যশোরে ভিক্ষুক-দুঃস্থদের অন্যরকম ঈদ আনন্দ

যশোর প্রতিনিধি
১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৬, ১৯:৩৬আপডেট : ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৬, ১৯:৩৬

‘লোকজনতো আমাগের কাছেই ঘেঁষতি দ্যায় না, আমাগের গায়ে গন্দো। আর গফুর চিয়ারম্যান আমাগের বুকি টাইনে নেন। দুপুরবেলা পেটপুইরে খাতি দ্যায়। যাওয়ার সুমায় আবার শাড়ি-লুঙ্গিও দ্যায়। ওইই আমাগের ভালো।’ -কথাগুলো বলছিলেন যশোরের মনিরামপুর উপজেলার পারখাজুরা গ্রামের বিধবা নিসা বেগম (৬০)।

বাড়িতে জড়ো হওয়া আমন্ত্রিত অতিথিরা বৃহস্পতিবার দুপুরে নিসা বেগমের মতো আরও অনেক মানুষ এসেছিলেন উপজেলার চাপাতলার ভরতপুরে। তারা এসেছিলেন মশ্মিনগর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট এম এ গফুরের আমন্ত্রণে। এম এ গফুর গত ১৪ বছর ধরে তার বাড়িতে ইউনিয়নের ভিক্ষুক, দুঃস্থ ও অনাথ মানুষদের জন্যে কোরবানি ঈদের পরেরদিন আয়োজন করেন ভুরিভোজের।

এবছর ঈদের দুদিন পরে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বৃহস্পতিবার বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমন্ত্রিত মানুষেরা (তাদের প্রত্যেককে নামে নামে ঈদকার্ড দেওয়া হয়) দলে দলে আসা শুরু করেন। সবার বসার জন্যে গাছের ছায়ায় চেয়ারের ব্যবস্থা করা হয়। বাড়ির ভেতরে গ্রামের রাঁধুনি দিয়েই রান্না করা হয় চর্বি দিয়ে ডাল, খাসি ও গরুর মাংস এবং সাদাভাত।

চলছে ভোজের রান্না দুপুরের খাবারের আগেই নিমন্ত্রিত অতিথিদের চেয়ার-বালিশ খেলা, বেলুন ফুটানো এবং নৌকা বাইচের আয়োজন করা হয়। এসব খেলায় বিজয়ী প্রথম তিনজনকে প্লেট এবং ফুড গ্রেডের ঢাকনাযুক্ত বক্স উপহার দেওয়া হয়।

কাঁঠালতলা এলাকার অবেদ আলীর স্ত্রী রোকেয়া বেগম (৫৫) জানান, দশ-বারো বছর ধরে তিনি এখানে নিমন্ত্রিত হয়ে আসেন। এবার এক মেয়েকে নিয়েও এসেছেন। গফুর সাহেব আমন্ত্রিত সবাইকেই ঈদ শুভেচ্ছা কার্ড পাঠিয়েছেন। অন্যান্য বছরেও এমন কার্ড পাঠানো হয়। সবাই এই দিনটার জন্যে অপেক্ষা করে।

কথা হয় চাকলা গ্রামের নজরুল ইসলামের স্ত্রী জলি বেগমের (২৫) সঙ্গে। তিনি জানান, আগে তার মাকে দাওয়াত দেওয়া হতো। মায়ের মৃত্যুর পর এই চার বছর তিনি আসছেন। প্রতিবার এখানে গরিব মানুষদের জন্যে দুপুরে ভাল খাবারের আয়োজন করা হয়। এছাড়া খেলাধুলা, নৌকাবাইচ ইত্যাদি শেষে পুরস্কার আর শেষে শাড়ি ও কাপড় দেওয়া হয়।

খাবার গ্রহণ করছেন ভিক্ষুক দুঃস্থরা
হাজরাকাটি গ্রামের ছিফাতুল্লাহ গাজীর ছেলে মোহাম্মদ আলী গাজী (৫৫) বলেন, ‘২০ টাকা ভ্যান ভাড়া করে এসেছি। এবার পানিতে তলিয়ে গেছে বাড়ি-ঘর। ঈদে তেমন আনন্দ করা যায়নি। এখানে এলে বেশ আনন্দ হয়। একসঙ্গে সবার খাওয়া-দাওয়া বেশ ভালো লাগে।’

