যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার শঙ্করপুর ইউনিয়নের নায়ড়া বাজার। নায়ড়া গ্রামকে বলা যায় অজপাড়াগাঁ। নায়ড়া বাজারের একটি আমগাছের নিচে দাঁড়িয়ে ৬৬ বছর আগে বক্তৃতা দিয়েছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৫৪ সালের ২৭ এপ্রিল তিনি শার্শা উপজেলার সামটা বাজার থেকে গরুর গাড়িতে চড়ে ও হেঁটে প্রায় ৪ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে আসেন নায়ড়া গ্রামে।
সহযোদ্ধা খন্দকার বজলুর রহমানের আমন্ত্রণে যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনি প্রচারণায় অংশ নিতে বঙ্গবন্ধু এখানে এসেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর সেই ভাষণ দেওয়ার কথা স্থানীয় লোকজন তাদের বাবা-চাচা কিংবা দাদাদের কাছ থেকে শুনেছেন। আছেন একজন প্রত্যক্ষদর্শীও। সেইসময় তার বয়স ছিল ১০-১৫ বছর। নাম খন্দকার জালাল উদ্দিন।
তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, বঙ্গবন্ধু সেদিন যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনি সমাবেশে যোগ দিতে নায়ড়া আসেন। রাস্তাটি গাড়ি চলাচলের উপযোগী না হওয়ায় তিনি শার্শার নীলকান্ত মোড়ে গাড়ি রেখে গরুর গাড়ি ও পায়ে হেঁটে নায়ড়া বাজারে পৌঁছান। রাস্তার মাঝে একটা বাঁশের সাঁকো ছিল। যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী ছিলেন মসিউর রহমান। স্মৃতিচারণ করে খন্দকার জালাল উদ্দিন বলেন, ‘আমার তখন বয়স ১০-১৫ বছর। আমি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে এই বাজারে হ্যান্ডশেক করি। বঙ্গবন্ধু নায়ড়া পৌঁছে পাশের দিঘিতে ওজু করেন। এরপর দিঘির অপরপাড়ে অবস্থিত হজরত শাহ সোলায়মান (র.) এর মাজার জিয়ারত এবং নায়ড়া মসজিদে জোহরের নামাজ আদায় করেন।’
তিনি বলেন, ‘সেইসময় এই প্রাইমারি স্কুলটি ছিল। এখন যেখানে পাকা রাস্তা বয়ে গেছে, সেখানে একটা বড় আমগাছ ছিল। স্থানীয়রা বলতেন, তালগোলা আম। ওইগাছের নিচে দাঁড়িয়ে মসজিদের দিকে মুখ রেখে বঙ্গবন্ধু বক্তৃতা করেন। সেবার নির্বাচনে সোহরাওয়ার্দী জিতেছিলেন। পরে সেই আমগাছটি কেটে ফেলা হয়। যেখানে লোকজন বসে তার ভাষণ শুনেছিলেন, সেখানে এখন বাজার। ছোটখাট বেশকিছু দোকানও রয়েছে সেখানে।’
নায়ড়া খন্দকারপাড়ার বাসিন্দা এবং বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর খন্দকার বজলুর রহমানের ভাতিজা খন্দকার আবুবকর বলেন, ‘বাবার কাছে শুনেছি চাচার আমন্ত্রণেই বঙ্গবন্ধু এসেছিলেন। তিনি এখানে নির্বাচনি সমাবেশে বক্তৃতা করে আমাদের ওখানে খাবার খেয়ে চলে যান।’
সামটা-নায়ড়া সড়ক
যশোরের শার্শা উপজেলার উলাসী ইউনিয়ন এবং ঝিকরগাছার উপজেলার শঙ্করপুর ইউনিয়নের মধ্যে পড়ে এই সামটা-নায়ড়া সড়ক। বঙ্গবন্ধু যখন এই পথে এসেছিলেন, তখন রাস্তাটি কাঁচা ছিল, ছিল হাঁটুসমান কাদা। সামটা ছাড়িয়ে দেউলিয়া এলাকায় রাস্তার মাঝে খালের উপর তখন ছিল বাঁশের সাঁকো। এখন রয়েছে স্টিলের বেইলি ব্রিজ। কিন্তু রাস্তাটি গত ৬৬ বছরে সেই একইরকম রয়েছে।
খন্দকার জালাল উদ্দিন বলেন, বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিবিজড়িত এই রাস্তাটি পাকা হোক—এটি এই এলাকার সকলেরই দাবি। আমরা কয়েকদফা ইউপি মেম্বার-চেয়ারম্যানকে বিষয়টি জানিয়েছি; কিন্তু কাজের কাজ হয়নি।
খন্দকার বজলুর রহমানের দৌহিত্র খন্দকার জিল্লুর রহমান ও খন্দকার মহিবুর রহমান পায়েল বলেন, বঙ্গবন্ধু আমাদের এই অজপাড়াগাঁয়ে সেইসময় যেভাবে কাঁচা রাস্তা দিয়ে এসেছিলেন, এখনও গ্রামের লোকজনকে সেই পথে একইভাবে যেতে হয়। আমরা চাই, এই সড়কটি পাকা হোক। সড়কের নামকরণ আমাদের দাদার (খন্দকার বজলুর রহমানের) নামে করা হোক।
শঙ্করপুর ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের চারবারের ইউপি সদস্য হাসমত আলী বলেন, এই এলাকাটি অবহেলিত। আমরা চাই, বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিবিজড়িত এই এলাকাটির উন্নয়ন হোক। তিনি যেখানে ভাষণ দিয়েছিলেন, সেখানে সাবেক এমপি রফিকুল ইসলাম একটি স্মৃতিফলক নির্মাণ করেছেন মাত্র। কিন্তু এই জায়গাটিতে এমন কিছু করা হোক, যাতে আগামী প্রজন্ম সেই ইতিহাস জানতে পারে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে এলজিইডির ঝিকরগাছা উপজেলা প্রকৌশলী শ্যামল কুমার বসু বলেন, সামটা-নায়ড়া সড়ক পাকাকরণের তালিকায় রয়েছে। তবে কবে নাগাদ কাজ শুরু হবে- তা তিনি বলতে পারেননি।
যশোর-২ (ঝিকরগাছা-চৌগাছা) আসনের সাবেক এমপি অ্যাড. মনিরুল ইসলাম বলেন, আমি উপজেলা চেয়ারম্যান ও এমপি থাকাকালে বাঁকড়া-বাগআঁচড়া সড়কের বাইপাস নায়ড়া পর্যন্ত দু’দফা মুজিব সড়ক করেছি। এমপি থাকাকালে সামটা-নায়ড়া সড়কসহ চৌগাছা ও ঝিকরগাছার ১৪৭টি রাস্তা ডিপিপিভুক্ত করেছি। ইতোমধ্যে সেগুলোর টেন্ডার শুরু হয়েছে। খুব শিগগির এই সড়কটির কাজও শুরু হয়ে যাবে।








