বাগেরহাটের মোড়েলগঞ্জে হিন্দু যুবকের বাড়িতে হামলার ঘটনায় মামলার পর নিশানবাড়িয়া ইউনিয়নের আমরবুনিয়া গ্রামে গ্রেফতার আতঙ্ক বিরাজ করছে। এরই মধ্যে মামলার এজাহারভুক্ত প্রধান দুই আসামি গ্রাম ছেড়ে পালিয়েছে। তাদের খুঁজছে পুলিশ।
পুলিশ জানিয়েছে, মামলার আসামি ছাড়া নিরপরাধ কাউকে গ্রেফতার করা হচ্ছে না। পাশাপাশি ওই যুবকের ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িটি মেরামত করে দেওয়া হয়েছে। তাদের বিভিন্ন সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
গত ১১ এপ্রিল আমুরবুনিয়রা গ্রামে ওই হিন্দু যুবকের বাড়িতে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করা হয়। এ ঘটনায় একটি মামলা করেছেন যুবকের বাবা। এই মামলায় ২০ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত ৮০-৯০ জনকে আসামি করা হয়েছে। মামলার ২০ আসামিকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
অপরদিকে, আমরবুনিয়া গ্রামের বাসিন্দা আব্দুস সাত্তার হাওলাদার বাদী হয়ে ওই যুবককে আসামি করে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে আরেকটি মামলা করেছেন। এই মামলায় বর্তমানে ওই যুবক কারাগারে রয়েছেন।
তবে হামলার নেতৃত্ব দেওয়া স্থানীয় জামায়াতে ইসলামীর নেতা আমুরবুনিয়া মসজিদ কমিটির সাধারণ সম্পাদক নুর জামান হাওলাদার ও যুবলীগ নেতা পরিচয় দেওয়া উজ্জল খানকে এখনও গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। তারা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি।
আরও পড়ুন: বাগেরহাটে হিন্দু বাড়িতে হামলা, কারাগারে ১৮
স্থানীয় সাবেক ইউপি সদস্য আব্দুল মালেক গাজী বলেন, ‘হামলার ঘটনায় ২০ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত ৮০-৯০ জনকে আসামি করে মামলা হয়েছে। গ্রেফতারের ভয়ে অধিকাংশ পরিবারের পুরুষ অন্যত্র অবস্থান করছেন। তবে হামলার নেতৃত্ব দেওয়া উজ্জল ও নুর জামান এখনও গ্রেফতার হয়নি। তারা গ্রেফতার হলে গ্রামের মানুষের আতঙ্ক কিছুটা কমতো।’
আমরবুনিয়ার সুরেষ রায়ের স্ত্রী সিকা রায় বলেন, ‘গ্রামের পরিস্থিতি এখন ভালো। তবে ভয় ও আতঙ্ক কাটেনি। আমরা সবকিছু ভুলে আগের মতো হিন্দু-মুসলিম মিলেমিশে এই গ্রামে বসবাস করতে চাই।’
ওই যুবকের বাবা বলেন, ‘আমার ছেলে যে অপরাধ করেছিল তার জন্য গ্রামে সালিশ বৈঠক হয়েছিল। তাকে আমি মারধর করেছিলাম। বিষয়টি তখনই মিটমাট হয়ে গেছে। এরপরও ছেলের অপরাধের জন্য শাস্তি চাই। দেশের প্রচলিত আইনে তার বিচার হোক। সেই সঙ্গে আমার বাড়িতে যারা হামলা চালিয়েছে তাদেরও বিচার চাই।’
তিনি বলেন, ‘সেদিন যারা হামলা চালিয়েছে তাদের দেখতে পাইনি। ঘটনার পর থেকে পুলিশ আমাদের সহযোগিতা করেছে। এখনও নিরাপত্তা দিয়ে যাচ্ছে।’
আমরবুনিয়া গ্রামের শাহজাহান চাপরাশি বলেন, ‘ঘটনার দিন নুর জামান ও উজ্জলের নেতৃত্বে একটা মিছিল নিয়ে ওই বাড়িতে হামলা চালানো হয়। তাদের উসকানিতে এ ঘটনা ঘটেছে। পুরো গ্রামে অশান্তি সৃষ্টি করেছে তারা। তাদের গ্রেফতারের দাবি জানাই।’
নিশানবাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুর রহিম বাচ্চু বলেন, আমরবুনিয়া গ্রামে ১১০ পরিবারের বসবাস। এর মধ্যে হিন্দু পরিবার ৫৪টি। বাকিগুলো মুসলিম পরিবার। দীর্ঘদিন ধরে হিন্দু-মুসলিম পরিবারগুলো সুখে-শান্তিতে বসবাস করে আসছিল। এর আগে এমন ঘটনা ঘটেনি। ক্ষতিগ্রস্ত হিন্দু বাড়িটি ইউএনওর নির্দেশে মেরামত করে দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ওই পরিবারকে নতুন পাকাঘর ও মন্দির সংস্কার করে দিতে বলেছেন ইউএনও। কয়েকদিনের মধ্যে নতুন ঘর ও মন্দির সংস্কার করে দেওয়া হবে।’
আরও পড়ুন: জামায়াত সমর্থকের উসকানিতেই হিন্দু বাড়িতে হামলা
চেয়ারম্যান বলেন, ‘হামলার নেতৃত্ব দেওয়া নুর জামান ও উজ্জল খান খুবই দুর্ধর্ষ। সুন্দরবনে বিষ দিয়ে মাছ শিকারসহ নানা অপরাধে জড়িত তারা। দুই জনের উসকানিতে হামলার ঘটনা ঘটেছে। গ্রামে এখন গ্রেফতার আতঙ্ক বিরাজ করছে। তবে আমরা নিরীহ ও নিরপরাধ ব্যক্তিদের আশ্বস্ত করেছি, আসামি ছাড়া অন্য কাউকে গ্রেফতার করবে না পুলিশ।’
বাগেরহাটের পুলিশ সুপার কে এম আরিফুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সেদিন যে ঘটনা ঘটলো তা জঘন্যতম এবং দুঃখজনক। মামলার এজাহারভুক্ত আসামি ছাড়া কাউকে গ্রেফতার করবে না পুলিশ। তবে ঘটনার উসকানিদাতাদের গ্রেফতার করা হবে।’
মোড়েলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের ঘরটি মেরামত করে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি তাদের মন্দিরটি সংস্কারের জন্য ইউপি চেয়ারম্যানকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’
মোড়েলগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইদুর রহমান বলেন, ‘ওই গ্রামের পরিস্থিতি এখন শান্ত। সার্বিক নিরাপত্তার জন্য আমরা সেখানে ২৪ ঘণ্টা পুলিশ মোতায়েন রেখেছি। মামলার আসামি ছাড়া নিরপরাধ কাউকে গ্রেফতার করা হচ্ছে না। আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই।’
তিনি বলেন, ‘ঘটনার পর দুটি মামলা হয়েছে। দুই মামলায় এখন পর্যন্ত ২০ জনকে গ্রেফতার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। হামলার নেতৃত্ব দেওয়া নুর জামান ও উজ্জল খানকে গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত আছে। তাদের খুঁজছে পুলিশ। আশা করছি, দ্রুত সময়ের মধ্যে তাদের গ্রেফতার করতো পারবো।’