ভরতপুর গ্রামের বাসিন্দা এবং আয়োজকের প্রতিবেশী রায়হান সরদার জানান, এইটা গরিব মানুষের মিলনমেলা। গফুর সাহেব আর তার পরিবারের লোকজন সবাই থাকেন এই উৎসবে। একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়ার পর কাপড়-লুঙ্গি নিয়ে যে যার বাড়িতে চলে যান।

গত আট-দশ বছর ধরে এই উৎসবে শামিল হন ঝিকরগাছা উপজেলার বাঁকড়া বেলেডাঙ্গা এলাকার বাসিন্দা মুক্তিযোদ্ধা কওছার আলী। তিনি বলেন, ‘এই উৎসবটা প্রাণের। সবাইকে খুব আপনজন মনে হয়। গফুর সাহেব আমাকে প্রতিবারই দাওয়াত দেন। সমাজে বিত্তহীন, দরিদ্র অসহায় মানুষের আপ্যায়ন ও তাদের সহায়তা প্রদান- খুব টানে আমাকে। কিন্তু আমার সেই সামর্থ্য নেই। গফুর সাহেবের এই কাজে আমিও তৃপ্তি পাই; মনটা ভাল হয়ে যায়।’

আমন্ত্রিত অতিথির সঙ্গে এম এ গফুর জানা গেছে, মশ্মিমনগর ইউনিয়নের পরপর দু’বার ইউপি চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেছেন এম এ গফুর। তিনি জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক। গফুররা ৫ ভাই ও দুই বোন। বোনদের বিয়ে গেছে। একান্নবর্তী পরিবারের সবাই এদিনকে সামনে রেখে সব ভাই-বোন ও তাদের সন্তান এবং জ্ঞাতিগোষ্ঠীরা এক হন। দুপুরে চার শতাধিক নিমন্ত্রিত ভিক্ষুক, দুঃস্থ আর তাদের বন্ধু-স্বজনরা একসঙ্গে বসে খাবার গ্রহণ করেন।

এমএ গফুরের স্ত্রী আতিয়া জেসমিন বলেন, ‘গ্রামের এসব মানুষ খুব সহজ-সরল। তাদের সবাইকে আপন মনে হয়। এমনদিনে আমরা সবাই একত্রিত হই। সকলের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ হয়। খুব ভাল লাগে।’

অনুষ্ঠানের আয়োজক অ্যাডভোকেট এম এ গফুর বলেন, ‘আগে ঈদের পরে বন্ধুদের দাওয়াত দিতাম, কিন্তু তারা নানা অজুহাত দেখাতেন। এই ভালো না, ওটা খারাপ ইত্যাদি। কিন্তু এই গরিব মানুষগুলো কখনও কোনকিছু নিয়ে আপত্তি করেননি। তারা প্রাণের মানুষ। শুধু একটাই আবদার করেছে, তাদের যেন চেয়ারে খেতে দেওয়া না হয়। মাটিতে আসন পেতে না খেতে পারলে তাদের মন ভরে না। আমার সামর্থ্য অনুযায়ী কিছু ব্যবস্থা করে আসছি ২০০৩ সাল থেকে। এইসব মানুষের ভালোবাসায় আমি মুগ্ধ।’

/এমও/

সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
যেখানে সকালে বারান্দায় এলেই দেখা মেলে জোড়া রংধনুর
যেখানে সকালে বারান্দায় এলেই দেখা মেলে জোড়া রংধনুর
সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরের আড়ালে কী
সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরের আড়ালে কী
গরমে শিশুর সুরক্ষা: সামান্য ভুলও ডেকে আনতে পারে বড় বিপদ
গরমে শিশুর সুরক্ষা: সামান্য ভুলও ডেকে আনতে পারে বড় বিপদ
থানার ভেতরে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে পিটিয়ে আহত, ৩ পুলিশ প্রত্যাহার
থানার ভেতরে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে পিটিয়ে আহত, ৩ পুলিশ প্রত্যাহার
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম