একাদশ সংসদ নির্বাচনে দেশের ছয়টি নির্বাচনি আসনে ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। এরই অংশ হিসেবে দৈবচয়ন পদ্ধতিতে বাছাই করা ছয়টি আসনের একটি সাতক্ষীরা-২ আসন। এই আসনে ইভিএম ব্যবহারের বিষয়ে আসনটির ভোটাররা মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তরুণ ও শিক্ষিত ভোটাররা ইভিএমকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করলেও অপেক্ষাকৃত বয়স্ক ব্যক্তি ও নারী ভোটারদের মধ্যে ইভিএমে ভোট প্রদানে দ্বিধা কাজ করছে। অধিকাংশ বয়স্ক ভোটার বলছে, ইভিএম সম্পর্কে তাদের কোনও ধারণা নেই। অনেকে আবার এ ব্যবস্থা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। এ ছাড়া ইভিএমে ভোট নেওয়ার আগে যথেষ্ট প্রচারণা ও প্রশিক্ষণের দাবিও জানিয়েছেন তারা।
সাতক্ষীরা-২ আসনটি একটি পৌরসভা ও ১৪টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত। এই আসনে মোট তিন লাখ ৫৬ হাজার ২৫৮ জন ভোটার ইভিএমে ভোট দেবেন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার এক লাখ ৭৭ হাজার ২৯০ এবং নারী ভোটার এক লাখ ৭৮ হাজার ৯৭৮ জন।
বিগত সংসদ নির্বাচনের পরিসংখ্যানে জানা গেছে, এই আসনে ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে জামায়াতের কাজী শামসুর রহমান বিজয়ী হন। ২০০১ সালেও যুদ্ধাপরাধ মামলায় আটক জেলা জামায়াতের সাবেক আমির আব্দুল খালেক মন্ডল নির্বাচিত হন। ২০০৮ সালের মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান এমএ জব্বার এই আসন থেকে এমপি নির্বাচিত হন। সর্বশেষ ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে মীর মোস্তাক আহমেদ এমপি নির্বাচিত হন।
এবারের নির্বাচনে সাতক্ষীরা-২ আসনে ইভিএমের ব্যবহারকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন এই আসনের তরুণ ভোটাররা। এই বিষয়ে কথা হয় সাতক্ষীরা শহরের মুনজিতপুর এলাকার বাসিন্দা সোনিয়া পারভীনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমি নতুন ভোটার হয়েছি। জীবনের প্রথম ভোট দেবো, তাও আবার ইভিএমের মাধ্যমে। সে জন্য অনেক ভালো লাগছে।’
সাতক্ষীরা সদরের মাছখোলা এলাকার মোখলেছুর রহমান বলেন, ‘ইভিএম নিয়ে আমরা ধন্দে আছি। জেনেছি জাতীয় পরিচয়পত্র বা স্মার্ট কার্ড ছাড়াও সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তা তার আঙুলের ছাপে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত ব্যালট ইস্যু করতে পারবেন? এই অবস্থায় ভোট শতকরা শতভাগ নির্ভেজাল থাকবে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ আছে।’
সাতক্ষীরা পৌর এলাকার ২নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা আইমান বিবির বয়স ৬৫ বছর। তিনি বলেন, ‘ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) কী জিনিস সেটা আমার জানা নেই।’
সাতক্ষীরা পৌর এলাকার রসুলপুর এলাকার বাসিন্দা আফরোজা রহমান বলেন, ‘ব্যালট পেপারে তিনবার ভোট দিয়েছি। কিন্তু এবার শুনছি আমাদের আসনে ইভিএম ভোট দিতে হবে। ইভিএম সম্পর্কে আমার ভালো ধারণা নেই। তবে শুনেছি আঙুলের ছাপ, স্মার্ট কার্ড ও ভোটার নম্বর দিয়ে ভোট দিতে হবে। তবে প্রথমবারের মতো ইভিএম ব্যবহারে অনেক ভুল-ভ্রান্তি হবে। আশা করি, নির্বাচন কমিশন পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেবেন।’
