খুলনা সিটি করপোরেশন (কেসিসি) নগরভবনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা অনুসন্ধানে গঠিত তিনটি তদন্ত টিম প্রায় দু’মাসেও প্রতিবেদন জমা দিতে পারেনি। তদন্ত শেষে তিন থেকে সাতদিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশনা ছিল। কিন্তু কোনও কমিটিই সেই নির্দেশ রক্ষা করতে পারেনি। এ কারণে তদন্তের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একইসঙ্গে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার দাবিও উঠেছে।
কেসিসির ভারপ্রাপ্ত মেয়র মো. আনিছুর রহমান বিশ্বাষ বলেন, সদিচ্ছা থাকার পরেও ব্যস্ততার কারণে কেসিসির তদন্ত টিমের সদস্যরা কাজ করতে পারছেন না। তবে, জেলা প্রশাসন কর্তৃক গঠিত কমিটির তদন্ত প্রতিবেদন আরও আগেই দেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু তারা তদন্ত শেষ করতে না পারায় বিস্মিত হয়েছেন তিনি।
নাগরিক নেতা অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, নগরভবনে অগ্নিকাণ্ডের পরই তাদের সন্দেহ হয়েছিল অভ্যন্তরীণ চক্র এ আগুনের জন্য দায়ী। তদন্ত টিমের রিপোর্ট দিতে গড়িমশির কারণে এ সন্দেহ আরও পাকাপোক্ত হতে চলেছে।
তিনি আরও বলেন, দীর্ঘ দিনেও যারা তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে ব্যর্থ হয়েছেন, তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা উচিত। তা না হলে ভবিষ্যতে দায়িত্বহীনরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠবে। একইসঙ্গে শিগগিরই অগ্নিকাণ্ডের তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল ও তা জনগণের উদ্দেশ্যে প্রকাশ করার দাবি জানান তিনি।
কমিউনিস্ট পার্টির মহানগর সেক্রেটারি মিজানুর রহমান বাবু বলেন, তদন্ত টিমের কিছু সদস্যের বিগত দিনের রেকর্ড ভাল নয়। তারা দুর্বৃত্ত চক্রের সঙ্গে আঁতাত করে প্রতিবেদন প্রস্তুত করে থাকেন। যা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের ক্ষেত্রে নানা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে।
তিনি বলেন, তিনটি তদন্ত কমিটিকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে প্রতিবেদন জমা দেওয়া উচিত। তিনিও তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের ব্যর্থতার দায়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার জোর দাবি জানান।
কেসিসির লাইসেন্স শাখায় অগ্নিকাণ্ডের পর ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়। ঘটনার পরপরই কেসিসির প্যানেল মেয়র-২ হাফিজুর রহমান হাফিজকে প্রধান করে পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট কেসিসির নিজস্ব তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। এ কমিটিকে তিনদিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়। কিন্তু মেয়াদ শেষে তারা আবেদন করে আরও সাতদিন সময় বৃদ্ধি করেন। কেসিসির অভ্যন্তরীণ তদন্ত টিমের অন্য সদস্যরা হচ্ছেন ২১নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর শামসুজ্জামান মিয়া স্বপন, প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা আরিফ নাজমুল আহসান, ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. নাজমুল ইসলাম ও নির্বাহী প্রকৌশলী (বিদ্যুৎ) মো. জাহিদ হোসেন শেখ। অন্যদিকে, বিষয়টি তদন্তের জন্য ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স খুলনার সহকারী উপ-পরিচালক মো. লিয়াকত হোসেনকে প্রধান করে আরও একটি কমিটি ঘোষণা করা হয়েছিল। এই কমিটিতে বয়রা স্টেশনের সিনিয়র স্টেশন অফিসার মো. তারেক হাসান ভূঁইয়াকে সদস্য সচিব এবং টুটপাড়া স্টেশনের ওয়্যারহাউজ পরিদর্শক মো. জাকির হোসেনকে সদস্য করা হয়। তিন সদস্যের এই কমিটিও তিনদিনের সময় শেষে আরও সাতদিন সময় নেয়। বিষয়টি আরো পুঙ্খানুরূপে তদন্তের জন্য ১৫ মার্চ জেলা প্রশাসন থেকে পাঁচ সদস্যের উচ্চ পর্যায়ের একটি তদন্ত টিম গঠন করা হয়। এই টিমের প্রধান হচ্ছেন খুলনার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এলএ) এস এম সুলতান আলম। সদস্য কেসিসির প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা আরিফ নাজমুল হাসান, সিটিএসবির বিশেষ পুলিশ সুপার (ভারপ্রাপ্ত) শেখ মনিরুজ্জামান মিঠু, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স খুলনার উপ-পরিচালক শেখ মিজানুর রহমান ও বিক্রয় বিতরণ বিভাগ-১ এর সহকারী প্রকৌশলী আবুল কালাম আজাদ।
আরও পড়ুন:
দুই মাস ধরে টিকা সংকট: উদ্বিগ্ন অভিভাবকরা
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স খুলনার উপ-পরিচালক শেখ মিজানুর রহমান বলেন, তদন্ত টিম প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। তবে ব্যস্ততার কারণে তিনি তা দেখতে পারেননি। রিপোর্ট দেখে ২/১ দিনের মধ্যে তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দিতে সক্ষম হবেন। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স খুলনার সহকারী উপ-পরিচালক তদন্ত টিমের প্রধান মো. লিয়াকত হোসেন জানান, এক সপ্তাহ আগে তিনি উপ পরিচালকের কাছে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন। তবে প্রতিবেদনের বিষয়ে তিনি কোনও মন্তব্য করতে আগ্রহী হননি।
জেলা প্রশাসনের তদন্ত টিম প্রধান অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এলএ) এস এম সুলতান আলম বলেন, তদন্তের কাজ শেষ হয়েছে। চলতি সপ্তাহে তারা প্রতিবেদন দাখিল করতে পারবেন বলে প্রত্যাশা করছেন।
কেসিসির অভ্যন্তরীণ তদন্ত টিমের প্রধান ও প্যানেল মেয়র-২ শেখ হাফিজুর রহমান হাফিজ বলেন, জেলা প্রশাসক কর্তৃক গঠিত তদন্ত টিমের রিপোর্ট পাওয়ার পর তারা তা এনালাইসিস (পর্যালোচনা) করে প্রতিবেদন দাখিল করবেন। তবে কবে নাগাদ তিনি তদন্ত প্রতিবেদন দিবেন তাও সুনির্দিষ্ট করে বলতে পারেননি।
উল্লেখ্য, গত ১৪ মার্চ সকাল পৌনে ৯টায় নগরভবনের ভবনের নতুন বিল্ডিং-এর পঞ্চম তলার ট্রেড লাইসেন্স শাখায় দরজা খোলার পর অগ্নিকাণ্ডের বিষয়টি নজরে আসে। পরে ফায়ার সার্ভিস এক ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। ঘটনার পর ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়।
আরও পড়ুন:
জিয়া ও খালেদাকে ধিক্কার জানালেন জয়
/বিটি/








