আমাকে টাকা দিয়ে সাহায্য করার দরকার নেই। সরকার বা দেশের হৃদয়বান ব্যক্তিদের কাছে আবেদন আমাকে একটি চাকরি দেন। আমি কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতে চাই। আমি সমাজের কাছে বোঝা হয়ে থাকতে চাই না। এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে অনার্স ও মাস্টার্সে কৃতিত্বের সঙ্গে পাস করা শাহেদুজ্জামান। বাড়ি সাতক্ষীরা সদরের ফিংড়ি ইউনিয়নের গাভা গ্রামে।
সাতক্ষীরা প্রেসক্লাবের নিউজ রুমে বসে বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন,‘পড়ালেখা শেষ করেছি। এখন জীবনটা সুন্দরভাবে গুছিয়ে নেবো। বাবাকে সাহায্য করবো। মায়ের স্বপ্নপূরণ করবো। কারণ, মায়ের ইচ্ছা ছিল আমাকে বাংলার প্রভাষক বানানোর। সেই স্বপ্ন পূরণের জন্য মাস্টার্সের পর পর বিসিএসের জন্য প্রস্তুতি শুরু করি। কিন্তু বিধি বাম। একদিন ঘুম থেকে উঠে দেখি চোখে ভালোভাবে দেখতে পারছি না। বিভিন্ন ডাক্তার দেখিয়ে জানতে পারলাম, আমার চোখের রেটিনার ৬০ শতাংশ নষ্ট হয়ে গেছে। আর কখনও ভালোভাবে দেখতে পারবো না। হঠাৎ করেই আমার জীবনের সব কিছু থেমে গেল। সব স্বপ্ন ভেঙে গেল।’
তিনি আরও বলেন, ‘বাবা নাম জাকির হোসেন। তিনি গাভা দাখিল মাদ্রাসার ইংরেজির শিক্ষক। বাবার সামান্য বেতনে আমাদের সংসার চলতো। যে কারণে ছোটবেলা থেকেই ছোট দুই ভাইয়ের পড়ালেখার দায়িত্ব আমি নিয়েছিলাম। মায়ের অনুপ্রেরণায় গাভা একেএম আদর্শ মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে ২০০২ সালে মাধ্যমিক ও ২০০৪ সালে সাতক্ষীরা সরকারি কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করি। ২০০৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে কলা বিভাগের ২০ হাজার শিক্ষার্থীর মধ্যে ৩৮৯তম মেধাস্থান অধিকার করি। ভর্তি হই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। এর এক বছর পর মায়ের হার্টে দুটো বাল্বই নষ্ট হয়ে যায়। মা মারা যান। এরপর আমার ওপর নেমে আসে দুর্দশা। তারপরও ভেঙে পড়িনি। মায়ের স্বপ্ন পূরণের জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাই। নিজের পড়াশুনার পাশাপাশি দুই ভাইয়ের পড়াশুনার খরচও চালিয়ে যাই। অনার্স এবং মাস্টর্স শেষ হয়। শুরু করি চাকরির জন্য পড়াশুনা। হঠাৎ একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি চোখে ঝাপসা দেখছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মেডিক্যাল সেন্টার, বাংলাদেশ আই হাসপাতাল, ইসলামি চক্ষু হাসপাতাল, জাতীয় চক্ষু ইনস্টিটিউটসহ সব হাসপাতালে চিকিৎসা নিলাম। চিকিৎসকরা আমাকে জানালেন আমার চোখ আর কখনও ভালো হবে না। কারণ, আমি ‘ম্যাকুলা ডিস্টাফি’ নামে এক রোগে ভুগছি। যে কারণে আমার চোখের রেটিনার ৬০ শতাংশ নষ্ট হয়ে গেছে। ৪০ শতাংশ ভালো আছে। তবে ৪০ বছরের মধ্যে এ অবস্থার কোনও অবনতি হবে না। কিন্তু এর চেয়ে ভালো হওয়ার কোনও আশা নেই।’
তিনি আরও বলেন,‘আমার মায়ের স্বপ্ন ছিল আমি যেন বাংলায় পড়াশুনা করি। বিসিএস ক্যাডার হয়ে বাংলার বিভাগের প্রভাষক হই। সেই স্বপ্ন নিয়েই পড়াশুনা করছিলাম কিন্তু আর হলো কই? বাবা একজন মাদ্রাসা শিক্ষক। তিনি যে টাকা বেতন পান সেটা দিয়ে আমাদের ঠিকমতো সংসারই চলে না। মাঝে মাধ্যে হৃদয়বান ব্যক্তিরা আমাকে কিছু কিছু সাহায্য করেন, তা দিয়ে স্ত্রী ও মেয়েকে নিয়ে অনেক কষ্টে জীবন চালাচ্ছি। কিন্তু অন্যের হাত থেকে টাকা নিতে খুব খারাপ লাগে। সরকার বা কোনও হৃদবান ব্যক্তি যদি আমার পাশে দাঁড়াতেন তা হলে হয়তো বাকি জীবনটা ভালোভাবে কাটিয়ে দিতে পারতাম।’
শাহেদুজ্জামানের বাবা মাদ্রাসা শিক্ষক জাকির হোসেন বলেন, ‘ছেলেকে অনেক কষ্ট করে মানুষ করেছি কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে সে অসহায় হয়ে পড়েছে। ভালোভাবে বেঁচে থাকার জন্য এখন তার একটা কাজ দরকার।’
(এ ব্যাপারে সহযোগিতার জন্য শাহেদুজ্জামানের সঙ্গে যোগাযোগ করতে চাইলে তার ব্যবহৃত নম্বরে ০১৭৭৪১১৬৫৬৪ যোগাযোগ করুন।)
আরও পড়ুন: জাফর ইকবালকে হত্যাচেষ্টার প্রতিবাদে বিক্ষোভ







