে যায়। আমাদের বাসার ভেতরে এখন কী অবস্থা, তা আমি জানি না। কারণ, আগুন লাগার পর আমি আর বাসার ভেতরে ঢুকতে পারিনি।
চুরি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, চুরির বিষয়ে বলতে গেলে, আগুন লাগার পর সবাই যার যার মতো উদ্ধারকাজ করতে চেয়েছে। সেই সুযোগে কেউ কেউ জিনিসপত্র চুরি করে নিয়ে গেছে বলে মনে হচ্ছে।
স্থানীয় এক গৃহবধূ বলেন, জুটের গুদাম থেকেই আগুনের সূত্রপাত হয়েছে। বিষয়টি জানার পরপরই আমি ৯৯৯ নম্বরে ফোন করে আশুলিয়া থানায় বিষয়টি জানাই। বলি, ‘স্যার, আমাদের বাসার পেছনে জুটের গুদাম আছে। সেখান থেকেই আগুনের সূত্রপাত হয়েছে। তাড়াতাড়ি একটা ব্যবস্থা করেন।’ ফায়ার সার্ভিসের নম্বর আমার জানা ছিল না। পরে আমাকে বলা হয়, ‘আপু, আপনাকে ধন্যবাদ। আমি সব ফায়ার সার্ভিসকে জানিয়ে দিয়েছি। তারা আসছে।’ আমি পরপর তিনবার ফোন দিয়েছি। কিন্তু এই সড়কে যানজটের কারণে ফায়ার সার্ভিস দ্রুত আসতে পারেনি। এর মধ্যে আমাদের সবকিছু শেষ হয়ে গেছে। সব পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। আমাদের বাড়িতে ১৫ থেকে ১৬টি রুম হবে, হয়তো আরও বেশি। সব শেষ হয়ে গেছে। আপনারা দিনের বেলায় এসে ক্যামেরায় ধারণ করে এবং সরেজমিনে যাচাই করে দেখবেন। আশপাশের আরও বাড়িঘরের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। দিনের বেলায় যাচাই করলে ক্ষয়ক্ষতির পুরো চিত্রটা ভালোভাবে বোঝা যাবে। কয়টি বাড়িতে আগুন লেগেছে, তা এখন ঠিকভাবে বলা সম্ভব নয়। দিনের বেলায় গেলে বোঝা যাবে, কয়টি বাড়িতে আগুন ছড়িয়েছে। তবে আমাদের বাড়ির সবকিছু শেষ হয়ে গেছে। এর মধ্যে আমার রুমেও আগুন লেগেছিল। আমি ফায়ার সার্ভিসের লোকজনকে বলেছি, ‘স্যার, আপনার পায়ে ধরছি, আমার রুমে একটু পানি দেন।’
রানা নামে এক স্থানীয় ব্যবসায়ী বলেন, আমি নিজে একজন ব্যবসায়ী। আমার বাসা এখানেই। বাসা থেকে ফোন আসার পর জানতে পারি, পাটের গুদামের পাশে আগুন লেগেছে। পরে আগুন ছড়িয়ে পড়লে আমরা দৌড়ে চলে আসি। আমার বাসায় অনেক মালামাল আছে। আমি ব্যবসা করি, ব্যবসার কাপড়চোপড়সহ অনেক জিনিসপত্র বাসায় রেখেছি। কিছু মালামাল রাস্তাঘাটেও রাখা আছে। এখন সেগুলোর কতটুকু ক্ষতি হয়েছে, তা আল্লাহই জানেন। আমি ঠিকভাবে বলতে পারছি না।
মালামাল চুরি হয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, মালামাল থাকলেও অনেক চুরি হয়েছে। মানুষ যে যার মতো অনেক কিছু নিয়ে গেছে। সব মিলিয়ে অনেক ক্ষতি হয়েছে। অনেক কষ্ট হয়েছে। কিন্তু যাই হোক, আল্লাহ আমাদের অনেক হেফাজত করেছেন। এখন সবকিছু আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিয়েছি।
জিরাবো মডার্ন ফায়ার সার্ভিসের ফায়ার ফাইটার মামুন হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, রাত ৯টা ৪০ মিনিটের দিকে আশুলিয়া জামগড়া এলাকায় একটি তুলার গোডাউনে অগ্নিকাণ্ডের খবর আসে। পরে জিরাবো মডার্ন ফায়ার সার্ভিসের দুই ইউনিট ও ইপিজেড ফায়ার সার্ভিসের দুই ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণে ঘটনাস্থলে যায়।
আশুলিয়া জামগড়া পুলিশ ক্যাম্পের এসআই আবু তালেব জানান, কাঁঠালতলা মোড়সংলগ্ন এই জুট গোডাউনে আগুন লেগেছে। ঘটনাস্থলে বিপুলসংখ্যক মানুষ জড়ো হয়েছে। ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থলে পৌঁছে কাজ শুরু করে। স্থানীয় লোকজনও নিজেদের উদ্যোগে পানি ও বালু দিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। আগুন আশপাশের বসতবাড়িতেও ছড়িয়ে পড়ে পুড়ে যায়।