X
সোমবার, ২৭ মে ২০২৪
১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

পানি খেতে হয় মেপে মেপে

আসাদুজ্জামান সরদার, সাতক্ষীরা
২৩ মার্চ ২০২৩, ১৪:১৩আপডেট : ২৩ মার্চ ২০২৩, ১৪:২৪

সুন্দরবনের কোলে সাগরপাড়ের গ্রাম সাতক্ষীরার শ্যামনগরের বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের দাতিনাখালী। এই গ্রামে বাস করেন মাজিদা বেগম (৫০)। সংসারে তার তিন মেয়ে। দুই মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। এক মেয়ে শারিরীক প্রতিবন্ধী। স্বামীসহ তিনজনের সংসারে প্রতিদিন খাওয়া, গোসলসহ প্রয়োজনীয় কাজে ২০ লিটার পানি লাগে। বাড়ি থেকে আড়াই কিলোমিটার যেতে হয় পানি আনতে। সেখানে গিয়ে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে পানি আনতে হয় মাজিদার। শুধু খাওয়া নয়, গোসলসহ প্রয়োজনীয় কাজ সারতে হয় এই পানিতে। দুই বেলায় ৫/৬ ঘণ্টা সময় ব্যয় হয় পানি আনার কাজেই।

মাজিদার বাড়ির পাশে পানির প্ল্যান্ট আছে। সেখান থেকে ১৮ টাকায় প্রতি ড্রাম পানি কিনতে হয়। প্রতিদিন দুই ড্রাম পানি লাগে তার পরিবারে। তিনি বলেন, ‘আড়াই কিলোমিটার দূর থেকে পানি আনতে হয়। না যেতে পারলে কিনে খেতে হয়। পানি খাই মেপে মেপে। কোনও মেহমান আসলে খাবার দিতে পারি। কিন্তু অনেক সময় পানি দিতে পারি না।’

গ্রামটির খালে-বিলে পানি। একটু দূরে সাগর ভরা পানি। কিন্তু খাবার পানি নেই। উপকূলের অধিকাংশ পরিবার পানি নিয়ে সংগ্রাম করে যাচ্ছে। আয়ের বড় একটি অংশ খরচ হচ্ছে খাবার পানি কিনতে।

দাতিনাখালী বনজীবী নারী উন্নয়ন সংগঠনের পরিচালক শিফালী বেগম বলেন, ‘ভ্যান থেকে পানি নিলে দুই কলস পানি ১০০ টাকায় কিনতে হয়। পাঁচ জনের পরিবারে প্রতিদিন ২০০ টাকার পানি লাগে। সবার পক্ষে পানি কিনে খাওয়া সম্ভব না। চলতি বছর বৃষ্টি কম হয়েছে। অধিকাংশ মানুষ দূর থেকে পানি এনে পান করেন। দিনের অনেকটা সময় পানি আনার কাজেই ব্যয় হয়। যাদের অবস্থা একটু ভালো তারা বাড়িতে বৃষ্টির পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা করেছেন। সেই পানি তারা পান করেন। কেউ কেউ বোতলের পানি কিনে পান করেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের এলাকার পানি লবণাক্ত। সুপেয় পানির সংকট এখানে তীব্র। মিঠা পানির জন্য দুই কিলেমিটার দূরে যেতে হয়।’

খাবার পানি আনতে যেতে হয় দুই কিলোমিটার দূরে

বিন্দু নারী উন্নয়ন সংগঠনের নির্বাহী পরিচালক জান্নাতুল মাওয়া বলেন, ‘উপকূলের মানুষের সুপেয় পানির সমস্যা ভয়াবহ। শুধু তাই নয় লবণাক্ত পানির কারণে নারীরা বিভিন্ন শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন। দূরে পানি আনতে গিয়ে অনেক নারী বিভিন্নভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছেন। পানি আনতে গিয়ে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হয়। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা পানি আনতে গিয়ে তাদের স্কুলে যাওয়া হচ্ছে না।’

শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ইউনিয়নের আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, ‘এই এলাকায় গভীর নলকূপ থাকলেও লোনা পানি ওঠে। পুরো শ্যামনগর উপজেলার চিত্র একই। এখানকার মানুষ সাধারণত পুকুরের পানি খান। কিন্তু ২০০৯ সালের ঘূর্ণিঝড় আইলার পর শ্যামনগরের মিষ্টি পানির পুকুরগুলো লবণাক্ত হয়ে গেছে। এরপর থেকে খাবার পানির তীব্র সংকট। সংকট রয়েছে কৃষি জমিতে সেচ দেওয়ার পানিরও। বর্ষাকালে দুই-তিন মাস বৃষ্টির পানি পাওয়া গেলেও বছরের অন্যান্য সময় থাকে লবণাক্ত পানি।’

কয়েকটি বেসরকারি সংস্থার হিসাব মতে, শ্যামনগরের প্রায় ৯৫ শতাংশ এলাকায় খাবার পানির তীব্র সংকট রয়েছে। দিন দিন এই সংকট বাড়ছে।

