X
শুক্রবার, ২৭ জানুয়ারি ২০২৩
১৩ মাঘ ১৪২৯

ইলিশে নিষেধাজ্ঞা: জেলেদের ঘরে চালের অভাব

আবুল হাসান, মোংলা
১৪ অক্টোবর ২০২২, ০০:০১আপডেট : ১৪ অক্টোবর ২০২২, ০০:০১

প্রায় সারা বছর নদ-নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন মোংলার উপকূলীয় জেলেরা। মাছ ধরেই চলে তাদের সংসার ও ছেলেমেয়ের লেখাপড়া। এর মধ্যে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞার সময় জীবন-জীবিকা অচল হয়ে পড়ে। অন্য কোনও কাজ না জানায় পরিবার-পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করতে হয়। অধিকাংশ জেলে নিষেধাজ্ঞার সময়ে অসল সময় কাটান। অনেকে ধারদেনা করে সংসার চালান। জন্ম থেকে জেলে পেশায় থাকলেও অধিকাংশ জেলের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়নি। কখনও পরিবর্তন হবে কিনা তাও জানা নেই। এজন্য জীবনের শেষপ্রান্তে এসে কেউ কেউ হিসাব মেলাতে পারেন না। মোংলার উপকূলীয় জেলেদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

৭ অক্টোবর থেকে মা ইলিশ রক্ষা এবং প্রজনন মৌসুম নির্বিঘ্ন করতে ইলিশ ধরায় ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শুরু হয়েছে। নিষেধাজ্ঞার সময়ে রোজগার বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মানবেতর জীবনযাপন করছে জেলে পরিবারগুলো।

জেলেরা বলছেন, নিষেধাজ্ঞা চলাকালে সরকার চাল সহায়তা দিলেও তা অধিকাংশ জেলে পান না। যারা পান তারা চাহিদার তুলনায় কম পান। কিন্তু বিকল্প কোনও ব্যবস্থা নেই। ফলে ধারদেনায় জর্জরিত জেলেরা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মোংলায় নিবন্ধিত জেলে রয়েছেন পাঁচ হাজার ৮৬৬ জন। অনিবন্ধিত জেলের সংখ্যা সাত হাজার। নিবন্ধিতদের মধ্যে এবারের নিষেধাজ্ঞায় এক হাজার ১৫০ জনের চাল সহায়তা পাওয়ার কথা রয়েছে। এখনও তারা চাল পাননি। আগামী সপ্তাহে চাল পাবেন বলে জানিয়েছেন উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা। বাকি নিবন্ধিত জেলেরা জাটকা ইলিশ ধরায় নিষেধাজ্ঞার সময় পাবেন।

বুধবার (১২ অক্টোবর) মোংলার চাঁদপাই ইউনিয়নের কাইনমারী গ্রামের কয়েকজন জেলের সঙ্গে কথা হয় বাংলা ট্রিবিউনের এই প্রতিনিধির।

এই গ্রামের নিবন্ধিত জেলে মো. রশিদ (৬২), রিংকু সরদার (২৮), চিন্ময় ঢালী (২৫) ও সিমন বিশ্বাস (৩০) জানিয়েছেন, জীবনাটাই শেষ হয়ে গেলো নোনাপানিতে। জন্ম থেকেই জেলে পেশায়। অন্য কোনও কাজ জানা নেই। মাছ ধরে চলে সংসার ও ছেলেমেয়ের লেখাপড়া। ঠিকমতো ছেলেমেয়েকে লেখাপড়া করাতে পারি না, সংসারও চালাতে পারি না। ধারদেনা করে বছরজুড়ে চলতে হয়। মাছ ধরে দেনা পরিশোধ করতে হয়। এভাবেই চলছে জীবন। এজন্য জীবনের হিসাব মেলাতে পারেন না তারা।

মো. রশিদ ও রিংকু সরদার বলেন, ‘মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা আমাদের জন্য মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা। সরকারি যে চাল দেওয়া হয় তা চাহিদার তুলনায় খুবই কম। এ দিয়ে সংসার চলে না। এখন ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা চলেছে। এই ২২ দিনের জন্য ২৫ কেজি চালের বরাদ্দ আছে। ছয় দিনেও চাল পাইনি। আমাদের দাবি, চালের পরিমাণ ৪০ কেজি করা হলে অন্তত কোনোমতে চলা যেতো।’

চিলা ইউনিয়নের জয়মনি গ্রামের জেলে ডি এল মন্ডল (৫৫), স্বপন মন্ডল (৪২), আফজাল শেখ (৬০) ও আসাদ হাওলাদার (৫৫) জানিয়েছেন, ৩০ বছর ধরে পশুর নদীতে ইলিশ মাছ ধরেন। অন্য কোনও কাজ জানা নেই। নিষেধাজ্ঞার সময়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে অলস বসে থাকতে হয়। বছরে তিনবার নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। এ সময়ে খুবই কষ্টে থাকেন তারা। সরকারিভাবে যে চাল পান তা খুবই কম, এত কম চালে সংসার চলে না।’

আফজাল শেখ ও আসাদ হাওলাদার বলেন, ‘নিষেধাজ্ঞার সময়ে সরকার আমাদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করলে অনেক উপকার হতো। পাশাপশি স্বল্প সুদে যদি ঋণ দিতো তাহলে ঠিকমতো সংসার চালাতে পারতাম।’

প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞার সময় জীবন-জীবিকা অচল হয়ে পড়ে জেলেদের

জাতীয় মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির মোংলা উপজেলা সভাপতি বিদ্যুৎ মন্ডল বলেন, ‘জেলেদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের কথা আমরা বারবার বলে আসছি। সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে নিবন্ধিত জেলেদের সন্তানদের জন্য ১০ শতাংশ কোটা সংরক্ষণ, প্রশিক্ষিত জেলেদের জামানতবিহীন সুদমুক্ত লোন দেওয়ার ব্যবস্থা, জেলা-উপজেলা পর্যায়ে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন, উপকূলীয় অঞ্চলসহ সব চরাঞ্চল এলাকায় মৎস্য পল্লী নামে আবাসিক এলাকা গড়ে তোলাসহ ১১ দফা প্রস্তাবনা সরকারের মৎস্য দফতরে পাঠানো হয়েছিল। এর মধ্যে দু’একটি বাস্তবায়ন হলেও বাকি দাবিগুলো বাস্তবায়ন হয়নি। এসব দাবি বাস্তবায়ন হলে জেলেদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনমাত্রার মান পরিবর্তন হবে। এর কোনও বিকল্প নেই।’

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে মোংলা উপজেলার জেষ্ঠ্য মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মোংলায় নিবন্ধিত জেলে রয়েছেন পাঁচ হাজার ৮৬৬ জন। অনিবন্ধিত জেলে রয়েছেন সাত হাজার। তাদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে সরকার অত্যন্ত আন্তরিক। ইতোমধ্যে মোংলা পৌর শহরের সিগন্যাল টাওয়ার এলাকা, উপজেলার চিলা ইউনিয়নের কেয়াবুনিয়া, সুন্দরতলা ও আমতলা এবং চাঁদপাই ইউনিয়নের কালিকাবাড়ী, কাইনমারী ও সোনাইলতলা ইউনিয়নের উলুবুনিয়ায় মৎস্য অধিদফতরের মাধ্যমে জেলেদের জন্য একটি প্রকল্প নিয়ে কাজ করছে বিশ্বব্যাংক। এই প্রকল্পে জেলেদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রকল্পের মাধ্যমে ২৫-৩০ হাজার টাকা লোন দেওয়া হয়েছে। লোনের আট শতাংশ লাভ্যাংশ জেলেদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।এছাড়া জেলেদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের জন্য কাজ করা হচ্ছে।’

/এএম/
সর্বশেষ খবর
১০৭ ধরে চলছে হাডুডু খেলার আয়োজন, গ্রামজুড়ে উৎসব
১০৭ ধরে চলছে হাডুডু খেলার আয়োজন, গ্রামজুড়ে উৎসব
বন বিভাগের জায়গা দখল করে প্রভাবশালীদের মার্কেট নির্মাণ
বন বিভাগের জায়গা দখল করে প্রভাবশালীদের মার্কেট নির্মাণ
বাংলাদেশ নিয়ে আগ্রহ বাড়ছে ডেনমার্কের
একান্ত সাক্ষাৎকারে সাবেক ডেনিশ প্রধানমন্ত্রী পল নায়রুপবাংলাদেশ নিয়ে আগ্রহ বাড়ছে ডেনমার্কের
পাঁচতলা ভবনের ছাদ থেকে পড়ে ভাই-বোনের মৃত্যু
পাঁচতলা ভবনের ছাদ থেকে পড়ে ভাই-বোনের মৃত্যু
সর্বাধিক পঠিত
উপহার পেয়েছিলেন মাত্র চারটি, এখন তাদের ছাগল-ভেড়া ৬৩টি
উপহার পেয়েছিলেন মাত্র চারটি, এখন তাদের ছাগল-ভেড়া ৬৩টি
বিয়ে করে বিপাকে অভিনেতা তৌসিফ!
বিয়ে করে বিপাকে অভিনেতা তৌসিফ!
রাজধানীতে বিক্রি হচ্ছে জমজমের পানি
রাজধানীতে বিক্রি হচ্ছে জমজমের পানি
কলকাতার দেয়ালে দেয়ালে তাসনিয়া: ফারিণের পাশে দাঁড়ালেন প্রসেনজিৎ
কলকাতার দেয়ালে দেয়ালে তাসনিয়া: ফারিণের পাশে দাঁড়ালেন প্রসেনজিৎ
প্রধানমন্ত্রী কুমিল্লা নামেই বিভাগ দিন: এমপি বাহার
প্রধানমন্ত্রী কুমিল্লা নামেই বিভাগ দিন: এমপি বাহার