তবে স্কুল শিক্ষক শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘আমি বেশ কয়েকটি সংসদ নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করেছি। একজন ভোটার ব্যালটে সিল মারার পর নিশ্চিত হয়ে বলতে পারেন ভোটটি তার পছন্দের প্রার্থীই পাচ্ছেন। কিন্তু প্রথমবার ইভিএমে ভোট একজন ভোটারের মনে প্রশ্ন হবে, তার প্রার্থী ভোটটি পাচ্ছেন তো? কিন্তু এই রকম সন্দেহ হওয়ার কোনও কারণ নেই। আমার জানামতে এই সিস্টেমে ভোট কারচুপির কোনও সুযোগ থাকবে না। অনেক সময় ভোটের বাক্সে চুরি হওয়ার সুযোগ থাকে কিন্তু এই পদ্ধতিতে সে সুযোগ থাকবে না।’
সাধারণ ভোটার ছাড়াও রাজনৈতিক দলগুলোও নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার নিয়ে বিতর্কে জড়িয়েছেন। আওয়ামী লীগ নেতাককর্মীরা ইভিএম ব্যবহারের পক্ষে থাকলেও বিরোধী বিএনপি-জামায়াত জোট বিষয়টিকে সহজভাবে নিচ্ছে না। তাদের অভিযোগ ইভিএমের ব্যবহারে অনিয়ম করে ভোটের হিসাব পাল্টে ফেলা হবে।
সাতক্ষীরা জেলা জামায়াতের প্রচার সম্পাদক আজিজুর রহমান বলেন, ‘ইভিএমকে আমরা নিরাপদ মনে করছি না। আমাদের ধারণা এর মাধ্যমে একজনকে ভোট দিলে অন্যজন ভোট পাবেন। ভোট স্বচ্ছ করতে নির্বাচন কমিশনের ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানাচ্ছি।’
সাতক্ষীরা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক তারিকুল ইসলাম বলেন, ‘ইভিএমকে আমি নিরাপদ মনে করছি না। ইভিএম সম্পর্কে সাধারণ ভোটারদের সচেতন করতে কোনও প্রচারণা চালানো হয়নি। ইভিএম পদ্ধতি নিয়ে অনেক বিতর্ক আছে। ইভিএম মানে ডিজিটাল কারচুপির মাধ্যম বলে মনে করি। এর আগের বেশ কয়েকটি নির্বাচনে স্বল্প পরিসরে যে ইভিএম ব্যবহার করে সমস্যা দেখা দিয়েছে। কোথাও ইভিএম বাদ দিয়ে ব্যালট পেপারেও ভোটগ্রহণ সম্পন্ন করতে হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রিজাইডিং ও সহকারী প্রিজাইডিং অফিসাররা চাইলে নিজের বায়োমেট্রিকের মাধ্যমে ভোটার ছাড়াও ইভিএমকে ভোটদানের উপযোগী করতে পারেন। ফলে অসাধু প্রিজাইডিং/সহকারী প্রিজাইডিং অফিসারের মাধ্যমে যেকোনও প্রার্থী সহজেই ভোটের ফল পাল্টে ফেলতে পারে। আমাদের দল কেন্দ্র থেকে এই পদ্ধতির বিরোধিতা করেছে।’
তবে সাতক্ষীরা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মুনসুর আহমেদ বলেন, ‘দেশ এখন ডিজিটাল হয়েছে। আমার বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করেছি। সেখানে ভোটের পদ্ধিতে পিছিয়ে থাকার সুযোগ নেই। ইভিএমের মাধ্যমে ভোট গ্রহণ সারা বিশ্বে প্রশংসিত। ইভিএমের মাধ্যমে ভোট গ্রহণে কারচুপির সুযোগ থাকবে না। সাতক্ষীরা-২ আসনের সাধারণ ভোটারদের সচেতন করতে ছাত্রলীগের নেতৃবৃৃন্দকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’
প্রসঙ্গত, সোমবার (২৬ নভেম্বর) সন্ধ্যায় নির্বাচন কমিশন ভবনে দৈবচয়নের ভিত্তিতে নির্ধারিত আসনগুলো থেকে ছয়টি আসন লটারির মাধ্যমে ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) ভোট গ্রহণের জন্য নির্বাচন করা হয়। লটারিতে ঢাকা-৬, ঢাকা-১৩, চট্টগ্রাম-৯, খুলনা-২, রংপুর-৩ এর পাশাপাশি সাতক্ষীরা-২ আসন নির্বাচিত হয়।







