‘গত ভাদ্র মাসে ছেলেটা সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে ঘূর্ণিঝড়ের মধ্যে পড়ে হারিয়ে যায়। অনেক চেষ্টা করেও তার কোনও খোঁজ পাইনি। এর তিন মাস পর ছেলের শোকে ওর বাপ স্টোক করে মারা যায়। আমার সংসারে আর কোনও ইনকামের লোক নাই। দুটি মেয়ে নিয়ে খেয়ে না খেয়ে দিন কাটাচ্ছি। আপনারা কি আমার বাজানের খোঁজ দিতে পারবেন’ বলে কান্নায় ভেঙে পড়েন গত বছরের ১৯ সেপ্টেম্বর বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরতে গিয়ে ঝড়ের কবলে পড়ে হারিয়ে যাওয়া বাগেরহাটের কচুয়া উপজেলার বগা গ্রামের জেলে পল্লীর আসাদুল মোল্লার মা হাওয়া নূর বেগম।
‘আমার ছেলেটা খুব ভাল ছিল। এই গ্রামের সবাই তারে ভাল বলত। ভিক্ষা করে ও পরের বাড়ি কাজ করে অনেক কষ্টে ওরে মানুষ করছি। সেই কষ্টের সন্তান আজ হারায়ে গেছে। ছেলের ছবি বুকে নিয়ে রাতে ঘুমাই। ঘুমের ঘোরে দেখি এই বুঝি আমার ছেলে এসে মা বলে ডাক দিচ্ছে। ঘুম ভাঙতে দেখি সব মিথ্যা। তখন সারা রাত কানতে কানতে ( কাঁদতে) কাটাই। চোখের পানিতে বালিশ ভিজে যায়।’ ছেলে ছবি বুকে ধরে কান্না জড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন বঙ্গোপসাগরে হারিয়ে যাওয়া বগা গ্রামের মিজানুর রহমান ব্যাপারীর মা রোকেয়া বেগম।
গত বছরের ১৯ সেপ্টেম্বর বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরতে গিয়ে ঝড়ের কবলে পড়ে ট্রলারডুবির পর হারিয়ে যাওয়া বাগেরহাটের কচুয়া উপজেলার বগা গ্রামের ১৯ জেলে পরিবারের সংবাদ সংগ্রহ করতে ওই জেলে পল্লীতে গেলে হারিয়ে যাওয়া জেলেদের স্বজনরা এভাবে বিলাপ করতে থাকেন।
সাগরে হারিয়ে যাওয়া জেলে আবু তালেব হাওলাদারের স্ত্রী মরিয়ম বেগম বলেন, ‘তার এক ছেলে, দুই মেয়ে। সংসারে একমাত্র আয় করতেন তার স্বামী। গত বছর স্বামীকে হারানোর পর থেকে বাড়িতে বসে জাল বুনে ও পরের বাড়ি কাজ করে তিনটি বাচ্চাকে কোনও রকমে বাঁচিয়ে রেখেছেন। এর ভিতর কতদিন যে না খেয়ে রয়েছেন তার হিসাব নাই। বড় ছেলেটি ৭ম শ্রেণিতে পড়ে। তাকে বিভিন্ন লোকে কলম খাতা কিনে দেয়।’
স্ত্রী নারগিস বেগমকে সাত মাসের গর্ভাবস্থায় রেখে মাছ ধরতে সাগরে গিয়েছিলেন হাফিজুর বাবনা। পরবর্তীতে নারগিসের একটি ছেলে হয়। এলাকাবাসী নাম রাখেন ‘আব্দুল্লাহ’। এই আব্দুল্লাহকে নিয়ে নারগিস কখনও বাবার বাড়ি, কখনও স্বামীর বাড়ি থাকেন। অন্যের সাহয্যে ছাড়া তার কোনও উপায় নেই।
সাগরে হারিয়ে যাওয়া আবুল কালামের মা ফিরোজা বেগম জানান, দুটি ছেলের জন্মের পর বাবার বাড়িতে এসে বসবাস শুরু করেন। স্বামী না থাকায় অনেক ঝামেলা গেছে। তারপরও সন্তান দুটিকে বুকে ধরে সব কষ্ট সহ্য করেছেন তিনি। বড় ছেলেটি সংসারের হাল ধরলে কিছুটা সুখের দেখা পান। কিন্তু গত বছরের ১৯ তারিখ সব স্বপ্ন ভেঙে যায়। বঙ্গোপসাগরে হারিয়ে যাওয়া ছেলেকে ফিরে পাওয়ার জন্য বিভিন্ন ওঝা- কবিরাজ, প্রশাসনের কর্মকর্তা, বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতার কাছে ধর্ণা দিয়েছেন। কিন্তু এখনও কোনও ফল পাননি।
তিনি বলেন, ‘আমার ধারণা আমার ছেলে ভারতের উড়িশ্যার কারাগারে আছে। তাকে আমার কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য সরকারের কাছে জোর দাবি জানাই।’
অভাবের কারণে বাধ্য হয়ে তিনি এ বছর এসএসসি পাস করা ছোট ছেলেটিকে কলেজে ভর্তি না করে চট্টগ্রামে কাজের জন্য পাঠিয়েছেন।