এর জন্য অপরিকল্পিতভাবে লোনা পানির চিংড়ি চাষ, নদী ভাঙন ও ঘূর্ণিঝড় আইলা-আম্পানসহ বেশ কয়েকটি প্রাকৃতিক দুর্যোগকে দায়ী বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার ১২টি ইউনিয়নে ৫ হাজার ৭৯৫টি পুকুর ও ১৩৬টি জলমহাল রয়েছে। এর মধ্যে ৪৫৩টিতে পন্ড স্যান্ড ফিল্টার (পিএসএফ) থাকলেও ব্যবস্থাপনার অভাবে অধিকাংশ বন্ধ রয়েছে। এছাড়া এক হাজার ৪১২টি গভীর নলকূপ থাকলেও তার অধিকাংশ অকেজো। অগভীর নলকূপ রয়েছে ৪২২, বন্ধ রয়েছে তিনটি। যদিও অধিকাংশ নলকূপে লবণ পানি ওঠে। রয়েছে ৩০৪টি বৃষ্টির পানি সংরক্ষণাগারও।

খাবার পানি নিতে দীর্ঘ লাইন

নওয়াবেকী গণমুখী ফাউন্ডেশনের আলমগীর হোসেন জানান, শ্যামনগর উপজেলায় ৪ লাখ জনসংখ্যার সবাই সুপেয় পানির সমস্যা ভুগছেন। তাদের অনেক টাকা পানি কেনা বাবদ চলে যাচ্ছে। 

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা লিডার্স-এর নির্বাহী পরিচালক মোহন কুমার মন্ডল জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও লবণাক্ততা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। উপকূলীয় অঞ্চলে গত ৩৫ বছরে লবণাক্ততা আগের তুলনায় ২৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। দুর্যোগের ফলে দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের মানুষের খাদ্য সংকট, অপুষ্টি, সুপেয় পানির অভাবে রোগব্যাধি বাড়ছে। এতে প্রতি বছর চিকিৎসায় চলে যাচ্ছে অনেক টাকা। 

শ্যামনগর উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মোস্তাফিজুর রহমান জানান, শ্যামনগরের ১২টি ইউনিয়নের মধ্যে সাতটি ইউনিয়নের কিছু জায়গায় অনেক চেষ্টার পর গভীর নলকূপ বসানো হয়েছে। তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। সেসব টিউবওয়েলগুলো থেকে গড়ে ২০টি পরিবার পানি সংগ্রহ করতে পারছে। সুপেয় পানির চাহিদা মেটাতে ২২টি পুকুর খনন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে সুপেয় পানির চাহিদা মেটানো হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘ইউএনডিপির সহযোগিতায় কমউনিটি পর্যায়ে বৃষ্টির পানি ধরে খাওয়ার একটি প্রকল্প চালু হয়েছে। যার মাধ্যমে সুপেয় পানির চাহিদা অনেকখানি মিটছে।’

শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আক্তার হোসেন জানান, উপকূলীয় এলাকার মানুষের সুপেয় পানির জন্য বর্তমান সরকার কাজ করছে। উপজেলার ১৩৬টি জলমহালের মধ্যে মাত্র ২০-২৫টি লিজ হয়। বাকিগুলো সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত থাকে।

/আরআর/
সম্পর্কিত
রিমালের তাণ্ডবে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি, এখনও আতঙ্ক কাটেনি উপকূলে
খুলনায় দুর্যোগকবলিত সাড়ে ৪ লাখ মানুষ
ঘূর্ণিঝড় রিমালের তাণ্ডব: ৮ জনের মৃত্যু
সর্বশেষ খবর
‘লিসেন টু দ্য ভয়েসেস অব দ্য ইয়ুথ’ শীর্ষক সেমিনার অনুষ্ঠিত
‘লিসেন টু দ্য ভয়েসেস অব দ্য ইয়ুথ’ শীর্ষক সেমিনার অনুষ্ঠিত
উপকূলীয় এলাকায় বিদ্যুৎবিহীন ২ কোটি ৭০ লাখ গ্রাহক
উপকূলীয় এলাকায় বিদ্যুৎবিহীন ২ কোটি ৭০ লাখ গ্রাহক
‘বর্বর’ নেতানিয়াহুর বিচারের অঙ্গীকার এরদোয়ানের
রাফাহতে হামলা‘বর্বর’ নেতানিয়াহুর বিচারের অঙ্গীকার এরদোয়ানের
পূর্ব ইউক্রেনে দুটি গ্রাম দখলের দাবি রাশিয়ার
পূর্ব ইউক্রেনে দুটি গ্রাম দখলের দাবি রাশিয়ার
সর্বাধিক পঠিত
সব বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করতে চান নওফেল
সব বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করতে চান নওফেল
দখলমুক্ত হলো তেজগাঁও মেয়র আনিসুল হক সড়ক, কমবে ভোগান্তি
দখলমুক্ত হলো তেজগাঁও মেয়র আনিসুল হক সড়ক, কমবে ভোগান্তি
প্রায় ২ ঘণ্টা বন্ধের পর মেট্রোরেল চলাচল স্বাভাবিক
প্রায় ২ ঘণ্টা বন্ধের পর মেট্রোরেল চলাচল স্বাভাবিক
সহজে ওজন কমাতে চাইছেন? জেনে নিন ৯ পরামর্শ
সহজে ওজন কমাতে চাইছেন? জেনে নিন ৯ পরামর্শ
উপকূল অতিক্রম করে ঘূর্ণিঝড় ‘রিমাল’ এখন খুলনায়
ঢাকাসহ বেশিরভাগ অঞ্চলে ভারী বৃষ্টিউপকূল অতিক্রম করে ঘূর্ণিঝড় ‘রিমাল’ এখন খুলনায়