যশোরের বারীনগরের হাটের দিন বৃহস্পতিবার। সকালে বাজারে গিয়ে দেখা যায়, শীতকালীন সবজি খুব বেশি একটা ওঠেনি। কয়েকজন কৃষক তাদের ক্ষেতের সবজি নিয়ে হাটে এসেছেন। তারা বলছেন, সম্প্রতি বৃষ্টির কারণে তাদের বেশিরভাগ ক্ষেতে পানি জমে শিম, মিষ্টি কুমড়া ও পটলের ক্ষতি ব্যাপক হয়েছে। এদিকে সবজির দাম কমে যাওয়ায় লোকসান গুণছেন তারা।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, এবার যশোরে ১২ হাজার ২৬০ হেক্টর জমিতে সবজি চাষাবাদ হয়। কিন্তু বৃষ্টির কারণে প্রায় চার হাজার ৬৫০ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
হাটে আসা যশোর সদরের তীরেরহাট গ্রামের কৃষক মোশাররফ হোসেন বলেন, চলতি মৌসুমে প্রায় সাড়ে ছয় বিঘা জমিতে শিম, মুলা, বেগুন, লাউ, সরিষা ও আলুর চাষ করেছিলাম। তিন দিনের বৃষ্টিতে শিম, সরিষা আর আলুর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এখন ভরা মৌসুম, কিন্তু গাছে ফল নেই। প্রথম দিকে মুলা ৩০-৩৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি করলেও এখন ১০-১২ টাকার বেশি দাম উঠছে না। জমিতে পানি থাকায় বেগুন, মুলা, লাউ ও পটলের অনেক ক্ষতি হয়েছে। আশা ছিল, এবার সবজি থেকে ৪-৫ লাখ টাকা আসবে। কিন্তু মনে হচ্ছে, অর্ধেক টাকাও পাওয়া যাবে না।
এনায়েতপুর গ্রামের মফিজুর রহমান প্রায় দুই মণ শিম নিয়ে হাটে এসেছিলেন। বিক্রি করেছেন ২০ টাকা কেজি দরে। এক বিঘা জমিতে শিম চাষ করেন। বৃষ্টির কারণে গাছের ফুল ও কাণ্ড নষ্ট হয়ে গেছে।
তিনি বলেন, প্রতি সপ্তাহে যেখানে ৫-৬ মণ শিম ওঠার কথা, সেখানে ২-৩ মণের বেশি পাওয়া যাচ্ছে না। প্রথম দিকে ফলন কম ছিল, তখন দামও পেয়েছি ৭০-৮০ টাকা। এবার টার্গেট ছিল লাখ তিনেক টাকার শিম বিক্রি করবো। কিন্তু বৃষ্টির কারণে দুই লাখও পাবো না।
মথুরাপুর এলাকার মনিরুল ইসলাম প্রায় আড়াই বিঘা জমিতে বেগুনের চাষ করেন। তিনি বলেন, গত রবিবারের হাটে নিয়ে আসা ৭-৮ মণ বেগুন ফিরিয়ে নিয়ে যেতে হয়। ওই বেগুন পুরোটাই গরু-ছাগলের খাদ্য হয়েছে।আজকের হাটে বেগুনের দাম ১৫ থেকে ২০ টাকা কেজি। এর আগে ২০ টাকা দরে বিক্রি করেছি। বৃষ্টি না হলে এবার দুই আড়াই লাখ টাকা লাভ হতো। বৃষ্টিতে এক বিঘা জমির প্রায় একশ’ মিষ্টি কুমড়ো পচে গেছে।
হাটে বেশ কয়েকজন কৃষক মিষ্টিকুমড়া নিয়ে আসেন। তার মধ্যে মথুরাপুর গ্রামের ওহিদুল ইসলাম নিয়ে এসেছেন প্রায় ২০ মণ। বিক্রি হয়েছে ১৬ থেকে ১৮ টাকা কেজি দরে। রহমতপুর এলাকার কৃষক মতিয়ার রহমান হাটে নিয়ে এসেছিলেন প্রায় ৮০০ পিস বাঁধাকপি। বিক্রি করেছেন ১০-১২ টাকা পিস।
হাপানিয়া গ্রামের ইলিয়াস ফুলকপি বিক্রি করেছেন ২০ টাকা কেজি দরে। তিনি বলেন, শীতের শুরুতে ৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করেছি ফুলকপি। এখন বেশ কম দামেই বিক্রি করতে হচ্ছে। একটু ভালো ফুলকপি বিক্রি হয়েছে ২৫ টাকা দরে।
ব্যাপারি সাইদুর রহমান জানান, বর্তমানে ঢাকায় সবজির চাহিদা একটু কম। কারণ ঢাকা বা চট্টগ্রামে সবজির সরবরাহ হচ্ছে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে। আমরা দুই জন এক ট্রাক সবজি ঢাকার যাত্রবাড়ী পাঠাচ্ছি। গত রবিবার মোকামে পাঠানোর পর দাম অনেক কম পাওয়ায় আমাদের বেশ ক্ষতি হয়েছে।
বারীনগরের হাটে আজ মুলা ১০-১২ টাকা কেজি, বেগুন ১৫ টাকা, পটল ৩৫-৩৬ টাকা, শিম ১০-১২ টাকা, ফুলকপি ২০-২৫ টাকা, বাঁধাকপি ১০-১২ টাকা পিস দরে বিক্রি হয়েছে। তবে ঢাকার বাজারে এসব সবজির দাম দ্বিগুণেরও বেশি।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, যশোর জেলায় এবার শীতকালীন মৌসুমে সবজি চাষ হয়েছে ১২ হাজার ২৬০ হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে যশোর সদরে ২ হাজার ৯০৫ হেক্টর, শার্শায় এক হাজার ৭২০ হেক্টর, ঝিকরগাছায় এক হাজার ৪৭৫ হেক্টর, চৌগাছায় ২ হাজার ৭০০ হেক্টর, কেশবপুরে ৬৭২ হেক্টর, মণিরামপুরে এক হাজার ৫২০ হেক্টর, অভয়নগর ৩১৮ হেক্টর ও বাঘারপাড়ায় ৯৫০ হেক্টর জমিতে সবজি চাষ হচ্ছে।
উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা সুবাস চন্দ্র সরকার বলেন, বৃষ্টিতে সবজির খেত সয়লাব হয়ে গেছে। এবারের বৃষ্টিতে প্রায় ৪ হাজার ৬৫০ হেক্টর জমির সব ধরনের সবজি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে, যেহেতু এখন সবজি চাষ চলছে, কৃষকরা সেই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারবে বলে আশা করা যায়।