বাড়ি বাড়ি ভিক্ষা করে ছেলে জাহাঙ্গীরকে বড় করেছিলেন বিধবা নূরজাহান বেগম। সেই ছেলেকে হারিয়ে এখন তিনি পাগল প্রায়। যাকে পান তাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদেন ছেলেকে ফেরত পাওয়ার আশায়।
বারেক মোল্লার চারটি কন্যা সন্তান। তিনি ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। বারেক মোল্লা সাগরে হারিয়ে যাওয়ার পর থেকে সংসারে নেমে আসে অভাব অনটন। বাধ্য হয়ে রাস্তায় কাজ করে কোনও মতে চারটি মেয়েকে বাঁচিয়ে রেখেছেন তার মা মহিতুন বেগম।
শুধু মহিতুন বেগম নয়, পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিদের হারিয়ে এভাবে মানবেতর জীবনযাপন করছে বগা গ্রামের জেলেপল্লীর ১৯টি পরিবার। এখন তারা প্রিয়জন ফিরে আসার অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন। তাদের অভিযোগ, সরকারিভাবে একবার মাত্র এক বস্তা চাল ও পাঁচ হাজার টাকা পেয়েছেন তারা। নিখোঁজ এসব জেলেদের খুঁজে পেতে সরকারিভাবে নেওয়া হয়নি তেমন কোনও উদ্যোগ।
বাগেরহাট জেলা মৎস্য অফিসের হিসাব মতে, বাগেরহাট জেলার ৩৩ জেলের কোনও সন্ধান পাওয়া যায়নি। যার মধ্যে কচুয়া উপজেলার ২৭ জন, মোড়েলগঞ্জের দুইজন, শরনখোলার দুইজন, চিতলমারীর একজন এবং বাগেরহাট জেলা সদরের একজন।
এর মধ্যে কচুয়া উপজেলার ধোপাখালী ইউনিয়নের এফ.বি. সজল, এফ.বি. শাহাজালাল, এফ.বি. রূপক ও এফ.বি. আউয়াল নামের ৪টি মাছ ধরা ট্রলার ৫১ জন জেলেসহ গভীর সমুদ্রে ডুবে যায়। এর মধ্যে ৩২ জন জেলেকে জীবিত উদ্ধার গেলেও বাকি ১৯ জনের কোনও সন্ধান মেলেনি।
কচুয়া উপজেলার নিখোঁজ জেলেরা হলেন ভাষা গ্রামের আবুল বেপারী, জাহাঙ্গীর বেপারী, হাফিজুল বাবলা, মণি মাঝি, হাসান মল্লিক, মাসুম শেখ, আতিয়ার বেপারী, তৈয়ব আলী বাওয়ালী, ওলিয়ার মোল্লা, নেয়ামুল আমানী, কালাম মল্লিক, গনি বেপারী, কালাম হাওলাদার, মিজানুর বেপারী, তালেব হাওলাদার, বগা গ্রামের আ. বারেক মোল্লা, আছদুল মোল্লা, আলামিন আমানী, রেজাউল বেপারী।
ওইদিন একসঙ্গে সাগরে মাছ ধরতে যাওয়া বগা গ্রামের জেলে মো. আক্কাস আলী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা সকলে একই স্থানে ছিলাম। হঠাৎ ঝড় ওঠায় কিছু বোঝার আগেই অনেক মাছ ধরা ট্রলার তলিয়ে যায়। সকালে অনেক খোঁজাখুঁজি করেও তাদের পাওয়া যায় না। পরে বাড়িতে খবর পাঠাই। এসব জেলেদের পরিবার অসহায় অবস্থায় আছে।’
বাগেরহাট উপকুলীয় মৎস্যজীবি সমিতির সভাপতি শেখ ইদ্রিস আলী জানান, নিখোঁজ অসচ্ছল জেলেদের পরিবারের সদস্যরা খেয়ে না খেয়ে মানবেতর দিনাতিপাত করছে। তাদের শান্তনা দেওয়ার কেউ নেই। সরকারিভাবে তাদের খোঁজার জন্য জোরালো কোনও উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
বাগেরহাটে সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মো. কবির হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, বঙ্গোপসাগরে ঝড়ের কবলে পড়ে জেলে নিহত হওয়ার পর হারিয়ে যাওয়া এসব জেলেদের তালিকা করে উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে জেলা প্রশাসনের কাছে জমা দেওয়া হয়েছিল। এছাড়া তাৎক্ষনিক জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে এসব পরিবারের মাঝে ত্রাণ ও নগদ অর্থ বিতরণ করা হয়।
আরও পড়ুন:
টাম্পাকোতে অপেক্ষা যেন ফুরাতে চায় না, ধ্বংসস্তূপও কমে না
/বিটি/








